শম্ভু যখন কথাগুলো বলছিলো তখন কণ্ঠ যেন কেমন আটকে আসছিলো তার। মনে মনে। নাসের ওর কথায় রাগান্বিত হচ্ছিলো, শম্ভুর কথা শেষ না হতেই বললো নাসের–ওর পূর্বেই আমি ক্যাবিনে প্রবেশ করেছিলাম। স্যার, আমি নিজের চোখে দেখেছি, আলম মকবুলের বুক থেকে ছোরাখানা টেনে তুলে নিচ্ছে। নাবিক আলমই ওকে হত্যা করেছে স্যার।
নীহার তীব্র কণ্ঠে বলে উঠলো–আব্বা, নাসের সাহেব যা বলছেন–সম্পূর্ণ মিথ্যা। কারণ। মকবুলের বুকে ছোরার আঘাত ছিলো না, আঘাত ছিলো পিঠে অথচ উনি বলছেন মকবুলের বুক থেকে নাবিক আলমকে তিনি ছোরা তুলে নিতে দেখেছেন।
নীহারের কথায় একটু ভড়কে যায় নাসের, দ্রুত বলে উঠে–সরি, বলতে একটু ভুল হয়েছে, মানে আমি ঠিক লক্ষ্য করতে পারিনি, মকবুলের রক্তাক্ত দেহের দিকে তাকিয়ে আমি জ্ঞানশূন্যের মত দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। নীহার পুনরায় বলে উঠলো–এমনও তো হতে পারে কেউ মকবুলকে ছোরাবিদ্ধ করেছিলো, আলম তাকে বাঁচানোর জন্য ছোরাখানা তার দেহ থেকে টেনে তুলে ফেলছে–সেই মুহূর্তে আপনারা সেখানে গিয়ে হাজির হয়েছেন।
নাসেরের সঙ্গে পুনরায় দৃষ্টি বিনিময় হলো শম্ভুর।
বললো নাসের–এ জাহাজে মকবুল মিয়ার সঙ্গে কারো কোনোরকম দুশমনি ছিলো না। সরল স্বাভাবিক নাবিক ছিলো সে। জাহাজের ছোট বড় সবাই তাকে ভালবাসতো। স্যার, আপনি বলুন, অন্য কেউ কেন তাকে হত্যা করবে?
বললেন আবু সাঈদ–আর নাবিক আলমই বা তাকে হত্যা করতে যাবে কেন? তার সঙ্গে কোনোরকম প্রতিহিংসা ছিলো বলে মনে হয় না আমার।
স্যার, আপনি একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন ব্যাপারখানা।
তার মানে? বললেন আবু সাঈদ।
ব্যাপারখানা অত্যন্ত স্বাভাবিক স্যার, শুধু আমি আর শম্ভুই নয়, জাহাজের অনেকেই জানে– নাবিক আলম এ জাহাজে আশ্রয় পাবার পর থেকে তার মনোভাব, সে হেড নাবিকের পদে বহাল হয় এবং সেই কারণেই দিবারাত্র অবিশ্রান্ত খাটুনি করে সকলের মন জয় করে নেবার চেষ্টা করে– বিশেষ করে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করাই ছিলো তার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু সে শেষ অবধি বুঝতে পেরেছিলো, মকবুল মিয়া থাকা পর্যন্ত হেড নাবিক পদে বহাল হবার তার কোনো আশা নেই। কাজেই মকবুল মিয়াকে সরাতে না পারলে…
নাসের সাহেব, আপনি যা বলছেন সে ধরনের লোক নয় আলম। সে কখনো হেড নাবিক হবার জন্য লালায়িত ছিলো না। নীহার রুদ্ধ কণ্ঠে কথা কয়টা বললো।
নাসের নীহারের কথায় ভিতরে ভিতরে ভীষণ রাগান্বিত হলেও নিজেকে সংযত রেখে শান্ত কণ্ঠে বললো–তার যদি হেড নাবিক হবার সাধই না থাকতো সে নিজে যেচে মকবুলের কাজ করতে এগিয়ে যেতো না। এতেই বোঝা যায়, সে লালায়িত ছিলো কিনা।
