এরপর আর দাঁড়াতে পারলো না ওরা, মুখ চুন করে ফিরে চললো নিজেদের ক্যাবিনের দিকে।
নাসের শম্ভু, জম্বু আর জলিল চলে যেতেই বললেন আবু সাঈদ–সত্যি মা, আলম এ জাহাজে আসায় আমাদের বড় উপকার হয়েছে।
কিন্তু তোমার ঐ গুনধরের দল যে তাকে নানাভাবে অপদস্ত করতে চেষ্টা করছে!
অপদার্থ সব!
এতোদিনে বুঝতে পারলে আব্বা।
চলো মা, আলমকে ধন্যবাদ জানিয়ে আসি।
*
বনহুর সবেমাত্র হাত-মুখ পরিস্কার করে ক্যাবিনের খাটিয়ায় দেহটা এলিয়ে দিয়েছে। কেশব তার নিজের খাটিয়ায় বসে আরাম করছিলো–এমন সময় ক্যাবিনে প্রবেশ করেন আবু সাঈদ আর। নীহার।
বনহুর ক্যাপ্টেন আবু সাঈদ ও তার কন্যাকে দেখে শশব্যস্তে উঠে দাঁড়ালো।
কেশবও উঠে পড়লো বনহুরের সঙ্গে।
বনহুর বুঝতে পারলো, নাসের গিয়ে নালিশ জানিয়েছে। সেই কারণে স্বয়ং মালিক এসে। হাজির হয়েছেন কৈফিয়ৎ তলব করতে। বনহুর নতদৃষ্টি তুলে তাকালো মালিকের দিকে। নীহারের সঙ্গেও দৃষ্টি বিনিময় হলো একবার।
বনহুর একটা কঠিন বাক্যের জন্য প্রতীক্ষা করছিলো প্রস্তুতও ছিলো সে জবাব দেবার জন্য। কিন্তু আবু সাঈদ এবং তার কন্যার মুখোভাব লক্ষ্য করে বনহুর একটু আশ্চর্য হয়ে গেলো। পুনরায় চোখ দুটো তুলে ধরলো আবু সাঈদের মুখে।
বিস্ময়কর নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে আছেন আবু সাঈদ।
নীহারের চোখেও অদ্ভুত দৃষ্টি।
বলেন আবু সাঈদ–আলম, তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে এলাম।
ধন্যবাদ! অস্ফুট কণ্ঠে বললো বনহুর।
হাঁ, তোমার মত একজনকে পেয়ে সত্যি আমি শুধু গর্বিত হইনি সার্থক হয়েছি।
মাথা চুলকায় বনহুর–স্যার আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
আলম, নাসেরের মুখে শুনলাম তুমি একা নাকি আমার লাঠিয়ালদের তিনজন জোয়ানকে পরাস্ত করেছে। নাসেরকেও?
বনহুর বিব্রত বোধ করলো, বললো–স্যার, পরাস্ত ঠিক্ নয়। ওদের কবল থেকে আত্নরক্ষা করেছি।
আত্নরক্ষা! তার মানে? বললেন আবু সাঈদ।
ছুটির পর অত্যন্ত গরম বোধ করায় পিছন ডেকে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, সেই সময় ওরা হঠাৎ আমাকে আক্রমণ করে, তাই আমি সামান্য দু’চারটে উত্তম-মধ্যম দিয়েছিলাম এই যা।
সাবাস আলম। আবু সাঈদ বনহুরের পিঠ চাপড়ে দেন।
নীহারের দিকে দৃষ্টি চলে যায় বনহুরের, অপলক নয়নে সে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে চাহনির মধ্যে ফুটে উঠেছে তার অন্তরের শুভেচ্ছার ছাপ। একটা মিষ্টিমধুর হাসির ক্ষীণ আভা। দেখতে পায় বনহুর নীহারের ঠোঁটের কোণে।
আবু সাঈদ এবার বিদায় হন।
চলে যাবার সময় পুনরায় ফিরে তাকায় নীহার বনহুরের দিকে। বনহুরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হয়।
বেরিয়ে যায় ওরা।
কেশব অবাক হয়ে বলে–বাবু, নাসের সাহেব আর লাঠিয়ালরা আপনাকে…
হাঁ, আমাকে ওরা আচমকা আক্রমণ করেছিলো।
আপনি এ কথা মালিককে না জানিয়ে চুপ করেছিলেন! বাবু, আপনারই গিয়ে আগে কথাটা জানানো উচিৎ ছিলো।
আমি জানতাম মালিককে তারাই গিয়ে জানাবে কাজেই আমি নিশ্চুপ ছিলাম।
বাবু, ওরা মিথ্যা সত্য বানিয়ে লাগাতে পারতো তো?
