নূরীকে দেখলে সহজে কেউ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারে না। ওকে যত দেখা যায়, ততই যেন আরও দেখতে ইচ্ছে করে। এহেন নূরী যে চিত্র পরিচালকদের নিকটে কত আখাঙ্ক্ষিত তা সহজেই অনুমেয়।
*
মেরুলা বন্দরে পরিচালক আসলাম আলীর জাহাজ ক’দিন হয় নোঙ্গর করে আছে। ছবির সমস্ত ইউনিট বন্দরে অবতরণ করে ঘুরে ফিরে দেখে নিচ্ছে বন্দরটাকে। কারণ এসব অঞ্চলে সচরাচর তারা আসে না এবং ভবিষ্যতে পুনরায় আসবে কিনা তারও ঠিক নেই।
মেরুলা বন্দর পাহাড়িয়া অঞ্চল।
উঁচুনীচু টিলার পাশ কেটে বয়ে চলেছে এই নদীটি। ঠিক সুন্দর একটা ছবির মত দেখতে মেরুন্দা। কালো কালো পাথুরিয়া টিলার উপরে সাদা ধরধবে ছোট ছোট বাংলো প্যাটার্ণের বাড়িগুলো দেখবার মত জিনিষ। কতকগুলো টিলার পাশ কেটে সচ্ছ ঝরণাধারা নেমে এসে মিশে গেছে সাগরবক্ষে।
সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত কালে এসব অঞ্চল অপূর্ব রূপ ধারণ করে। সচ্ছ জলরাশির বুকে ভোরের আলোকরশ্মি সৃষ্টি করে এক মহাসমারোহ। তেমনি বেলাশেষের সূর্যের আলো সোনালী বন্যায় ছেয়ে দেয় সব কিছু।
আসলাম আলীর ইউনিট মুগ্ধ হয়ে যায় এসব দেখে। সম্পূর্ণ তিন দিন তারা মেরুন্দা বন্দরে অপেক্ষা করার পর আজ তাদের শেষ দিন।
নূরী ক্যাবিনে বসে তাকিয়ে থাকে মেরুন্দা বন্দরের দিকে। অগণিত লোকজনের চলাফেরার মধ্যে তার দৃষ্টি খুঁজে ফেরে একজনকে–সে হল তার প্রিয়তম দস্যু বনহুর। নীরবে অশ্রু বিসর্জন করে নূরী।
আসলাম আলীর ছবির নায়িকা শ্যামারাণী মাঝে মাঝে নূরীর কাছে এসে বসতো। নূরীকে সে। ঈর্ষা না করে ভালোবাসতো, নূরীর নীরব অশ্রু তার মনে সৃষ্টি করতে একটা ভাবের উন্মেষ। ওর কাছে বসে পিঠে-মাথায় হাত বুলিয়ে সান্তনা দিতে চেষ্টা করতো সে। জানতে চাইতো ওর মনের কথা।
নূরী ওর সঙ্গে কোনো কথা না বললেও ওকে নূরীর ভাল লাগতো। মেরুন্দা আসার পর যখন শ্যামারাণী নূরীকে নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নিয়ে বলেছিলো–বোন, আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। তোমার দুঃখ আমাকে বিচলিত করে, বলল তোমার কি দুঃখ?
এতোদিন নূরী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো শুধু শ্যামারাণীর দিকে, কোনো জবাব দিতো না তার প্রশ্নের। আজ নূরী চুপ থাকতে পারে না, ঠোঁট দুটি কেঁপে উঠে নূরীর।
ব্যাকুল কণ্ঠে বলে শ্যামারাণী-বলো? বলো তুমি কি বলতে চাও?
নূরীর গন্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রুধারা, বলে নুরী–কেন তোমরা আমাকে ধরে নিয়ে এলে? বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে ওর গলা।
নূরীর কণ্ঠস্বরে মুগ্ধ বিস্মিত হয়ে শ্যামারাণী, আঁচলে ওর চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে সে– তোমাকে আমাদের পরিচালকের অনেক পছন্দ হয়েছে। তোমাকে তিনি ছবির নায়িকা করবেন।
অবাক হয়ে বলে নূরী–পরিচালক! কিসের ছবি?
