জন্ধু বললো–ছোকরার রূপটাই সব মাটি করে দিয়েছে ছোট স্যার। বেটা ছোটলোকের ছেলে কিন্তু দেখেছেন তার চেহারাটা?
ঐ তো হলো সব। না হলে নীহারের মত ধনবানের শিক্ষিতা কন্যা একটা ভিখারী নাবিককে দেখে মুগ্ধ হয় আর তার পিছু লাগে!
বনহুর আড়ালে দাঁড়িয়ে হাসে। দীপ্ত স্ফীত হয়ে উঠে তার সমস্ত মুখমন্ডল।
*
কয়েক ঘন্টা পর নাবিক আলমের ডিউটি রয়েছে ইঞ্জিনে। আলম এখন তার শয্যায় শুয়ে ঘুমাচ্ছে। যত চিন্তা আর অশান্তিই থাক নিদ্রাদেবীর কোমল স্পর্শে সব কিছু থেকে বিস্মৃতির পথে সরে এসেছে সে।
এখানে যখন নাবিক আলম মানে দস্যু বনহুর নিদ্রায় মগ্ন, ঠিক তখন জাহাজের মিস্ত্রী কানাই লালের শয্যার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো নাসের পিছনে তার জলিল, শম্ভু আর জম্বু জম্বু আর শম্বুর হস্তে ছোরা, নাসের আর জলিলের হাতে পিস্তল।
জলিল এখন সুস্থ হয়ে উঠেছে। তিন দিন তাকে শয্যায় শুয়ে থাকতে হয়েছিলো সেদিন নাবিক আলমের বুটের লাথি খেয়ে। প্রতিহিংসার বহ্নিজ্বালায় জলিলের হৃৎপিণ্ড জ্বালা করছে ভীষণভাবে। যেমন করে লোক ওকে নিঃশেষ না করা পর্যন্ত স্বস্তি নেই তার। শুধু জলিলের নয়, নাসের এবং জম্বুর রাগও অত্যন্ত তীব্র হয়ে উঠেছে। আলমকে হত্যার নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছে ওরা।
বনহুর যখন নিশ্চিন্ত মনে নিদ্রায় মগ্ন তখন তাকে নিয়ে নাসেরের দলের গভীর আলোচনার অন্ত নেই। ওর সঙ্গে সাক্ষাৎ লড়াই-এর সাহস কারো নেই, কিন্তু কৌশলে ওকে শায়েস্তা করতে হবে।
নাসের জাহাজের প্রধান মিস্ত্রী কানাই লালের কামরায় প্রবেশ করলো–সঙ্গে জলিল, শম্ভু আর জস্তু রয়েছে। জলিল এসে কানাই লালের মুখের চাদর সরিয়ে ফেললো।
সঙ্গে সঙ্গে নিদ্রা ছুটে গেলো কানাই লালের, দড়বড় উঠে বসে তাকালো, নিজের চোখকে। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারলো না–নাসেরের হস্তে উদ্যত পিস্তলের উপর তার প্রথম নজর পড়লো।
ভয়বিহ্বল দৃষ্টি নিয়ে তাকালো কানাইলাল নাসেরের মুখে। তারপর দৃষ্টি তার চলে গেলো নাসেরের পিছনের শম্ভু এবং জম্বুর হস্তে সুতীক্ষ্ণ ছোরাগুলোর উপর। কানাই-এর মুখ হা হয়ে উঠে, ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে বললো–ছোট স্যার!
হাঁ আমি। কানাইলাল, জরুরি একটা কাজে তোমার কাছে এলাম, যদি আমার কথায় রাজি না হও তাহলে মকবুলের মত তোমার অবস্থাও হবে।
কানাইলাল বেতসপত্রের মত থর থর করে কাঁপতে শুরু করেছে। তার অসহায় চোখ দুটো আর একবার ঘুরে এলো জলিল, শম্ভু আর জম্বুর হস্তস্থিত অস্ত্রগুলোর উপর দিয়ে। ঢোক গিয়ে বললো–কি কাজ আমাকে করতে হবে বলুন ছোট স্যার?
