নাসেরের মুখমন্ডলে একটা প্রতিহিংসার ছায়াপাত হলো, কঠিন হয়ে উঠলো তার মুখ, বললো সে–ঐ দুষ্ট হত্যাকারী যদিও সকলের দৃষ্টির অন্তরালে আত্নগোপন করতে সক্ষম হয়েছে কিন্তু আমার চোখে সে ধুলো দিতে পারেনি।
আচমকা বোমা বিস্ফোরণের শব্দে মানুষ যেমন চমকে উঠে তেমনি নাসেরের কথাটা তার গলা থেকে বের হবার সঙ্গে সঙ্গেই আবু সাইদ এবং নীহার চমকে ফিরে তাকালো।
বিস্মিত নীহারের সমস্ত দেহের রক্ত যেন থেমে গেছে শিরায় শিরায়।
আবু সাঈদ অস্কুট ধ্বনি করে উঠলেন–মকবুলের হত্যাকারী কে, তুমি তা জানো?
নাসেরের মুখে একটা বিকৃত হাসির ঢেউ খেলে গেলো বললো নাসের–স্যার, নিজের চোখে দেখা, কাজেই বলতে আমার কোনো অসুবিধা নেই।
স্তব্ধ নিশ্বাসে তাকিয়ে আছেন আবু সাঈদ আর নীহার ওর ভাবকঠিন মুখখানার প্রতি। এই মুহূর্তে জানতে পারবে তারা মকবুলের হত্যাকারীর নাম। কি ভয়ঙ্কর নরপিশাচ সে, যে ব্যক্তি বৃদ্ধ নাবিকের বুকে ছোরা বিদ্ধ করেছিলো।
বললো নাসের–যাকে আমরা সদ্য মৃত্যুর কবল থেকে উদ্ধার করে আমাদের জাহাজে আশ্রয় দিয়েছি…একটু থেমে বললো আবার সেই নরাধম অকৃতজ্ঞ আলম।
ক্যাবিনে বাজ পড়লেও এতোটা স্তম্ভিত হতেন না আবু সাঈদ ও নীহার। মুহূর্তে মুখ কালো হয়ে উঠলো আবু সাঈদের, বললেন–নাবিক আলম মকবুলের হত্যাকারী–বলো কি!
হাঁ। দৃঢ় কণ্ঠে বলতে চাইলো নাসের কিন্তু গলাটা কেমন ফ্যাসফ্যাসে শোনালো।
মিথ্যা কথা! চিৎকার করে বললো নীহার। তার সমস্ত মুখে ফুটে উঠেছে একটা অবিশ্বাসের ছাপ।
নাসেরের মিথ্যা বলা অভ্যাস–তবু সেদিনের আলমের যে দুর্দান্ত রূপ সে লক্ষ্য করছিলো, তার নামে এতোবড় একটা জলজ্যান্ত মিথ্যা বলতে একটু ভড়কে গেলো বইকি, তবু বললো– শুধু আমিই নই, শম্ভু নিজেও দেখেছে।
শম্ভু! আমাদের লাঠিয়াল সর্দার শম্ভু?
হা। জবাব দিলো নাসের।
আবু সাঈদ তার জাহাজে শুধু পর্যটকগণকেই সাদরে গ্রহণ করেননি, তাঁর জাহাজে সবরকম ব্যক্তিই তিনি গ্রহণ করেছেন। বাবুর্চি থেকে লাঠিয়াল, তীরন্দাজ, বন্দুকধারী, সবরকম লোক আছে। কারণ তাকে পর্যটক হিসেবে নানা দেশে নানা স্থানে অবতরণ করতে হয়। কখন কোন্ বিপদ আসে বোঝা মুস্কিল, এজন্যই তিনি সতর্কতার সঙ্গে সাবধানতা রক্ষা করে চলেন। শুধু শম্ভুই নয়, আরও বেশ কতকগুলো শক্তিশালী লোককে তিনি মোটা বেতন দিয়ে নিজেদের রক্ষাকারী হিসাবে জাহাজে রেখেছেন। এরা শুধু বসে বসে মনিবের খাদ্য গলধঃকরণ করবে আর মাস শেষে বেতনের টাকা পকেটস্থ করবে। কাজ বিপদ কালে, অন্যসময় নয়।
অবশ্য আবু সাঈদ পূর্বে এমন সাবধান ছিলেন না, তিনি বিনা অস্ত্রে ও দেশ পর্যটন করেছেন কতবার। কিন্তু একবার তিনি একটা অদ্ভুত দেশে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন, যেখানে আবু সাঈদ পর্যটক হিসাবে সমাদর না পেয়ে পেয়েছিলেন নানারকম বাধা-বিপত্তি। এমনকি সে দেশের বাসিন্দাগণ ভীষণভাবে আক্রমণ করে আহত করেছিলেন তাঁকে এবং তার কতকগুলো সঙ্গী সাথীকে। দু’জন নিহতও হয়েছিলো সেবার। তাছাড়া আরও কতবার যে কত বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে আবু সাঈদকে, তার ইয়ত্তা নেই। কাজেই আবু সাঈদ আত্নরক্ষার জন্য সবরকম জাহাজে অস্ত্রশস্ত্র এবং বেশ কিছুসংখ্যক বলিষ্ঠ লোক রাখতেন।
শম্ভু আবু সাঈদেরই লাঠিয়াল বিভাগের একজন সর্দার।
আবু সাঈদ বললেন–শম্ভুও দেখেছে?
