নূরীকে নিয়ে আসলাম আলীর মনে এক উদ্ভব হয়েছে, যা অনেক পরিচালকের পক্ষে সম্ভব। হয়নি আজও।
শ্যামার সঙ্গে আসলাম আলী চললেন নূরীর ক্যাবিনের দিকে। আজ নূরী কথা বলেছে–এ যেন তার চরম আনন্দের কথা। খুশিতে উজ্জল তার মুখমন্ডল, দীপ্ত কণ্ঠে বললেন–শ্যামা, ওকে। আমার সম্মুখে কথা বলাতে পারবে?
পারবো, চলুন। কিন্তু আপনি বাইরে অপেক্ষা করবেন, আমি ক্যাবিনে প্রবেশ করে তার সঙ্গে কথা বলবো।
বেশ তাই হবে।
পরিচালক আসলাম আলী ক্যাবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন। ক্যাবিনে প্রবেশ করলো শ্যামারাণী।
নূরী তখন ক্যাবিনের মুক্ত গবাক্ষে তাকিয়ে আছে মেরুলা বন্দরে থেমে থাকা অন্যান্য জাহাজের দিকে।
শ্যামা এসে নূরীর কাঁদে হাত রাখলো, বললো–কি দেখছো তুমি?
ফিরে তাকায় নূরী, ম্লান হেসে বলে সে–দেখছি পৃথিবীর মানুষ কত নিষ্ঠুর!
নূরীর কণ্ঠস্বর এবং কথা বলার অপূর্ব ভঙ্গী পরিচালকের মনে আনন্দের উৎস বইয়ে দিলো, মৃদু হাসির আভাস ফুটে উঠলো তার মুখে! পরক্ষণেই ভেসে আসে শ্যামার কণ্ঠ–কি করে বুঝলে তুমি পৃথিবীর মানুষ বড় নিষ্ঠুর?
আমার নিজের জীবন দিয়ে। আচ্ছা বোন, তোমার জীবনের সব কথা বলবে আমাকে?
বলবো, কিন্তু আজ নয়।
কবে বলবে তুমি?
আর একদিন।
তোমার নামটা তো আজও বললে না বোন?
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করে বলে নূরী-আমার নাম বড় মন্দ আর অপেয়।
বলোই না কি নাম তোমার?
নূরী।
চমৎকার নাম…কথাটা বলে কক্ষে প্রবেশ করেন আসলাম আলী।
নূরীর মুখ গম্ভীর হয়ে উঠে, মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে।
আসলাম আলী পাশে এসে দাঁড়ান! –স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন–নূরী…কি সুন্দর, কি মিষ্টি নাম তোমার। আমি কিন্তু তোমাকে রত্না বলে ডাকবো।
শ্যামা হেসে বলে–বাঃ এ যে আরও মধুর, যেমন রূপ তেমনি নাম।
নূরী কোনো কথা বলে না, নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো যেমন ছিলো ঠিক তেমনি।
আসলাম আলী বললেন–রত্নার সমস্ত দেহ আমি রত্ন দিয়ে ভরে দেবো শ্যামা। আমার বাসনা। যদি সিদ্ধ হয়–যেমন তুমি আমার সমস্ত কামনা পূর্ণ করেছে।
শিউরে উঠে নূরী, ক্ষণিকের জন্য একবার চোখ তুলে আসলাম আলীকে দেখে নেয় সে।
আসলাম আলী তখনও বলে চলেছেন–বোম্বে ফিরে গিয়ে রত্নাকে তুমি তোমার মত করে তৈরি করে নিও।
হঠাৎ বলে উঠলো শ্যামা–মেরুন্দা ছেড়ে কবে আমরা বোম্বের দিকে রওয়ানা দেবো আলী সাহেব?
আজই আমরা মেরুন্দা বন্দর ত্যাগ করবো শ্যামা।
আজই!
