না মেম সাহেব।
আলম, তুমি না বললেও আমি বুঝি–সব বুঝি। আলম?
বলুন মেম সাহেব।
তুমি আর এতো কষ্ট করতে পারবে না। আব্বাকে বলে আমি তোমার জন্য কাজ জুটিয়ে দেবো। মাইনেও বাড়িয়ে দেবো, বুঝলে?
কিন্তু আমি তো নাবিকের কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ জানি না। মেম সাহেব, আপনি আমার জন্য কিছু ভাববেন না। ইঞ্জিনের কাজে আমার কোনো কষ্ট হয় না।
কি যে বলো! এইতো গোটাদিন পর সবে ছুটি পেলে। চেয়ে দেখো দেখি কি অবস্থা হয়েছে তোমার দেহটার।
বনহুর নিজের দেহটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখে নিয়ে হাসবার চেষ্টা করে বলে গরিবের আবার দেহ!
নীহার এতোবেশী সরে এসেছে যে, তার দেহের একটি মিষ্ট গন্ধ বনহুরের নাসিকায় প্রবেশ করছিলো। একটা উগ্র মিষ্ট গন্ধ, চুলগুলো বাতাসে উড়ছে ওর। আঁচলখানা বার বার সরে যাচ্ছিলো। বুকের উপর হতে। বনহুর বললো–চলুন মেম সাহেব, আপনাকে ক্যাবিনে পৌঁছে দিয়ে আসি।
একটু অপেক্ষা করো আলম, কথা আছে তোমার সঙ্গে।
কথা! আমার সঙ্গে?
হাঁ। তোমার সঙ্গে। আলম, জানো এ জাহাজে তোমার কয়েকজন শত্রু আছে? তারা তোমাকে সর্বক্ষণ বিপদে ফেলার জন্য উনুখ।
আমি তো কোনো অপরাধ করিনি?
শয়তানদের কাছে কোনো অপরাধ করতে হয় না আলম, তারা পরের ভালো দেখতে পারে না। তোমার গুণটাই হলো ওদের ঈর্ষার কারণ। আব্বা তোমার কাজ অনেক পছন্দ করেন তাই…
হাসে বনহুর।
নীহার অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে। বনহুর ফিরে তাকায়, ওর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই দৃষ্টি নত করে নেয় নীহার। বুদ্ধিদীপ্ত অন্তর্ভেদী যেন সে চোখ দুটি। নীহার কোনো কথা বলতে পারে না সহসা।
বনহুর নীহারের মনের দুর্বলতা উপলব্ধি করে, বুঝতে পারে–নীহার তার মনের আসনে প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে তাকে–কিন্তু এ তার কত বড় ভুল জানে না! বনহুর নীহারের মুখে স্থির দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে। দেখতে চায় সে, ওর মায়ামমতায় ভরা সুন্দর অন্তরটাকে। যে অন্তর ফুলের চেয়েও পবিত্র, জ্যোছনার আলোর চেয়েও স্নিগ্ধ, শিশিরের চেয়েও সচ্ছ।
বনহুর নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে আছে নীহারের সুন্দর মুখমন্ডলের দিকে।
নতমুখে দাঁড়িয়েছিলো নীহার; চোখ তুললো–পুনরায় বনহুরের সঙ্গে চোখাচুখি হলো। নীহারের মনের মধ্যে একটা আনন্দের অনুভূতি বিদ্যুতের মত খেলে গেলো। লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো ওর গন্ড দু’টি। আর দাঁড়াতে পারলো না সে বনহুরের সম্মুখে, একটু হেসে দ্রুত চলে গেলো সেখান থেকে।
বনহুর প্যান্টের পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরলো, ঠিক সেই সময় নাসেরের সঙ্গে শম্ভু, জম্বু আর জলিল এসে দাঁড়ালো। লাঠিয়ালদের আর একজন হলো জলিল।