বাইরেই আছে সে, আমি ডাকছি। উচ্চকণ্ঠে ডাকলো নাসের–শম্বু!
আজ্ঞে? জবাব এলো ক্যাবিনের দরজার ও পাশ থেকে।
এসো। বললো নাসের।
ভীমকায় লাঠিয়াল সর্দার শম্ভু প্রবেশ করলো নতমুখে ক্যাবিনের মধ্যে। লম্বা একটা ছালাম ঠুকে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
যেন সে আদালতের বিপক্ষপাতী সাক্ষী।
আবু সাঈদ পুনরায় আসন গ্রহণ করলেন। তিনি নাসেরের মুখে আলম হত্যাকারী কথাটা শুনে উঠে পড়েছিলেন আসন গ্রহণ করে বললেন–শম্ভু মকবুলের হত্যা সম্বন্ধে তুমি কিছু জানো?
অপরাধীর দৃষ্টি নিয়ে তাকায় শম্ভু আবু সাঈদের মুখে, তারপর দৃষ্টি নত করে নিয়ে বলে–হাঁ, আমি দেখছি হুজুর।
দেখেছো! আলম…নাবিক আলম মকবুলকে হত্যা করেছে, তুমি দেখেছো?
পিতার সঙ্গে সঙ্গে নীহারের দৃষ্টিও স্থির হয় শম্ভুর মুখের উপর। নীহারের নিশ্বাস দ্রুত বইছে। যা শুনছে সম্পূর্ণ যেন অস্বাভাবিক এবং মিথ্যা। নাবিক আলম কেন হত্যা করবে বৃদ্ধ নাবিক মকবুলকে ভেবে পায় না সে। বুকের মধ্যে একটা তীব্র আলোড়ন শুরু হয়েছে তার।
শম্ভু একবার নাসেরের মুখে তাকিয়ে দেখে নিলো, চোখ মিলালো দু’জনা, তারপর বললো সে হুজুর, আমি নিজের চোখে…
কঠিন কণ্ঠে গর্জে উঠলো নীহার–খবরদার, মিথ্যা কথা বলো না।
মিথ্যা–না না, মিথ্যা বলব না মেমসাহেব। যা দেখেছি–যা দেখেছি–আমি ঠিক তাই বলবো।
কি দেখেছোবলো? বললেন আবু সাঈদ।
শম্ভু তার বক্তব্য পেশ করবার পূর্বে একবার ক্যাবিনের দরজার দিকে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। যার সম্বন্ধে বলতে যাচ্ছে, সে যদি হঠাৎ এসে পড়ে তাহলে বিভ্রাট ঘটা অস্বাভাবিক নয়। সেদিন শম্ভু তার কিছুটা পরিচয় পেয়েছে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তার মুখের কাছে হাত নিয়ে একটু কেশে গলাটা পরিস্কার করে নিলো, তারপর বললো–আলম আর মকবুল মিয়ার মধ্যে কি যেমন কথা নিয়ে তর্ক হচ্ছিলো। হঠাৎ একটা গোঙ্গানির শব্দ শুনতে পেয়ে আমরা ছুটে যাই…আবার একবার নাসেরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হলো শম্ভুর কিন্তু কণ্ঠ বন্ধ হয় না, বলেই চলে সে–আমরা ছুটে গিয়ে দেখতে পাই–মকবুলের দেহটা মেঝেতে পড়ে রয়েছে, ওর বুক থেকে রক্ত ঝরছে– আলমের হাতে একখানা সূতীক্ষ্ণ ধার ছোরা…।
