শয়তান নাসের আবু সাঈদের ক্রুদ্ধ কণ্ঠে রাগান্বিত না হয়ে বরং খুশি হলো, তার নিদ্রার ভান তাহলে তিনি ধরতে পারেননি। এবার যুৎসই কথা বলার জন্য নিজেকে তৈরি করে নিলো। আবু সাঈদের কথায় সে যেন বেশ আহাম্মক বনে গেছে, এমনি ভাব নিয়ে বললো–বড় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম স্যার।
নীহারের মাথার মধ্যে তখন আলমের অন্তর্ধান নিয়ে গভীর চিন্তার উদ্বেগ হচ্ছিলো। অজানিত একটা আতঙ্ক মোচড় দিচ্ছিলো তার মনে। নাসেরের ভন্ডামি ভরা নেকামি কথায় পা থেকে মাথা অবধি জ্বালা করে উঠে ওর। গম্ভীর গলায় বলে উঠে নীহার–এতো হৈচৈ-এর মধ্যেও যে ঘুমিয়ে থাকতে পারে তাকে ধন্যবাদ দিতে হয়। কারণ ঘুম তার সত্য নয়–মিথ্যা।
আবু সাঈদ তখন অত্যন্ত ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আলম গেলো কোথায়? নীহারের কথা বা নাসেরের উক্তি তার মাথায় তখন প্রবেশ করছিলো না।
নাসের এই সুযোগে পুনরায় আর একবার নিজেকে সচ্ছ করে নেবার চেষ্টা করলো বললো– স্যার আপনি তাকে যতখানি ভাল মানুষ মনে করেছেন ঠিক ততখানি নয়। জাহাজখানা ধ্বংস করে ফেলার জন্য সে এইভাবে মেশিন চালু করে রেখে ভেগেছে।
ভেগেছে। একটু ধ্বনি করে উঠলেন আবু সাঈদ।
হ! আমার মনে হয় জাহাজ ত্যাগ করে সে পালিয়েছে।
অসম্ভব। চলন্ত জাহাজ থেকে পালানো অসম্ভব। বললেন আবু সাঈদ। নাসের দাঁত বের করে একটু ব্যাঙ্গপূর্ণ হাসি হাসবার চেষ্টা করে বলে–স্যার, অসম্ভব তার কাছে কিছুই নয়।
এমন সময় একজন নাবিক ছুটে আসে–হুঁজুর ইঞ্জিনের নিচে মেশিন রুমে দেখুন। আমি একটা আর্তনাদ শুনতে পেয়েছিলাম।
নাবিকটার কথা শেষ হয় না, একসঙ্গে আবু সাঈদ এবং নীহার উচ্চারণ করে উঠেন–কি বললে?
হুজুর আমি একটা আর্তনাদ শুনতে পেয়েছিলাম কিন্তু শব্দটা কোথা থেকে এলো বুঝতে পারিনি কারণ তখন মেশিনে একটা ভয়ঙ্কর কড়কড় শব্দ হচ্ছিলো।
নীহার ব্যস্তকণ্ঠে বললো–আব্বা, আর এক মুহূর্ত বিলম্ব করা উচিৎ হবে না, শীগগির মেশিন কক্ষে খোঁজ নিন।
নীহারের কথায় মিটি মিটি হাসলো নাসের জানে সে এতোক্ষণে নাবিক আলমের হাড়গোড়ো সব চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে ছিটকে পড়েছে মেশিনের দাঁতের চারপাশে। এবার সে প্রস্তুত হয়ে নিলো আলমের পরিণতি সচক্ষে দেখবে–দেখবে যে হস্তদ্বয় দ্বারা সে তাদের নাক, মুখ–দাঁতের রক্ত বের করে দিয়েছিলো সেই হস্তদ্বয়ের কি অবস্থা হয়েছে। যে পা দিয়ে জলিলের তলপেটে চরম আঘাত করেছিলো সেই পা দুটির কি অবস্থা হয়েছে।
আবু সাঈদ হুকুম দিলেন দু’জন নাবিককে ইঞ্জিনের নিচে মেশিন-রুমে প্রবেশ করতে।
সঙ্গে সঙ্গে আদেশ পালন করা হলো।
দু’জন নাবিক প্রবেশ করলো নিচে।