আবু সাঈদ বললেন এবার–নাসের তুমি ভুল বলছো। কারণ আলমকে আমিই সেধে তবে হেড নাবিকের কাজ দিয়েছি, সে কখনো হেড নাবিক হতে চায়নি বা সে জন্য কোনো বেশি পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেও রাজি নয়।
নাসের ব্যঙ্গপূর্ণ হাসি হাসলো, বললো আবার–বেশ, যা ভাল মনে করেন সেই ভালো। পুনরায় যেদিন আবার মহা অঘটন ঘটবে তখন দেখবেন আমার কথা মনে পড়বে।
আবু সাঈদ বললেন–তোমরা এতগুলো আমার হিতৈষী আপন জন থাকতে একা আলমের সাধ্য কি সে কোনো অঘটন ঘটায়। তোমরা এখন যেতে পারো নাসের। পর্যটন’ যতদিন না স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছে ততদিন আমাকে ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করতেই হবে।
এরপর নাসের আর শম্ভু দাঁড়াতে পারে না, বেরিয়ে যায় ধূর্ত শিয়ালের মত লেজ গুটিয়ে।
নীহার ওদের চলে যাওয়ার পর পিতাকে লক্ষ্য করে বলে–আব্বা, ওদের কথা তুমি কখনো বিশ্বাস করো না। বেচারী আলম সত্য ও মহৎ ব্যক্তি।
হা মা, ওকে আমার ভাল লাগে, আহা বড় গরীর বেচারী! যেমন সরল তেমনি অমায়িক। গরিবের ঘরে জন্মালেও চেহারাটা যেমন সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তানের মত।
পিতার মুখে নাবিক আলমের প্রশংসা বাণী যেন নীহারের কানে মধুবর্ষণ করে। মাথা নিচু করে নিজের মনের দুর্বলতা গোপন করার চেষ্টা করে সে।
*
দীর্ঘ কয়েক ঘন্টা ইঞ্জিনে কাটানোর পর ছুটি পেয়ে বেরিয়ে এলো বনহুর। সমস্ত দেহ তেল কালি মাখা, হাতে একটি কালি মাখা রুমাল। ঘর্মাক্ত দেহটা জুড়িয়ে নেবার জন্য ডেকের রেলিং এর ধারে এসে দাঁড়ালো সে। রেলিং-এ ভর দিয়ে তাকিয়ে রইলো ফেনিল ঘোলাটে জলরাশির দিকে।
সাগরের মুক্ত বাতাসে অল্পক্ষণেই ক্লান্তি দূর হলো কিন্তু তখন বনহুরের মনের আকাশ একটা দুর্দমনীয় চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে এসেছে। নূরীর অন্তর্ধান নিয়ে গভীরভাবে ভেবে চলেছে সে। নূরীর আশা হয়তো এবার তাকে চিরদিনের মত ত্যাগ করতে হবে। আর কোনোদিন ওকে পাবে বলে মনে হয় না। সাগরের পানিতে যেন ওর করুণ মুখখানাই ভাসছে। কলকল ছলছল ধ্বনির মধ্যে সে যেন শুনতে পাচ্ছে নূরীর আকুল কণ্ঠের ক্রন্দনের শব্দ। বনহুরের চোখ দুটো অশ্রু ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে।
আলম, তুমি কি ভাবছো?
একি, মেম সাহেব আপনি?
নীহার বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ায়, বলে–হাঁ, কি ভাবছিলে আলম?
বনহুর হাতের পিঠে চোখ দুটো মুছে নিয়ে সোজা হয়ে বলে–গত জীবনের কথা স্মরণ। হচ্ছিলো তাই…
তাই খুব দুঃখ হচ্ছিলো মনে বুঝি?
বনহুর নিশ্চুপ থাকে।
নীহার বলে আবার–সমস্ত দিন ইঞ্জিনের গনগনে বয়লারের পাশে কাটাও–খুব কষ্ট হয়, তাই না?
