বনহুর মকবুলের মৃতদেহের পাশ থেকে উঠে দাঁড়ায়, সরে আসে নাসেরের সম্মুখে, গম্ভীর কণ্ঠে বলে সে–আমি ওকে হত্যা করিনি।
হাঃ হাঃ হাঃ এখনও তোমার হস্তে সূতীক্ষ ধার ছোরা বিরাজ করছে, আর তুমি বলছো ওকে হত্যা করোনি?
না।
কিন্তু কি প্রমাণ আছে যে তুমি ওকে হত্যা করোনি?
আমি নিজেই প্রমাণ। আমি নিজে জানি আমি হত্যা করিনি।
আমরা জানি, তুমিই মকবুলকে হত্যা করেছো, কারণ তুমি হেড নাবিক হতে চাও।
মিথ্যা কথা, আমি হেড নাবিক হতে চাই না। ছোরাখানা দূরে নিক্ষেপ করলো বনহুর।
নাসের তার সঙ্গীদ্বয়কে ইংগিত করলো।
সঙ্গে সঙ্গে শম্ভু আর জম্বু জাপটে ধরলো বনহুরকে। মনে করলো ওরা এই সময় জাহাজে মালিকের দল কেউ নেই, কাজেই আলমকেও হত্যা করে ফেলবে এবং মালিককে জানাবে– মকবুল আর আলম মারামারি করে নিহত হয়েছে।
শম্ভু আর জন্ধু নাবিক আলমকে জাপটে ধরতেই এক ঝটকায় সে ওদের দু’জনাকে মেঝেতে ফেলে দিলো।
বিস্ময়ে দু’চোখ গোলাকার হলো নাসেরের। সে জানে, শম্ভু আর জম্বুর মত বীর শক্তিশালী। লোক তাদের জাহাজে আর নেই। কিন্তু যে মুহূর্তে আলম ওদের দু’জনাকে এক সঙ্গে ভূতলশায়ী করলো তখন নাসের শুধু অবাক হলো না, মনে মনে ভীতও হলো।
ততক্ষণে শম্ভু আর জম্বু উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের ধুলো ঝাড়া দিলো। নাসের উবু হয়ে যেমন। ছোরাখানা হাতে উঠিয়ে নিতে যাবে, অমনি বনহুর ওর হাতের উপর পা দিয়ে চেপে ধরলো– খবরদার!
নাসের ছোরা ত্যাগ করতেই বনহুর পা সরিয়ে নিলো।
আর এক মুহূর্ত ওরা দাঁড়ালো না, বেরিয়ে গেলো ক্যাবিন থেকে।
বনহুর মকবুলের মৃত্যুমলিন মুখখানার দিকে তাকিয়ে দেখলো–বুঝতে পারলো, এর হত্যার পিছনে রয়েছে গভীর এক রহস্য। সে আর বিলম্ব না করে নেমে গেলো মেরুদা বন্দরে। আবু। সাঈদ ও নীহার তখন ঘুরে ফিরে সব দেখছিলেন। হঠাৎ তারা আলমকে উত্তেজিত অবস্থায় দেখে বিস্মিত হলেন বললেন আবু সাঈদ–ব্যাপার কি আলম?
স্যার, আপনি জাহাজে আসুন, জরুরি প্রয়োজন আছে।
আবু সাঈদ, নীহার এবং অন্যান্য পর্যটক সবাই ব্যস্তভাবে জাহাজে ফিরে এলেন।
বনহুর হেড নাবিকের মৃত্যু সম্বন্ধে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে শোনালেন। শুধু নাসের ও তার অনুচরদ্বয়ের আক্রমণের কথা সম্পূর্ণ গোপন রেখে দিলো সে।
আবু সাঈদ প্রবীণ নাবিক মকবুলের নির্মম মৃত্যুতে অত্যন্ত বিচলিত হলেন। কে, কেন তাকে। হত্যা করলো–ভেবে অস্থির হলেন তিনি। হত্যাকারী যে তার জাহাজেই আছে তা সহজেই। বুঝতে পারলেন। কিন্তু আবু সাঈদ বেশি ঘাবড়ালেন না, কারণ মেরুন্দা বন্দরের পুলিশ মহল এ। সংবাদ অবগত হলে তাদের যাত্রায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে। কাজেই ঘটনাটা চেপে যাওয়াই সমীচীন মনে করলেন।
তাদের জাহাজের নাবিক মকবুলের মৃত্যু স্বাভাবিক বলে তিনি ঘোষণা করলেন এবং তাকে। মেরুলায় কবরস্থ করবার জন্য আদেশ দিলেন।
যে অফুরন্ত আনন্দ নিয়ে পর্যটন মেরুন্দায় ভিড়েছিলো সে আনন্দ আর কারো মনে রইলো না। পর্যটনের যাত্রিগণের মনে একটা আতঙ্ক সৃষ্টি হলো। কে হত্যা করলো বৃদ্ধ নিরীহ নাবিক বেচারীকে?
