কেন মেম সাহেব, নাবিক তারা কি মানুষ নয়?
না, তা বলছি না বলছি তোমাকে নাবিকের কাজ মানায় না আলম! তুমি লেখাপড়া জানো না?
সামান্য কিছু জানি।
কিন্তু তোমাকে দেখে অনেক বুদ্ধিমান, অনেক জ্ঞানী বলে মনে হয়।
বনহুর মৃদু হাসে।
নীহার বলে আবার–আলম, তোমার বীরত্বে আমি মুগ্ধ হয়েছি!
সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ মেম সাহেব।
আলম!
আর এখানে বিলম্ব করা ঠিক নয় মেম সাহেব, চলুন।
চলো।
ক্যাবিনের দরজা অবধি পৌঁছে দেয় বনহুর নীহারকে।
নীহার ক্যাবিনের মধ্যে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে স্থির নয়নে একবার বনহুরকে দেখে নেয়।
নীহার দরজা বন্ধ করে দেয়।
বনহুর ফিরে যায় নিজের ক্যাবিনে।
*
ওদিকে জলিলের ক্যাবিনে সমস্ত লাঠিয়াল মিলে গোপন পরামর্শ চলেছে। কেমন করে কাবু করবে নাবিক আলমকে। জীবনে তারা বহু দুষ্ট দুর্দান্ত লোকের সঙ্গে লড়াই করেছে; কিন্তু কারো। কাছে এমনভাবে হেরে যায়নি। আজ একটা সামান্য নাবিকের কাছে তারা যেভাবে নাকানি-চুবানি খেয়েছে, আর অপদস্ত হয়েছে এতে তাদের লাঠিয়াল জীবনে যে কলঙ্কের কালিমা পড়েছে, তা কোনোদিন মুছে যাবে না। বিশেষ করে জনাব আবু সাঈদ নাবিক আলমের পক্ষ হয়ে তাদের যা অপমান করেছেন, এর প্রায়শ্চিত্ত না করা পর্যন্ত তাদের স্বস্তি নেই।
এ দলে শুধু লাঠিয়ালগণই ছিলো না, ছিলো নাসের এবং তার কয়েকজন অনুগত বন্ধু স্থানীয়। জন।
নাসের একটা চেয়ারের হ্যান্ডেলে অর্ধ দন্ডায়মানভাবে ঠেশ দিয়ে বসে ছিলো। কেউ বা মেঝেতে বসে, কেউ বা দাঁড়িয়ে কেউ বা দড়ির খাটিয়ায় অর্ধশায়িত অবস্থায় শুয়ে আলাপ আলোচনা করছিলো।
ক্যাবিনের স্বল্প পাওয়ারের বাল্বের আলোতে এক-একজনের বন্য পশুর মতই লাগছিলো। চোখগুলো জুলছিলো ক্ষুধিত ব্যাঘের মত।
জলিল দড়ির খাটিয়ায় শায়িত। জাহাজের ডাক্তার বলেছে সম্পূর্ণ দুটো দিন শয্যায় শুয়ে থাকতে। এখনও তলপেটের ব্যথা সেরে যায়নি। জোরে কথা বলতেও কষ্ট হয় তার। কাজেই বাধ্য হয়ে শুয়ে আছে জলিল। তাই বলে মোটেই সে নীরব ছিলো না, মাঝে মাঝে দাতে দাঁত পিষে বলছিলো–যতক্ষণ ওকে শায়েস্তা করতে না পেরেছি ততক্ষণ আমি স্বস্তি পাবো না। শপথ। করছি, নাবিক আলমকে আমি সাগরের পানিতে ডুবিয়ে মারবো তবেই আমার নাম জলিল মিয়া। ৭০২ )
নাসের সম্মুখের টেবিলে মুষ্টিঘাত করলো–আমি ওকে নিঃশেষ না করে নিশ্চিন্ত হবো না। মালিকের ভালোবাসাই শুধু সে জয় করে নেয়নি; আমার ভাবী পত্নী নীহারের মনেও সে আসন। গেড়ে নিয়েছে।
শম্ভু বলে উঠলো–ঠিক বলেছেন ছোট স্যার, মেম সাহেব একেবারে ঐ নাবিক ছোকরার প্রেমে পড়ে গেছেন। দেখলেন না, কেমন ওর হয়ে কড়া কথা শোনালো?