কানাইলাল উঠে দাঁড়ায় শয্যা ত্যাগ করে। হাতের মধ্যে হাত কচলায় সে। বলির পূর্বে মেষশাবকের যেমন অবস্থা হয় তেমনি হয় ওর অবস্থা।
নাসের কঠিন চাপাকণ্ঠে বলে উঠে–জাহাজ এখন চলছে, ইঞ্জিন ক্যাবিনে আছে ফারুক আলী। ওকে কিছুক্ষণের জন্য সরিয়ে নিচ্ছি, সেই মুহূর্তে ইঞ্জিনের মেইন মেশিন তোমাকে নষ্ট করে দিতে হবে।
জাহাজের মেইন মেশিন নষ্ট…
হাঁ, তোমাকে নষ্ট করে দিতে হবে।
কয়েক ঘন্টা পর ইঞ্জিনে আসবে আলম। মেইন মেশিন নষ্ট থাকলে সে নিশ্চয়ই ইঞ্জিনের ভিতরে প্রবেশ করে পরীক্ষা কাজ চালাবে। আলম নিজেও অনেক সময় ইঞ্জিনের মেশিন মেরামত করে থাকে। ঠিক সে সময় তোমাকে হেড মেশিন চালু করে দিতে হবে…।
ভয়বিহ্বল কণ্ঠে বলে উঠে কানাইলাল–আলম যে তাহলে পিষে থেতলে মারা পড়বে?
কি বুঝলে তুমি তাহলে কানাইলাল?
ছোট স্যার, আমি এখনও ঠিক বুঝেতে পারছি না কিছু।
সোজা কথায় না বুঝলে মকবুলকে যেভাবে বুঝিয়ে দিয়েছি সেইভাবে দিতে হবে। নাসের হাতের রিভলভারের উদ্যত ডগাটা ঠেকালো কানাইলালের বুকে।
ফ্যাকাশে বিবর্ণ মুখে তাকালো কানাইলাল।
নাসের দাঁতে দাঁত কটমট করে রগড়ে নিলো, বললো তারপর–আলমকে পিষে পারতে হবে তোমার, বুঝলে?
হ্যাঁ বলেন কি ছোট স্যার? আলমকে পিষে মারতে হবে?
হাঁ, চলে এসো, আর বিলম্ব নয়।
ছোট স্যার আমি…মানে…আমি…
খবরদার, কথা বলবে না–কোনোরকম আপত্তি করলে শম্ভু জম্বু আর জলিল তোমাকে টুকরো টুকরো করে ফেলবে।
চলুন কি করতে হবে।
নাসের ইঙ্গিৎ করলো জলিল, জম্বু আর শম্বুকে।
বেরিয়ে গেলো ওরা।
*
জাহাজের ইঞ্জিনরুমে তখন ফারুক আলীর ডিউটি ছিলো। জলিল, জম্বু আর শঙ্কু এসে দাঁড়ালো, চট করে মুখে কাপড় চাপা দিয়ে ওকে টেনে নিলো বয়লারের পেছনে।
ঐ মুহূর্তে নাসেরের সঙ্গে ইঞ্জিনরুমে প্রবেশ করলো মিস্ত্রী কানাইলাল, বাধ্য ছাত্রের মত তার পেছনে পেছনে এগিয়ে এলো।
নাসের ইঙ্গিৎ করলো কানাইলালকে।
কানাইলাল চারদিকে তাকিয়ে দেখে নিলো, তারপর মেইন মেশিনের পাশে এসে দাঁড়ালো। মাত্র কয়েক মিনিট–তারপর বেরিয়ে এলো সে। যেমনভাবে এসেছিলো তেমনি আলগোছে বেরিয়ে গেলো নাসের আর কানাইলাল।
বয়লারের পিছন থেকে ছেড়ে দেওয়া হলো ফারুক আলীকে। জানিয়ে দিলো জলিল, শম্ভু আর জন্ধু–আমাদের কথা যদি প্রকাশ পায় তাহলে নাবিক মকবুলের মত তারও অবস্থা হবে।
জলিল, শম্ভু আর জম্বুর চেহারা দেখেই পিলে চমকে গিয়েছিলো ফারুক আলীর। কোনোরকমে তাদের কাছে কান ধরে শপথ করে চলে এলো ইঞ্জিনকক্ষে।
কিন্তু ডিউটি তার শেষ হয়ে গিয়েছিলো, আলম আসতেই সে চলে গেলো।
বনহুর নিদ্রা জড়িত আঁখি দুটি রগড়ে হাই তুললো।
