ঠিক বলেছেন, ছেলেটা ভাল কাজ করে।
কিন্তু তোমার বদনাম হচ্ছে তা জানো? বদনাম।
আমার বদনাম? কি বলছেন স্যার?
হাঁ সে এখন তোমার নাবিক নামে কলঙ্ক আঁকবে। ভাল কাজ দেখিয়ে তোমাকে সে নিচে নামিয়ে প্রমোশন নেবে সে। দুদিন পরে দেখবে আলম হেড নাবিক বনে বসে আছে।
নাসেরের কথা শুনে হেড নাবিক মকবুলের মনে একটা সন্দেহের দোলা জাগে তাই তো, আলমের কাজ দেখে প্রায়ই মালিক তার প্রশংসা করেন। হয়তো একদিন তার এই পঁচিশ বছরের অভিজ্ঞতা ব্যর্থ হয়ে যাবে ঐ ছোকরা নাবিকের কাছে। বললো মকবুল–বলুন স্যার, আমাকে কি করতে হবে?
অত্যন্ত সহজ কাজ এবং সেই কাজের উপর নির্ভর করছে তোমার নাবিক-জীবনের ভবিষ্যৎ?। তাছাড়াও আমি তোমাকে মোটা বখশীস দেবো। আর যদি কাজের আপত্তি করো বা কাউকে একথা বলে দাও তাহলে…একটা সূতীক্ষ্ণ ছোরা পকেট থেকে বের করে মেলে ধরে তার সম্মুখে–তাহলে এটা আমূলে বিদ্ধ হবে তোমার ঐ প্রশস্ত বুকে।
মকবুলের চোখে ভীতি এবং উকুণ্ঠা ভাব জেগে উঠে। বসে সে–যা বলবেন আমি তাই করতে রাজি আছি স্যার।
নাসের তার সঙ্গীদ্বয়কে ইঙ্গিত করলো কথাটা বলার জন্যে। লোক দুটো চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নিলো। তারপর একজন বললো–মকবুল, আজ থেকে তোমাদের ইঞ্জিন পরিস্কার করবার জন্য নির্দেশ দেবে। যখন সে ইঞ্জিন পরিস্কারে নিয়োজিত হবে তখন হঠাৎ ভুল করে তুমি ইঞ্জিন চালু করে দেবে।
স্যার! ভয়ার্ত বিবর্ণ মকবুলের মুখমন্ডল।
কোনোরকম আপত্তি করলে তোমার মৃত্যু অনিবার্য। বললো নাসের। তখনও তার হাতে সূতীক্ষ ধার ছোরাখানা চক্ করছে। নাসের পুনরায় কথাটা মকবুলকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে সঙ্গীদেরকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
মকবুল পুনরায় বসে পড়লো তার পরিত্যক্ত আসনে। ঠান্ডা চায়ের কাপটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো–এ কি করে সম্ভব হবে! একটা নিষ্পাপ সুন্দর জীবনকে সে কি করে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলবে। জানে মকবুল–আলমকে ইঞ্জিনের কাজে দিয়ে সে ইঞ্জিন চালু করে দিলে মাত্র এক সেকেন্ড–তাহলেই পিষে যাবে ওর দেহটা মেশিনের দাঁতের মধ্যে। কি ভয়ঙ্কর নৃশংস মৃত্যু…মকবুলের ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠলো না না, সে পারবে না এ কাজ করতে। কিন্তু পরক্ষণেই নাসেরের কঠিন কণ্ঠস্বর তার কানের কাছে প্রতিধ্বনিত হলো কোনো রকম আপত্তি করলে মৃত্যু অনিবার্য। সূতীক্ষ্ণ ছোরাখানা ভেসে উঠলো চোখের সম্মুখে নাসেরের কথা অমান্য করলে তার মৃত্যু সুনিশ্চয়।
