আবু সাঈদের বন্ধুবর রব্বানী রিজভী নিজেও একজন অভিজ্ঞ প্রবীন বৈজ্ঞানিক। তিনিও এ দ্বীপ সম্বন্ধে অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে এ দ্বীপে গিয়েছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে এসেছেন তিনি। গভীর রাতে আলোকরশ্মি এবং সেই বিস্ময়কর শব্দ সম্বন্ধে কোনোরকম রহস্য উদ্ঘাটনে সক্ষম হননি।
এই ফৌজিন্দিয়া দ্বীপ সম্বন্ধে নানাজন এখন নানারকম বাক্য উচ্চারণ করে চলেছে। নানা জনের নানা মতবাদ-স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত না হওয়া পর্যন্ত কারো স্বস্তি নেই। বিশেষ করে ভূতত্ত্ববিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদগণ ব্যতিব্যস্তভাবে সন্ধান চালিয়ে চলেছেন কিন্তু আজও কোনো কিছু আবিষ্কারে সক্ষম হননি।
রহস্যময় দ্বীপটি মানুষের মনে জাগিয়ে তুলেছে এক গভীর সমস্যাময় প্রশ্ন। এক উন্মত্ত বাসনা আকর্ষণ করে নিয়ে চলেছে প্রতিটি বিশেষজ্ঞ মহানকে।
আবু সাঈদ তাদেরই একজন।
মকবুল মিয়ার নির্মম মৃত্যু তাঁকে বিচলিত করলেও তিনি তাঁর সঙ্কল্পে অটল রইলেন। তিনি মকবুলের মৃত্যু সম্বন্ধে সকলকে শান্ত হবার জন্য অনুরোধ জানালেন।
*
জাহাজ চলেছে বটে কিন্তু হেড নাবিকের স্থানে এখনও কাউকে মঞ্জুর করা হয়নি। উপস্থিত হেড নাবিকের কাজ চালাচ্ছে নাবিক আলম–স্বয়ং দস্যু বনহুর।
বনহুর মকবুলের মৃত্যু স্বচক্ষে দেখেছে এবং তার মৃত্যু-যন্ত্রণা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছে। মকবুলের মৃত্যুর কারণ যে কি, সঠিক না জানতে পারলেও তার মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে যে মুখোভাব এবং তার অস্থিরতা লক্ষ্য করেছে তা অত্যন্ত রহস্যময়। বনহুর কিছুটা যে একেবারে বুঝতে পারেনি তা নয়। মকবুলের মৃত্যুকালের শেষ উক্তিগুলোর প্রতিটা শব্দ তার মনে গাঁথা হয়ে আছে…আলম…আমাকে…নয় তোমাকে হত্যা করতে …কথা শেষ করতে পারেনি বেচারী। মকবুল তাকে কিছু বলতে যাচ্ছিলো, সেই কারণেই ওকে হত্যা করা হয়েছে এবং কে-বা কারা হত্যা করেছে তাও সে জানে, যদিও ছোরা নিক্ষেপকারী তার দৃষ্টির আড়ালে ছিলো।
বনহুর শুধু অসীম শক্তির অধিকারীই নয়, তার সূক্ষ্ণ বুদ্ধির কাছে অতি তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমানকেও হার মানতে হয়। বনহুর এতো জেনেও কেন নীরব রইলো? পারতো না কি সে সব কথা আবু সাঈদকে খুলে বলতে, কিন্তু বনহুর এ রহস্য উদঘাটন করতে ইচ্ছুক নয়। সে নিজ হস্তে প্রবীণ নাবিক মকবুলের হত্যাকারীকে সায়েস্তা করতে চায়। কাজেই বনহুর নীরব থেকে নিজ কাজ করে চললো
*
বনহুর যখন এতো জেনে এবং দেখেও নাসের সম্বন্ধে বাকহীন রইলো তখন শৃগালের মত সেজে নাসের আবার নতুন এক দূরভিসন্ধি নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করলো।
নীহার এবং আবু সাঈদের মনে সন্দেহ জাগানোর জন্য একদিন নাসের তার এক অনুচরকে নিয়ে হাজির হলো ক্যাপ্টেনের ক্যাবিনে। ক্যাপ্টেন আবু সাঈদ এবং নীহার জাহাজের মধ্যে পাশা পাশি দুখানা সোফায় বসে চা পান করছিলেন। নাসের ক্যাবিনে প্রবেশ করতেই আবু সাঈদ তাকে আপ্যায়ন করালেন–এসো এসো, নাসের বসো!