তা নিশ্চয়ই করেছে। কিন্তু সত্য কোনোদিন গোপন থাকে না কেশব! দেখলে তো তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। ওরা গিয়ে নালিশ জানালো অথচ মালিক এসে ধন্যবাদ জানিয়ে গেলেন আমাকে।
কেশব এবার খুশীর হাসি হাসলো।
বনহুর ক্লান্ত দেহটা শয্যায় সম্পূর্ণ মেলে দিয়ে একটা সিগারেট ধরালো। গভীর চিন্তায় ডুবে গেলো–ধীরে ধীরে সব কথা বিস্মৃত হয়ে গেলো সে। নূরীর জন্য মনটা ডুকরে কেঁদে উঠলো, না জানি কোথায় সে বেঁচে আছে কি না–তাও সে জানে না।
নূরীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে যায় বনহুর।
কেশব ঘুমিয়ে পড়ে নিজের বিছানায়।
শয্যা অসহনীয় হয়ে উঠে বনহুরের কাছে, যতই নূরীর কথা স্মরণ হয় ততই মনটা যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠে। শয্যা ত্যাগ করে বেরিয়ে আসে ক্যাবিনের বাইরে। আধো অন্ধকারে চুপ করে দাঁড়ায়, স্থির দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে থাকে সাগরবক্ষে সীমাহীন জলরাশির দিকে।
কতক্ষণ কেটেছে কে জানে, হঠাৎ পিছনে একটা নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পেয়ে ফিরে তাকায় বনহুর। ডেকের আধো অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা না গেলেও বেশ বুঝতে পারলো, তার পিছনে অতি নিকটে দাঁড়িয়ে একটি নারীমূর্তি। বনহুর সোজা হয়ে দাঁড়ালো–মেম সাহেব আপনি!
আরও সরে এলো নীহার, ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো বনহুরের পাশে। চাপা মিষ্টি কণ্ঠে বললো– আলম!
বলুন মেম সাহেব?
এতো রাতেও তুমি ঘুমাওনি কেন?
বনহুর একটা দীর্ঘনিশ্বাস গোপনে চেপে নেবার চেষ্টা করলো; কিন্তু পারলো না, বললো– গোটাদিন বয়লারের পাশে থাকতে হয়, শরীরটা বড় রুক্ষ হয়ে পড়েছে তাই ঘুম আসেনি মেম সাহেব!
আলম!
বলুন!
তোমার জীবনের কাহিনী আমাকে শোনাবে?
একটা বেদনার হাসি হাসলো বনহুর–আমার জীবন-কাহিনী আপনি শুনতে চান মেম সাহেব?
হ।
কিন্তু সে অনেক দীর্ঘ কাহিনী, আপনার ধৈর্য থাকবে না।
কোথায় তোমার দেশ? কে তোমার পিতা-মাতা? কি করে এলে তুমি নদীবক্ষে? দেশে তোমার কে কে আছে?
আজ নয় মেম সাহেব, একদিন আপনার ক্যাবিনে বসে সব বলবো আপনাকে। চলুন আপনাকে ক্যাবিনে পৌঁছে দিয়ে আসি।
এরপর আর দাঁড়াতে পারে না নীহার, বলে চলো।
নীহার এগুলো।
বনহুর তার পিছনে চলতে লাগলো।
হঠৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো নীহার, কিছুটা অগ্রসর হবার পর বললো সে–আলম, তোমাকে। দেখতে কিন্তু নাবিক বলে মনে হয় না। তুমি কি ভদ্রঘরের সন্তান?