পায়চারী করতে লাগলো মকবুল, বয়স তার কম নয়। প্রায় পঞ্চাশের অধিক হবে। তিনভাগ জীবন গত হয়ে গেছে। আর একভাগ অবশিষ্ট রয়েছে। তার জন্য একটি পূর্ণ জীবন নষ্ট করবে? আলম সবেমাত্র যুবক–সুন্দর সুষ্ঠু একটি মানবদেহ। ওর মনে কত আশা আছে, বাসনা আছে– সম্মুখে পড়ে রয়েছে দীর্ঘচলার পথ। আর তার জীবন তো শেষ হয়ে গেছে, পথ চলা ক্ষান্ত হয়ে আসছে। ক্লান্ত পথিক সে, আর ক’দিন সে পৃথিবীর আলো-বাতাস উপভোগ করবে! তার জীবনের বিনিময়ে একটি জীবন যদি বাঁচে ক্ষতি কি। না না, সে পারবে না আলমকে ইঞ্জিনের যাতা মেশিনে নিষ্পেষিত করতে পারবে না সে এতোবড় নিষ্ঠুর অমানুষিক কাজ করতে।
মকবুল যখন দুর্ভাবনায়-দুশ্চিন্তায় উন্মত্ত প্রায় তখন আলমবেশী বনহুর এলো তার খোঁজে। মকবুলকে আলম চাচা বলে ডাকতো। কারণ বনহুর জানতো, মকবুলকে খুশি রাখতে পারলে তার মনোবাসনা পূর্ণ হবে। এ জাহাজে তার স্থান হবে ভালভাবে! কারণ মকবুল হেড নাবিক, তার উপর নির্ভর করে অন্যান্য নাবিকের ভাগ্য।
বনহুর মকবুলের ক্যাবিনে প্রবেশ করে হেসে বললো–চাচা চলো, কাজ শুরু করবে কখন?
মকবুল আলমকে দেখে যেন চমকে উঠলো, কেমন যেন ভয়বিহল ঘোলাটি দৃষ্টি নিয়ে তাকালো তার দিকে। কি যেন বলতে চায় কিন্তু পারছে না।
বনহুর আরও সরে এলো, বললো–চাচা, তোমার কি হয়েছে? তোমাকে যেন অত্যন্ত উত্তেজিত মনে হচ্ছে! ব্যাপার কি চাচা?
অধর দংশন করতে লাগলো মকবুল। বার বার তাকাচ্ছে সে আলমের মুখে। সমস্ত দেহ তার ঘেমে উঠেছে উত্তেজনায়।
বনহুর মকবুলের কাঁধে হাত রাখলো–তুমি কি অসুস্থ বোধ করছো চাচা।
অসুস্থ…না না, অসুস্থ আমি নই বাবা, অসুস্থ আমি হইনি। মকবুল ক্যাবিনের দরজার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে দেখে নেয়। তারপর বনহুরের কানের কাছে মুখ নিয়ে কিছু বলতে যায়।
কিন্তু মকবুল কিছু বলবার পূর্বেই সূতীক্ষ একখানা ছোরা এসে বিদ্ধ হয় তার পিঠে। সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ করে পড়ে যায় মকবুল ক্যাবিনের মেঝেতে। রক্তে রাঙা হয়ে উঠে মেঝেটা।
বনহুর মকবুলের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে ছুটে যায়, বাইরে কিন্তু কাউকে দেখতে পায় না। ফিরে আসে বনহুর, দ্রুত হস্তে মকবুলের পিঠ থেকে ছোরাখানা তুলে নিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে বলে–চাচা, বলো কে তোমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলো? যার নাম বলতে তুমি বিলম্ব করছিলে? বলো–বলল চাচা?
মকবুল অতিকষ্টে শুধু দুটি শব্দ উচ্চারণ করলো… আলম… আমাকে… নয়…তোমাকে…হত্যা ক-র-তে-কথা শেষ করতে পারে না সে, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
ঠিক সেই মুহূর্তে চোখ তুলে তাকায় বনহুর, দেখতে পায় নাসের ও আর ও দু’জন দাঁড়িয়ে দরজার উপরে!
নাসের সরে আসে; ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলে–কেন তুমি ওকে হত্যা করলে আলম, বলো?
