নূরীকে শয্যায় শুইয়ে দিয়ে শ্যামা ফিরে আসে ডেকে একটু পূর্বে যেখানে নূরী আর সে দাঁড়িয়েছিলো। হঠাৎ শ্যামার নজর চলে যায় পাশের জাহাজের ডেকে বনহুরের উপর।
বনহুরও তাকিয়ে দেখছে শ্যামাকে।
একেবারে তখন জাহাজ দু’খানা পাশাপাশি ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
নাবিকের ড্রেসে বনহুর-বড় সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে!
শ্যামা নির্বাক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে নাবিকটির দিকে। এই মুহূর্তে যদি নূরী চলে না যেতো তাহলে নিশ্চয়ই বনহুরের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ? হয়ে যেতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সবই ভাগ্য। যতটুকু যার অদৃষ্টে আছে তা থেকে কেউ কাউকে বাঁচাতে পারবে না। এই দন্ডে বনহুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ তার ভাগ্যে নেই, কাজেই সে চলে গেলো ডেক ছেড়ে ভিতরে।
জাহাজখানা ক্রমান্বয়ে সরে যেতে থাকে দূরে সাগরবক্ষে আর পর্যটন এগিয়ে যায় মেরুন্দা বন্দরের অভিমুখে!
শ্যামার হঠাৎ কেমন যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠে। বনহুরকে যতক্ষণ সে ডেকে দাঁড়িয়ে দেখতে পাচ্ছিলো ততক্ষণ তন্ময় হয়ে তাকিয়েছিলো শ্যামা ওর দিকে। কিন্তু যেইমাত্র আর নজরে পড়লো না তখন চলে এলো নূরীর ক্যাবিনে, কারণ এ ক্যাবিনের মুক্ত গবাক্ষে পিছন জাহাজের ডেক সম্পূর্ণ দেখা যাবে।
শ্যামা এসে দাঁড়ালো ক্যাবিনের পিছন জানালায়। সত্যি এখনও তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঐ তো লোকটা দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে তাদের জাহাজখানার দিকে। তবে কি তাকেও ওর ভাল লেগেছিলো? না হলে অমন করে নির্বাক দৃষ্টি মেলে এখনও এ জাহাজখানার দিকে তাকিয়ে থাকবে। কেন! শ্যামার মনে একটা আনন্দের অনুভূতি সাড়া দিয়ে যায় সত্যি একটা স্মরণীয় পুরুষ মুখ আজ সে দেখতে পেয়েছে। যে মুখ তার জীবন পাতায় একটি স্বর্ণরেখোর মত উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। ধীরে ধীরে জাহাজখানা সম্পূর্ণ দৃষ্টির অন্তরালে অন্তর্হিত হলো।
শ্যামার মুখ ম্লান হলো যেন সন্ধ্যার অন্ধকারের মত। মুক্ত জানালাপথ থেকে ফিরে এলো। নূরী তখন বালিশে মুখ গুঁজে নিশ্চুপ পড়েছিলো।
শ্যামা এসে বসলো নূরীর কাছে, পিঠে হাত রেখে ডাকলো রত্না!
নূরী মুখ তোলে, কিন্তু কোনো জবাব দেয় না।
বলে আবার শ্যামা-রত্না, জানো এততক্ষণ আমি তোমার ক্যাবিনের জানালায় দাঁড়িয়ে কি। দেখছিলাম?
কি দেখছিলে?
দেখছিলাম এক সৌম্যসুন্দর দীপ্তকায় যুবককে। সত্যি অপূর্ব সে চেহারা…
নূরীর মনে হঠাৎ একটা প্রশ্ন জাগে, কে সে যুবক–তার বনহুর নয়তো? সোজা হয়ে বসে নূরী বলে–কেমন দেখলে তাকে? ছেঁড়া জামাকাপড় দেখলে? মাথার চুল বুঝি রুক্ষ? মুখে বুঝি। খোঁচা খোঁচা দাড়ি…
শ্যামা বলে উঠে–না না, ছেঁড়া জামা হবে কেন। রুক্ষ চুলই বা কেন হবে। আর মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়িই বা থাকবে কেন? সে যে জাহাজের নাবিক তার দেহে নাবিকের ড্রেস, মাথায় নাবিকের ক্যাপ। সৌম্যসুন্দর অপরূপ সে নাবিক!