হু কিন্তু জানেন, নাসের কড়া কথা হজম করবার লোক নয়। একদিনে আমি ঘুচিয়ে দেবো না। প্রেমের লীলা খেলা!
শম্ভু বললো–হুঁজুরের হুকুমে আমরা সব পারি। একদিন বেটা আমাদের কাবু করেছে কিন্তু অমন আরও কতদিন বাকী আছে। বেটাকে একেবারে পরপারে পাঠিয়ে তবে ছাড়বো।
আস্তে বলল, কেউ শুনে ফেলবে! বললো আর একজন।
নাসের বললো–শুনলো তো বয়েই গেলো। এবার বাড়াবাড়ি করলে শুধু আলম বেটাকেই নয়, স্যারকেও শায়েস্তা করে নেবো।
ক্যাবিনের মধ্যে যখন নানারকম আলাপ-আলোচনা চলছিলো, তখন ক্যাবিনের পিছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একজন সব শুনছিলো। সে অন্য কেউ নয়–স্বয়ং দস্যু বনহুর। নীহারকে তার ক্যাবিনে পৌঁছে দিয়ে নিজ ক্যাবিনেই চলে গিয়েছিলো সে। হঠাৎ মনে পড়লো একবার জাহাজের পিছন দিকটা দেখে আসা ভালো। কারণ ঐ দিকেই জলিলের গোপন আড্ডা বসে। বিশেষ করে নিজের চেয়ে সে এখন বেশি চিন্তিত আবু সাঈদের জন্য। সন্ধ্যায় আবু সাঈদ ঠিক তার হয়ে ওদের হয়তো কোনো গালমন্দ করেছেন, কাজেই শয়তানের দল ক্ষেপে যেতে পারে। কোনো শলা-পরামর্শ যে চলেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বনহুর শয্যাগ্রহণ করতে গিয়ে করতে পারেনি, চলে এসেছে সে ডেকের শেষ অংশে, যেখানে রয়েছে লাঠিয়ালদের বিশ্রাম কামরা।
নাসেরের শেষ কথা শুনে বনহুরের হস্তদ্বয় মুষ্টিবদ্ধ হলো। যার জাহাজে বসে দিব্য ফুর্তি চালাচ্ছে, তাকে হত্যার পরামর্শ। কি ভয়ঙ্কর লোক এরা! বনহুর নিজের জন্য বিশেষ চিন্তিত নয়, কারণ তাকে কাবু করা নাসেরের দলের কাজ নয়। চিন্তিত হলো সে জাহাজের মালিক ক্যাপ্টেন আবু সাঈদের জন্য।
বনহুর যখন ভাবছে তখন পুনরায় শোনা গেলো জলিলের কণ্ঠ–ছোট স্যার, আমাকে সুস্থ হয়ে উঠতে দিন।
হাঁ, তোমার সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করবো। দেখো জলিল, স্যার যা মাহিনা দেন তার ডবল দেবো আমি। এ জাহাজ আমার হবে, এ জাহাজের মাল-মসলা আমার হবে। নীহার হবে আমার–তখন তোমরা যা চাইবে তাই পাবে, বুঝলে?
ছোট স্যার, জানি বলেই তো আমরা আপনার কথামত এ জাহাজে এসেছি। আর আপনার কথাকে বিশ্বাস করেই আমরা ধৈর্য্য ধরে আছি।
জলিল আমাকে বিশ্বাস করো, আমি তোমাদের খুশি করতে কোনোরকম দ্বিধা করবো না। শুধু একটি বাধা ছিলো মালিককে সরানোর ব্যাপার, এখন তার চেয়ে আর একটা বড় মসিবৎ হলো ঐ ছোট লোক বেটা নাবিক আলম। এ জাহাজে ও আসার পর শুধু মালিক নয়, মালিকের মেয়েটাও ওকে ভালোবেসে ফেলেছে….
শুধু ভালোবাসা নয় ছোট স্যার, মেম সাহেব তার প্রেমে ডগমগ আর কি। নাসেরের কথার মাঝখানে বললো শম্ভু।