সেদিন শম্ভু আর জম্বুর মুখে তাদের নাকানি চুবানির কথা শুনে জলিল পাহলওয়ান ক্ষেপে গেলো ভীষণভাবে। একটা সামান্য নাবিক বেটার কাছে তারা এতো বড় বড় শক্তিশালী জোয়ান লোক হয়ে হুমড়ি খেলো! ছিঃ ছিঃ কি লজ্জার কথা! জলিল স্বয়ং সুযোগ বুঝে তাদের সঙ্গে এসেছে, আজ সে একাই দেখে নেবে নাবিক আলমকে।
শম্ভু আর জম্বুর চেয়ে জলিলের দেহ আরও বলিষ্ঠ। দেহের বিশিষ্ট বিশিষ্ট অংশের মাংশপেশীগুলো যেন লৌহপিন্ডের মত শক্ত আর দলা হয়ে রয়েছে। খাড়াখাড়া এক জোড়া গোঁফ ক্ষুদে গোল গোল লাল চোখ! আকারে লম্বা নয়, বেটে গোছের চেহারা।
নাসের সম্মুখে আর ওরা তিনজন বনহুরের তিন পাশে দাঁড়ালো। এক একজনের চোখ দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে। হিংস্র জন্তু শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বার পূর্বে যেমন ভীষণ আকার ধারণ করে তেমনি ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে শম্ভু, জম্বু আর জলিল এসে দাঁড়ালো।
বনহুর সিগারেটে সবেমাত্র অগ্নিসংযোগ করেছে, মুখের কাছ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিলো ওদের চারজনার মুখে, ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো রেলিং এ। সিগারেট থেকে একমুখ ধুয়া টেনে নিয়ে সম্মুখে ছুঁড়ে দিলো নিশ্চিন্ত মনে। সিংহ যেমন ক্রুদ্ধ শিয়ালের দিকে অবহেলা করে তাকিয়ে দেখে তেমনি শান্ত ভাব নিয়ে তাকালো।
বনহুরের তাচ্ছিল্য ভাব দেখে নাসের এবং তার সঙ্গীদের দেহ জ্বালা করে উঠলো। ক্রমান্বয়ে ফুলে উঠতে লাগলো শম্ভু, জম্বু আর জলিলের মাংসপেশীগুলো।
জাহাজের এদিকটা সম্পূর্ণ নির্জন, আশেপাশে বা অনতিদূরে কেউ নেই। বনহুর কাজ শেষে প্রায়ই এই পাশে এসে দাঁড়াতে নিরালায় গভীরভাবে চিন্তা করার অবকাশ পেতো সে।
আজও তাই প্রতিদিনের মত কাজ শেষ করে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। ইঞ্জিন কামরায় এখন অন্যজনের ডিউটি আছে তাই সে কতকটা নিশ্চিন্ত। অবশ্য কয়েক ঘন্টা পর আবার তাকে যেতে হবে ইঞ্জিন কামরায়।
বনহুর ওদের দেখেও যেন দেখছে না, এমনি ভাব নিয়ে সিগারেট পান করছিলো।
জলিল হঠাৎ চেপে ধরলো বনহুরের গলার কাছের জামাটা। কর্কশ কণ্ঠে বললো–ঘুঘু দেখেছো ফাঁদ দেখোনি, বাছাধন!
বনহুর দক্ষিণ হস্তের সিগারেটটা নিক্ষেপ করলো, তারপর সঙ্গে সঙ্গে প্রচন্ড এক ঘুষি বসিয়ে দিলো জলিলের নাকে।
অমনি হুমড়ি খেয়ে পড়লো জলিল ডেকের মেঝেতে।
কালবিলম্ব না করে শম্ভু, জম্বু আর নাসের চেপে ধরলো বনহুরকে। জলিলও ততক্ষণে উঠে এসে ধরেছে, বনহুরের মুখমন্ডল লক্ষ্য করে ঘুষি মারলো জলিল। বনহুর দক্ষিণ হস্তে জলিলের মুষ্ঠিবন্ধ হাতখানা চেপে ধরলো এটে। বনহুর এবার এক ঝটকায় ওদের তিনজনার কবল থেকে নিজকে মুক্ত করে নিয়ে রুখে দাঁড়ালো। তারপর শুরু হলো ভীষণ লড়াই। এক এক ঘুষিতে এক একজনকে ভূতলশায়ী করতে লাগলো। প্রচন্ড এক লাথি দিয়ে কাবু করে ফেললে জলিলকে। বনহুরের বুটের লাথি যেয়ে লেগেছিলো ঠিক জলিলের তলপেটে।
