নাসের আর কানাইলাল ইঞ্জিনরুম থেকে বেরিয়ে গেলেও ওরা দু’জন লুকিয়েছিলো আড়ালে।
বনহুর মেশিনে হাত দিতেই অনুভব করলো কেমন একটা কড়কড় শব্দ হচ্ছে ইঞ্জিনের ভিতরে। অল্পক্ষণ পরই মেইন মেশিন অকেজো হয়ে পড়লো।
বনহুর চেষ্টা করলো নানাভাবে কিন্তু বাইরে থেকে কিছুই বুঝতে পারলো না। ইঞ্জিনের হেড সুইচ অফ করে দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো সে, নেমে গেলো নিচে।
এই সুযোগের প্রতীক্ষায়ই ছিলো ওরা।
বনহুর ভিতরে প্রবেশ করে ইঞ্জিনের নিচে কল-কজা পরীক্ষা করলো, ঠিক সেই মুহূর্তে নাসের কানাইকে মেশিন চালু করে দেবার জন্য আদেশ করে।
কানাই-এর চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠে, বুকের মধ্যে যেন হাতুড়ের ঘা পড়ছে। শুষ্ক কণ্ঠে বলে উঠে কানাইলাল–ছোট স্যার, আমাকে মাফ করবেন, আমি পারবো না মাফ করবেন…
সঙ্গে সঙ্গে একটা হীম-শীতল শক্ত অনুভূতি করলো কানাইলাল নিজের পিঠে। শিউরে উঠলো ওর সমস্ত শরীর, ঠান্ডা হয়ে গেলো বুক। একটা কথাও আর উচ্চারণ করতে পারলো না, যন্ত্রচালিতের মত এগিয়ে গেলো কানাইলাল ইঞ্জিন রুমের মধ্যে। হ্যান্ডেলে হাত রাখতেই থরথর করে কেঁপে উঠলো হাতখানা। ফিরে তাকালো সে, ওদিকে দেখলো নাসেরের হস্তে জমকালো পিস্তলের নলটা উঁচু হয়ে আছে ঠিক তার দেহ লক্ষ্য করে। কানাইলাল আর ভাবতে পারলো না, চাপ দিলো হ্যান্ডেলের চাকায়।
সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনের হেড মেশিন কর্কশ আওয়াজ করে চলতে শুরু করলো। নিস্তব্ধ মেশিন কক্ষ থেকে ভেসে এলো একটা তীব্র আর্তনাদ-উঃ-উঃ-আঃ-আঃ!
কানাইলাল আর নাসের ছুটে অদৃশ্য হয়ে গেলো।
ইঞ্জিনের বিকট শব্দে ফায়ারম্যানগণ এবং কয়েকজন খালাসী ছুটে এলো ইঞ্জিনকক্ষে। তারা বুঝতে পারলো, কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে। একজন নাবিক হেড মেশিন বন্ধ করে দিলেন।
ততক্ষণে জাহাজের বিপদ সংকেত ঘন্টাধ্বনি শুরু হয়েছে।
কয়েক মিনিটের মধ্যে ইঞ্জিন কক্ষে এসে জমায়েত হলো সমস্ত জাহাজের লোক। যারা ঘুমাচ্ছিলো তারাও সবাই এসে ঘিরে দাঁড়ালো–কি হলো কি হলো সবার মনেই দারুণ উৎকণ্ঠা।
ক্যাপ্টেন আবু সাঈদ এবং নীহারও ছুটে এলেন।
ক্যাপ্টেনের চোখেমুখে দারুণ আতঙ্কের ছাপ–না জানি আজ আবার কি ঘটলো! তিনি সবার অগ্রে এসে দাঁড়ালেন, জিজ্ঞাসা করলেন–কি হয়েছে? ব্যাপার কি?
একজন নাবিক চঞ্চল কণ্ঠে বললো–স্যার, জাহাজের হেড ম্যাশিন নষ্ট হয়ে গেছে। এক্ষুণি জাহাজে আগুন ধরে যেতো। ইঞ্জিন কক্ষে কেউ ছিলো না, আমি এসে মেশিন বন্ধ করেছি।
কথাগুলো বলতে গিয়ে বড় হাঁপিয়ে পড়ছিলো নাবিক বেচারী। কারণ সে যদি ঐ মুহূর্তে দ্রুত ছুটে এসে হেড মেশিন বন্ধ করে না দিতো তাহলে ইঞ্জিনে আগুন লেগে যেতো তাতে কোনো ভুল নেই। ভাগ্যক্রমে সে ঠিক মুহূর্তে এসে পড়েছিলো তাই রক্ষা পেয়েছে জাহাজখানা–শুধু জাহাজখানাই নয়, জাহাজের যাত্রীগণ প্রাণ রক্ষা পেলো।
আবু সাঈদ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন–এখন ইঞ্জিনরুমে কার ডিউটি ছিলো?