কেশবও এই মুহূর্তে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো না সেও ওদের দু’জনার সঙ্গে নেমে পড়লো মেশিন-রুমে।
নাবিকদ্বয় ও কেশব মেশিন-রুমে নেমে যেতেই নীহার দু’হাতে মাথাটা টিপে ধরলো। সত্যই যদি নাবিক আলম মেশিনের চাকায় নিষ্পেষিত হয়ে থাকে– না না, এ দৃশ্য সে সহ্য করতে পারবে না।
ঠিক ঐ দন্ডেই মেশিন-রুমের ভিতর হতে একসঙ্গে নাবিক দু’টি এবং কেশব আর্ত চিৎকার করে উঠলো–কেশবের গলা স্পষ্ট শোনা গেলো–বাবু বাবু হায়–হায় হায়, একি হয়েছে–বাবু একি হয়েছে—
নীহারের বুকে তীরফলকের মত বিদ্ধ হলো শব্দগুলো, আর সে দাঁড়াতে পারলো না। একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা তার মনে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। ছুটে পালিয়ে গেলো নীহার নিজ কামরার দিকে। আলমের ঐ সুন্দর দেহটা নিষ্পেষিত অবস্থায় সে দেখতে পারবে না।
নাবিক দুটির গলাও শোনা গেলো–হুঁজুর, সর্বনাশ হয়ে গেছে। সর্বনাশ হয়ে গেছে–
আবু সাঈদের সংজ্ঞা আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। তিনি যেন মাতালের মত টলছেন। তবু খেয়াল করে বললেন–আরো দু’জন মেশিনের ভিতরে যাও, দেখো আলমের কি অবস্থা হয়েছে।
আবু সাঈদ ক্ষিপ্তের মত ইঞ্জিন রুমের পাশে পায়চারী শুরু করলেন। হঠাৎ এমন একটা বিপদ ঘটবে বা ঘটতে পারে কল্পনাও করতে পারেনি তিনি।
অল্পক্ষণ পর চার-পাঁচজনে ধরে নাবিক আলম-বেশি বনহুরের ক্ষত-বিক্ষত দেহটা নিয়ে এলো বাইরে। রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছে ওর নাবিক ড্রেস।
ডেকের উপরে শুইয়ে দেওয়া হলো বনহুরকে।
আবু সাঈদ বাহুর মধ্যে মুখ ঢেকে ফেললেন।
জাহাজের সবাই দারুণ অনুশোচনায় ভেঙে পড়লো। সবাই আঁতকে উঠলো এ দৃশ্য দেখে। কেউ চোখ ঢাকলো, কেউ বা কষ্টে তাকালো। কেউ কেউ দেখতে না পেরে সরে গেলো দূরে।
নাবিকগণ আলমকে শুইয়ে দিলে পরে আবু সাঈদের আদেশে জাহাজের ডাক্তার পরীক্ষা করলেন, বললেন তিনি স্যার বরাৎ বলতে হবে, নাবিক আলমের মৃত্যু ঘটেনি; সে এখনও জীবিত আছে।
আবু সাঈদ যেন দেহে প্রাণ ফিরে পেলেন, তিনি নিশ্বাস নিলেন নতুন করে। কেশবের অবস্থাও তাই–সে রোদন করছিলো।
ডাক্তারের প্রশ্নে জবাব দিলো নাবিকগণের মধ্যে হতে একজন, বললো–মেশিনের নিচে এক পাশে রক্তাক্ত দেহে পড়েছিলো আলম। ভাগ্যিস তার দেহটা দাঁতের ফাঁকে আটকা পড়ে যায়নি, তাহলে ছাতু হয়ে যেতো একেবারে।
ডাক্তার ভালভাবে পরীক্ষা করে আরও বললেন–হাত পা বা দেহের হাড়গোড় ভেঙে যায়নি। শুধু দেহের মাংসগুলো স্থানে স্থানে কেটে গেছে এবং আঘাত পেয়েছে অত্যন্ত।
কেশব আলমের বুকে এসে আছড়ে পড়লো কিন্তু তাকে সরিয়ে নেওয়া হলো সেখান থেকে।