বিশেষ করে নীহার আরও ভীত হয়ে পড়েলো। মকবুলের মৃত্যুদৃশ্য তাকে একেবারে ভয় বিহ্বল করে তুলেছে।
মেরুলায় কয়েকদিন থাকবেন মনে করেছিলেন আবু সাঈদ, কিন্তু তা আর হলো না–একদিন পরেই মেরুন্দা ত্যাগ করতে হলো তাকে। উদ্দেশ্য, এখন ফৌজিন্দিয়া দ্বীপের দিকে যাবেন, কিন্তু এতোবড় একটা রহস্যজনক হত্যাকান্ডের পর পর্যটক দলের মধ্যে বেশ কিছুটা চাঞ্চল্যতার ছাপ পরিস্ফুটিত হয়ে উঠলো। কিন্তু আবু সাঈদের মুখের উপর কেউ কোনো উক্তি উচ্চারণে সক্ষম হলো না। প্রবীণ পর্যটক আবু সাঈদ অবশ্য এ ব্যাপারে নিত্যন্ত মুষড়ে পড়লেও তার ইচ্ছা অটুট রাখবেন। আবু সাঈদ ছিলেন যেমন সরল-স্বাভাবিক তেমনি ছিলেন এক জেদী মানুষ। শত বাধা বিপত্তিতেও তিনি ঘাবড়াতেন না। তিনি যা মনে করতেন সে কাজ সমাধা না করে স্বস্তি ছিলো না তার।
আবু, সাঈদ জানতে পেরেছিলেন–ইরুইয়ার অদূরে একটি দ্বীপ আবিষ্কৃত হয়েছে–অদ্ভুত এক দ্বীপ। চারিধারে সাগর আর মাঝখানে কচ্ছপ পৃষ্ঠের ন্যায় একটি সুউচ্চ মৃত্তিকাস্তর। প্রায় পাঁচশত মাইলব্যাপী এই অদ্ভুত দ্বীপটি হঠাৎ একদিন সাগরবক্ষে মাথা উঁচু করে জেগে উঠেছে। একটি মালবাহী জাহাজই প্রথম আবিষ্কার করে এই দ্বীপটি। এখানে আরও বহু জাহাজ যাওয়া আসা করেছে কিন্তু কেউ কোনো দিন এখানে কোনো দ্বীপ দেখেনি। যে মালবাহী জাহাজ প্রথম এ দ্বীপ আবিষ্কার করেছে তার ক্যাপ্টেনের নাম হলো ‘ফৌজিন্দিয়ার’ তাই তার নাম অনুসারে এ দ্বীপের নামকরণ হয়েছে ফৌজিন্দিয়া দ্বীপ।
শুধু তাই নয়, এ দ্বীপ সম্বন্ধে আরও অদ্ভুত একটি উক্তি তিনি জানতে পেরেছেন, এ দ্বীপের নিকটবর্তী জলপথ দিয়ে কোনো জাহাজে চলাফেরা করতে গেলে তারা গভীর রাতে লক্ষ্য করেছে–দ্বীপের উপরে বেশ কিছুসংখ্যক আলোক প্রদীপ ক্ষিপ্রগতিতে ছুটোছুটি করে বেড়ায়। কিন্তু কোনো জন প্রাণী যদি সন্ধান নিতে ঐ দ্বীপে অবতরণ করে তাহলে কিছুই তারা দেখতে পায় না, এমনকি কোনোরকম আলোকরশ্মিও নজরে পড়ে না। আরও একটি বিস্ময়কর ঘটনা কর্ণগোচর হয়েছে আবু সাঈদের–সে হলো আশ্চর্য একটি শব্দ। দ্বীপ হতে মাঝে মাঝে একটা শব্দ শুনা যায়, যেন কোনো ইঞ্জিনের হুইসেলের তীব্র শব্দ। অনেক বৈজ্ঞানিক এবং আবিষ্কারক দল নানাভাবে সন্ধান নিয়ে দেখেছেন কিন্তু আজও কেউ এসব ব্যাপারে স্থির কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি।