ভীড় ঠেলে কেশব এসে দাঁড়িয়েছিলো সেখানে খালাসীর কাজ করে সে। মাঝে মাঝে ফায়ারম্যানের কাজও করতে হয় তাকে। কোনো কোনো সময় নাবিক আলমের সঙ্গে মেশিন পরিস্কার বা তাকে অন্যান্য কাজে সহায়তা করতে হয়। গোটাদিনের পরিশ্রমের পর সন্ধ্যায় ছুটি হয়। কেশব কোনোদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেনি, এখন তাকে যথেষ্ট খাটুনি করতে হচ্ছে, কাজেই ছুটি হলেই গিয়ে দড়ির খাটিয়ায় নাক ডাকিয়ে ঘুমাতে শুরু করে। কেশবের বুকের মধ্যে ধক করে উঠলো–এখন তো তার বাবুর ডিউটি ছিলো! একটু পূর্বেই তো সে তাকে জাগিয়ে ক্যাবিনের দরজা বন্ধ করতে বলে বেরিয়ে এসেছিলো। কেশব প্রতিদিনের মত ন্দ্রিা-অলস দেহটা কোনো রকমে উঠিয়ে ক্যাবিনের দরজাটা বন্ধ করে পুনরায় ধপাস করে শুয়ে পড়েছিলো, তারপর ভাল করে ঘুম না আসতেই জাহাজের বিপদ সংকেত ঘন্টাধ্বনি শুনতে পেয়েছিলো এবং সেই শব্দ শুনে ছুটে এসেছে সে বাবুর সন্ধানে। কেশব প্রায় কেঁদেই ফেললো–হুঁজুর, আলম সাহেব এখন ডিউটিতে ছিলেন।
আঁতকে উঠেন আবু সাঈদ–বলো কি–আলম ছিলো। কিন্তু সে কোথায়?
ঠিক তখন ভিড়ের অদুরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে ফিস ফিস করে আলাপ হচ্ছিলো। তাদের কানেও এসে পৌঁছলো আবু সাঈদের গম্ভীর কণ্ঠস্বর। নাসের বললো–শয়তানটার খোঁজ হচ্ছে।
জম্বু বললো–আর পাবে কোথা, বেটার হাড়-মাংস পিষে দলা গয়ে গেছে।
শম্ভু বললো–শুধু দলা নয়, বেটার দেহটা এখন মেশিনে। চাকার দাঁতে দাঁতে লেপটে আছে মাত্র। আখ-মাড়াই কলের মত রক্তগুলো নিংড়ে পড়েছে মেঝেতে।
জলিল দাঁতে দাঁত পিষে বললো যেমন বাছাধন তেমনি তার সাজা হয়েছে। ছোট স্যার, এখন যান, মালিককে সন্তুষ্ট রাখতে চেষ্টা করুন। নইলে সব ফাঁস হয়ে যাবে।
তার মানে?
মানে এখন ওখানে আপনাকে না দেখলে সন্দেহ জাগতে পারে।
ঠিক বলছো জলিল। নাসের কথাটা বলে এগিয়ে গেলো।
নাবিক আলমের সন্ধানে উপস্থিত সবাই তখন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সমস্ত জাহাজে লোক ছুটলো–কোথায় সে? চারদিক থেকে সবাই ফিরে এলো–নাবিক আলমকে পাওয়া যাচ্ছে না।
নাসের ধূর্ত শিয়ালের মত সুরসুর করে এসে দাঁড়ালো, যেন এইমাত্র শোরগোল শুনে জেগে উঠে এলো সে। চোখ রগড়ে নিদ্রাজড়িত কণ্ঠে বললো–স্যার কি হয়েছে?
আবু সাঈদ রাগত কণ্ঠে বললো–এতোক্ষণে বুঝি তোমার নিদ্রা ভঙ্গ হলো?