হাঁ। তোমরা বিদায়ের জন্য তৈরি হয়ে নাও শ্যামা কোনো প্রয়োজনীয় দ্রবাদির অভাব মনে করলে মেরুন্দা হতে ক্রয় করে নিতে পারো।
পরিচালক আসলাম আলী নূরীর কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে গেলেন।
শ্যামা নূরীকে বললো–বোন, মেরুন্দার অপরূপ দৃশ্য সত্যি অপূর্ব! চলো যাই, ডেকে গিয়ে দাঁড়াই।
নূরী বিনা বাক্যে শ্যামাকে অনুসরণ করলো। আজ কতদিন সে বাইরের আলোয় গিয়ে দাঁড়ায়নি! প্রথম যেদিন তাকে জোরপূর্বক ধরে এনে ঐ যে ক্যাবিনে ভরেছে তারপর আর সে বাইরে আসেনি। পৃথিবীর আলো যেন তার চোখে অসহ্য লাগতো, ভালো লাগতো না কিছু। তাই নূরী কোনোদিন ক্যাবিনের বাইরে তাকিয়েও দেখেনি।
আজ শ্যামার সঙ্গে এসে ডেকের উপর দাঁড়ালো নূরী। মেরুদা বন্দর ত্যাগ করার ভো বেজে উঠেছে, একটু পরেই জাহাজ বন্দর ত্যাগ করবে।
করুণ অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে নূরী মেরুন্দার শেষ প্রান্তে দূরে–অনেক দূরে ঘন জঙ্গলের শীর্ষভাগে। ভাবে সে, নিশ্চয়ই তার বনহুর ঐ পর্বতমালার উপরে জঙ্গলে এখনও বুঝি তার নাম ধরে ডেকে ফিরছে। হয়ত আবার সেই জংলীদের কবলে ধরা পড়ে গেছে। না হয় জংলীরাণী তাকে বন্দী করে হত্যা করে ফেলেছে। কি নৃশংস হত্যা…নূরী আর যেন ভাবতে পারে না, তার মাথাটা কেমন যেন ঘুরে উঠে। নূরীর চোখের সম্মুখে ভেসে উঠে রংলালের দলের ঝুলন্ত অবস্থায় মস্তকহীন মৃতদেহগুলো! ভেসে উঠে সাপুড়ে সর্দারের ভয়ঙ্কর মৃত্যুদৃশ্য।
নূরীর মাথার মধ্যে যখন জংলীদের পৈশাচিক হত্যাকান্ডের বীভৎস দৃশ্যগুলো প্রতিচ্ছবি। ঘুরপাক খাচ্ছিলো তখন তাদের জাহাজ মেরুন্দা বন্দর ত্যাগ করে ধীরে ধীরে সরে আসছিলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে জাহাজ ‘পর্যটন এগিয়ে আসছে বন্দরের দিকে। পরিচালক আসলাম আলীর জাহাজের পাশ কেটে মন্থর গতিতে বন্দর অভিমুখে এগুচ্ছে জাহাজখানা।
নূরী বললো–আর আমি দাঁড়াতে পারছি না। চলো ক্যাবিনে যাই।
শ্যামা ব্যস্তকণ্ঠে বললো–কি হয়েছে?
বড় অসুস্থ বোধ করছি।
শ্যামা নূরীকে নিয়ে ফিরে গেলো ক্যাবিনের মধ্যে।
‘পর্যটন’ তখন অতি নিকটে এসে পড়েছে। একেবারে আসলাম আলীর জাহাজের পাশে।
নাবিক বেশে বনহুর তখন ডেকের সম্মুখে দাঁড়িয়ে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দ্বারা মেরুন্দা বন্দর লক্ষ্য করছিলো! শুধু বন্দর লক্ষ্য করাই তার আসল উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য ছিলো বন্দরে থেমে থাকা প্রত্যেকটা জাহাজ অনুসন্ধান করে দেখা। হঠাৎ যদি কোনো জাহাজে তার নূরী থাকে তাহলে নিশ্চয়ই তাকে দেখতে পাবে সে। চঞ্চলা নূরী কিছুতেই জাহাজের ক্যাবিনে চুপচাপ বসে থাকার মেয়ে নয়। কিন্তু বনহুরের আশা সফল হয় নারী ঠিক সেই মুহূর্তে জাহাজের কেবিনে চলে যায়!
বনহুর ব্যাকুল চোখে দেখেছিলো, অনুসন্ধান করে ফিরছিলো তার প্রিয়ার। নূরী তখন ক্যাবিনে গিয়ে শয্যায় দেহ এলিয়ে দিয়েছে।