নাবিক! হতাশায় নূরীর মন ভরে উঠে। কে কোন নাবিক-কি হবে তার সংবাদ জেনে!
শ্যামার চোখেমুখে তখনও লেগে রয়েছে ভাবের উন্মেষ। তার অন্তর জুড়ে নাবিকের প্রতিচ্ছবি ভাসছে। মাত্র ক্ষণিকের জন্য শ্যামা দেখেছে তাকে কিন্তু ওর যেন মন হচ্ছে কত দিনের চেনা ঐ মুখ।
জাহাজ তখন মেরুলা বন্দর ছেড়ে অনেক এগিয়ে এসেছে।
এদিকে পর্যটন এসে নোঙ্গর করলো মেরুন্দা বন্দরে। নীহারের আনন্দ আর ধরে না। আবু। সাঈদ স্বয়ং কন্যাসহ বন্দরে অবতরণ করবেন বলে প্রস্তুত হয়ে নিলেন।
জাহাজের প্রায় সকলেই বন্দরে অবতরণের জন্য উন্মুখ হয়ে উঠছে। নাসের এবং তার গোপন অনুচরগণ সেই ফাঁকে একটা কুমতলব এঁটে নিলো। জাহাজ আজ বেশ কিছুদিন অবিরত একটানা চলার পর মেরুন্দায় নোঙ্গর করেছে। ইঞ্জিনের মেশিনপত্র পরিস্কারের প্রয়োজন। হেড নাবিক। জানিয়েছে–সে কয়েকজন সহকারী নিয়ে ইঞ্জিন পরিষ্কার কাজে লিপ্ত হবে। কাজেই সবাই জাহাজ ত্যাগ করে বন্দরে অবতরণ করা চলবে না।
আবু সাঈদ বললেন–হ্যাঁ, সেই মতই কাজ করতে হবে। কারণ মেরুলা বন্দর ত্যাগ করার। পর নিকটবর্তী কোনো বন্দরের সম্ভাবনা নেই। সেজন্য জাহাজের নাবিকগণকে হেড নাবিককে সহায়তা করতে বললেন। পরে তারা একদিন মেরুলা বন্দরে অবতরণ করতে পারবে বলে জানালেন তিনি।
নাসেরের চোখেমুখে খুশির উৎস বয়ে গেলো। এই তো সুযোগ, নাবিক আলমকে কাবু করতে হবে এইবার।
আবু সাঈদ যখন দলবল নিয়ে বন্দরে অবতরণ করলেন তখন আলগোছে সরে রইলো নাসের আর তার কয়েকজন দুষ্ট অনুচর।
আবু সাইদ যখন তার পর্যটক বন্ধুদেরকে নিয়ে মেরুলা বন্দরে নেমে গেলেন, ঠিক তার পর মুহূর্তে নাসের আর তার দু’জন শয়তান অনুচরসহ হেড নাবিকের পাশে এসে দাঁড়ালো।
হেড নাবিক তখন একা চা পান করছিলো তার ক্যাবিনে বসে। নাসের এবং তার দু’জন। অনুচরকে দেখে উঠে দাঁড়ালো।
বললো নাসের–মকবুল, জানো কেন এসেছি?
না জনাব, আমি কেমন করে জানবো বলুন?
তোমাকে এক কাজ করতে হবে মকবুল।
বলুন স্যার? কি কাজ করতে হবে?
এ জাহাজে আমার এক দুশমন আছে, তাকে সরাতে হবে, পারবে সরাতে?
স্যার, আমি আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না?
নাসের সঙ্গীদ্বয়ের মুখে তাকিয়ে দেখে নিয়ে চাপা কণ্ঠে বললো–নাবিক আলম আছে না?
নতুন নাবিক আলমের কথা বলছেন স্যার?
হাঁ, জানো এই অল্প কদিনে সে জাহাজের মালিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিয়েছে।