নাসের আসন গ্রহণ করলো।
তার সঙ্গী লোকটিকে ক্যাবিনের বাইরে অপেক্ষা করতে বলে এসেছে সে, কাজেই লোকটি দাঁড়িয়ে রইলো দরজার ওদিকে।
আবু সঈদের মুখমন্ডল ভাবগম্ভীর থমথমে লাগছে।
নীহার ক্যাবিনের জানালা দিয়ে তাকালো বাইরে সীমাহীন আকাশের দিকে। নাসেরকে সে যেন দেখেও দেখলো না। সম্মুখস্থ টেবিল থেকে চানাচুর নিয়ে দু’একটা ফেলতে লাগলো। মুখগহ্বরে। চিবুতে লাগলো যেন অনিচ্ছাসত্ত্বে।
জাহাজের একটানা ঝকঝক শব্দের সঙ্গে জলতরঙ্গের কলকল খলখল শব্দ মিলে অদ্ভুত এক সুরের সৃষ্টি হচ্ছিলো। আবু সাঈদ সিগারেটটা পান করছিলেন; একরাশ ধুমকুন্ডলীর ভিতর দিয়ে তাকালেন তিনি নাসেরের মুখে নাসের, আমি বড় দুশ্চিন্তিত।
অনুগত ছাত্রের মত হাতের মধ্যে হাত কচলায় নাসের, কিছু বলতে চায় যেন, কিন্তু বলতে গলায় আটকে যাচ্ছে–অবশ্য এটা নাসেরের অহেতুক একটা অভিনয়ের ঢং মাত্র। ভূ জোড়া উঁচু করে এবার দেখে নিলো সে নীহারের মুখখানা, তারপর বললো–দুশ্চিন্তার কারণই বটে স্যার। সমস্ত জাহাজময় একটা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
হাঁ, এই হত্যাকান্ড শুধু সমস্ত জাহাজেই আতঙ্ক সৃষ্টি করেনি নাসের, আমাকে কতখানি যে দমিয়ে দিয়েছে তা কি বলবো! আবু সাঈদের ললাটের রেখাগুলি যেন দড়ির মত শক্ত হয়ে উঠে। গভীর অশান্তির ছায়া প্রকাশ পায় তার চোখেমুখে।
নাসের মাথা নিচু করে, আবু সাঈদের অন্তরের বেদনার ছাপ যেন তার মনেও আঁচড় কেটেছে এমন একটা ভাব মুখে টেনে ঢোক গিলে বলে নাসের–স্যার, এতোবড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেলো যার জন্য আমাদের জাহাজের প্রতিটি যাত্রী ভীত আতঙ্কিত। অথচ সেই হত্যাকান্ডের। অধিনায়ক নিশ্চিন্ত মনে এ জাহাজেই বিচরণ করে ফিরছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস গোপনে চেপে বললেন আবু সাঈদ–হাঁ, সে এ জাহাজেই আছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
স্যার, এতোবড় একটা নৃশংস হত্যা করেও সে আমাদের জাহাজে আশ্রয় নিয়ে তার মনস্কামনা পূর্ণ করে চলেছে, অথচ তাকে এভাবে প্রশ্রয় দেওয়া মোটেই উচিত হচ্ছে না।
নাসের কথাটা এমনভাবে শেষ করলো যেন সে হত্যাকারীর সঠিক সন্ধান জানে।
আবু সাঈদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তুলে ধরলেন নাসেরের দিকে। তারপর অর্ধদগ্ধ সিগারেটটা সম্মুখস্থ এ্যাসট্রেতে গুঁজে রেখে সোজা হয়ে বসে বললেন–মকবুলের হত্যাকারীর সঠিক সন্ধান এখনও উদঘাটন হয়নি, কাজেই আমি কি করতে পারি বলো?
