পেট ধরে কুকড়ে বসে পড়লো জলিল, একটা গোঙানি বেরিয়ে এলো জলিলের মুখ দিয়ে।
শম্ভু আর জম্বু জলিলের অবস্থা দেখে একটু ভড়কে গেলেও বনহুরের উপর ঠিকভাবেই আক্রমণ চালিয়ে চললো। নাসের হাঁপিয়ে পড়েছে, বনহুরের এক ঘুষি লেগে দাঁত দিয়ে রক্ত ঝরছে। বুকেও লেগেছে একটা মুষ্ঠাঘাত। পাল্টা আক্রমণের সাহস হচ্ছে না তার! রুমালে দাঁতের রক্ত মুছছে বার বার।
বনহুর বজ্রমুষ্ঠিতে শম্ভু আর জম্বুকে নাজেহাল করে ফেললো, অল্পক্ষণেই লড়াই-এ সাঙ্গ দিয়ে। পালাচ্ছিলো ওরা। জলিল উঠে দাঁড়াতে পারছিলো না তলপেট চেপে ধরে বসেছিলো উবু হয়ে। নাসের তীব্র কটাক্ষে ক্রুদ্ধভাবে বনহুরের দিকে তাকিয়ে জলিলকে ধীরে ধীরে নিয়ে চললো।
বনহুর হেসে উঠলো হা হা করে, তারপর ফিরে গেলো নিজের কেবিনে!
*
নীহার আর আবু সাঈদ সম্মুখ ডেকে দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করছিলো। একটু পূর্বে নীহার আলমের নিকট হতে চলে এসেছে। তখনও তার মনে আলমের সুন্দর হাসির প্রতিচ্ছবি মিশে যায়নি। ওর মিষ্টি গাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠের প্রতিধ্বনি তখনও ভাসছে তার কানে। সন্ধ্যাটা যেন। পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে নীহারের কাছে।
পিতা-পুত্রী মিলে নানারকম কথাবার্তা চলছিলো।
সন্ধ্যার অন্ধকার এখনও জমাট বেঁধে উঠেনি, ডেকের বিজলী বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে বটে কিন্তু আলোর দ্যুতি এখনও আত্নপ্রকাশে সক্ষম হয়নি।
উন্মত্ত হাওয়া বইছে।
নীহারের কাছে সব আজ স্বপ্নময় মনে হচ্ছে। উচ্ছল জলরাশির দিকে তাকিয়ে আছে সে।
আবু সাঈদ চুরুট পান করছিলেন, গায়ে তার একটা পশমী চাদর জড়ানো। গলায় মাফলার, হঠাৎ একটু ঠান্ডা লাগায় শরীরটা আজ ম্যাস ম্যাস করেছে বলেই নীহারের আব্দারে এসব পরিধান করেছেন তিনি। নইলে বড় একটা শরীরের যত্ন নেন না আবু সাঈদ। নীহারের কাছে এজন্য তাকে অনেক সময় অবাধ্য সন্তানের মত অনেক কথা শুনতে হয়। আজ তাই সাবধানে গলায় মাফলারটা বেঁধে শরীরে চাদর জড়িয়ে ডেকে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। অবশ্য নীহার পূর্বেই তাকে এ ব্যাপারে। সতর্ক করে দিয়েছিলো।
আবু সাঈদ খামখেয়ালী মানুষ হলেও কন্যা নীহারের কাছে খেয়ালী না হয়ে পারতেন না। মেয়ের কাছে তিনি হার মারতেন সব কাজে। এমনকি তার পর্যটক জীবনটাও নীহারের বাধ্যের মধ্যে এসে গিয়েছিলো অনেকখানি।
নীহার যদি বলতো–আব্বা, এবার তোমাকে দক্ষিণ দিকে যেতে হবে, তাই যেতে হতো। যদি বলতো পশ্চিমে–তাই স্বীকার করে নিতেন আবু সাঈদ। তবে নিজের বিবেচনা মত বিদেশ সফরে বের হতেন কিন্তু নীহারের মত না নিয়ে তিনি কোনোদিন পা বাড়াতেন না কোথাও। শুধু তাই নয় যে কোনো কাজে কন্যার পরামর্শ তিনি গ্রহণ করতেন।
আজ ডেকে দাঁড়িয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলাপ-আলোচনা না চললেও পিতা-পুত্রীর মধ্যে মাঝে মাঝে সচ্ছ কথাবার্তা হচ্ছিলো।
এমন সময় কয়েকটি পদশব্দে ফিরে তাকায় পিতা-পুত্রী!
সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় না হওয়ায় স্পষ্ট দেখতে পেলেন আবু সাঈদ এবং নীহার–কেমন যেন ছন্নছাড়ার মত এলোমেলো বেশে এগিয়ে আসছে কয়েকজন, সর্বাগ্রে নাসের, তার পেছনে শম্ভু ও জন্ধুর কাঁধে ভর দিয়ে এগুচ্ছে লাঠিয়াল সর্দার জলিল।
প্রথম নজরেই নীহারের মুখ কালো হয়ে উঠলো, ভূকুঁচকে তাকালো সে ওদের দিকে।
আবু সাঈদ বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে আছেন, চোখেমুখে ফুটে উঠেছে তার উদ্বিগ্নতার ছাপ। ক’দিন পূর্বে মকবুলের হত্যাকান্ডে তিনি ভীত না হলেও আতঙ্কিত হয়েছিলেন কিছুটা। আজকাল সামান্যেই তিনি চমকে উঠেন, একটুতেই বেশি ঘাবড়ে যান যেন।
নাসের এবং তার জাহাজের লাঠিয়ালদের আসতে দেখে কয়েক পা এগুলেন সম্মুখে, ব্যস্তকণ্ঠে বললেন–ব্যাপার কি নাসের?
নাসেরের মুখ শয়তানের মুখের মত কুৎসিত হয়ে উঠেছে যেন। নীহারের দিকে একবার তীব্র কটাক্ষে তাকিয়ে দৃষ্টি স্থির করলো আবু সাঈদের মুখে বললো–করুণা দিয়ে যার প্রাণরক্ষা করা হয়েছে সেই অকৃতজ্ঞ আলম কি করেছে দেখুন।
অবাক কণ্ঠে অস্কুট ধ্বনি করে উঠেন আবু সাঈদ আলম!
হাঁ, ছোটলোকদের বেশি লাই দিলে তারা এমনি হয়। তাছাড়া গরিব বেচারী মকবুলকে হত্যা করে আরও স্পর্ধা বেড়ে গেছে তার।
নীহার তীব্রকণ্ঠে বলে উঠে–ভূমিকা রেখে সোজা কথা বলুন? আলম কি করেছে?
হাঁ কি করেছে সে? বললেন আবু সাঈদ।
নাসের বিশাল বপু জলিলের কাঁধে হাত রেখে সহানুভূতির স্বরে বললো–স্যার, এতোবড় অমানুষিক ব্যবহার, সে জলিল ভাই এবং আমাদের উপর করেছে তা কি বলবো! জলিল ভাই এবং আমরা তিন জন–শম্ভু জন্ধু আর আমি ডেকে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম, সেই সময় নাবিক আলম এসে দাঁড়ালো আমাদের পাশে। একটা কথা নিয়ে সে আমাদের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিলো। কিন্তু তর্কে হেরে গিয়ে ক্ষেপে গেলো সে ভীষণভাবে। স্যার, বেচারী জলিল ভাই ও আমাদের সে নাজেহাল করে ছেড়েছে।
খিলখিল করে হেসে উঠে নীহার, তারপর হাসি থামিয়ে বলে–আলম আপনাদের চারজন বীর পুরুষকে নাজেহাল করে ছেড়েছে? সত্যি তাকে বাহবা দিতে হয়।
নীহারের কথায় লজ্জায়, ক্ষোভে কালো হয়ে উঠে নাসের এবং তার সঙ্গীদের মুখ।
আবু সাঈদ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন–তোমরা চারজন অথচ সে একা তোমাদের কাবু করে। ফেললো–আশ্চর্য! তার মুখমন্ডল দীপ্ত হয়ে উঠলো। একটু থেমে বললেন আবু সাঈদ–অমন ব্যক্তিকে সমাদর করতে হয়। নাসের, আজ থেকে তোমরা আলমকে সমীহ করে চলবে, বুঝলে?