ছায়াছবি–চলচ্চিত্র…
মাথা নাড়ে নূরী, বলে–ওসব আমি বুঝি না।
সব বুঝতে পারবে। আমাদের স্টুডিওতে গেলে সব দেখতে পাবে।
না না, তোমরা আমাকে সেই বনে ফিরিয়ে দিয়ে এসো আমি তার কাছে যাবো–আমি তার কাছে যাবো।
কে সে? কার কথা বলছো?
আমার হুর। আমার হুরের কাছে।
হুর! সেকি?
নূরীর কথা বুঝতে পারে না শ্যামারাণী। তবু নূরী যে কথা বলেছে এই তার আনন্দ। ছুটে যায় শ্যামারাণী পরিচালক আসলাম আলীর কাছে।
শ্যামাকে আনন্দদীপ্ত দেখে আসলাম আলী জিজ্ঞাসা করলেন–কি ব্যাপার, বড় আনন্দমুখর দেখছি যে?
ব্যাপার অত্যন্ত শুভ। আপনার শিকার কথা বলেছে।
আসলাম আলী অবাক হয়ে বললেন–আমার শিকার!
হাঁ, সেই বনকুমারী…
সত্যি বলছো শ্যামা?
মোটেই মিথ্যা নয়। বলুন কি পুরস্কার দেবেন আমাকে? কারণ আমিই তাকে প্রথম কথা বলতে বাধ্য করেছি।
যা চাও তাই পাবে শ্যামা, ওকে যদি তুমি আমার কাছে লাগিয়ে দিতে সহায়তা করো।
সত্যি দেবেন?
সত্যি।
আমার হাত ধরে শপথ করুন। হাতখানা প্রশস্ত করে দেয় শ্যামা পরিচালকের সম্মুখে।
আসলাম আলী হাত রাখেন শ্যামার হাতের উপর–বলো কি চাও তুমি?
শ্যামা ফিক করে হেসে বলে–বেশি কিছু নয়, আপনার স্নেহপ্রীতি আর আন্তরিকতা।
কথা দিলাম এসব থেকে কোনোদিন তুমি বঞ্চিত হবে না।
শ্যামারাণীর চোখ দুটি আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, বললো–এর বেশি আমি কিছুই চাই না আলী সাহেব। আমি পতিতার মেয়ে জেনেও, আমাকে আপনি আপনার অন্তরে স্থান দিয়েছেন, শুধু তাই নয়, লোকসমাজের সম্মুখে তুলে ধরেছেন শ্রেষ্ঠ নায়িকা হিসাবে এর চেয়ে আর আমার কি লোভনীয় থাকতে পারে!
শ্যামারাণীর চোখ দুটো অশ্রু ছলছল হলো, কণ্ঠ কৃতজ্ঞতায় বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো।
আসলাম আলী তাকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে আবেগভরা গম্ভীর শান্ত কণ্ঠে বললেন–আমার কাছে তুমি চিরদিন আদরিণীই থাকবে শ্যামা। তোমার শ্যামল রূপ যে আমাকে আত্নহারা করেছে। আমি তোমায় প্রাণের অপেক্ষা বেশি ভালবাসি।
আলী সাহেব! আলী সাহেব! আপনি কতবড়, কত মহান। শ্যামা আসলাম আলীর বুকে মাথা রাখে।
আসলাম আলী শ্যামাকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে প্রেমবাণী শোনালেও তার মনের গহনে বিরাজ করছে আর একটি মুখ। সে হলো গহন জঙ্গলে কুড়িয়ে পাওয়া সেই রত্ন, তার অন্তরের রাণী বনকুমারী।
আসলাম আলী সুচতুর বুদ্ধিমান পরিচালক–কেমন করে শিল্পী এবং কলা-কৌশলীদের খুশি রাখতে হয় জানেন। অভিজ্ঞ পরিচালক হিসাবে তার খ্যাতি কম নয়। তিনি খাঁটি বাঙালী এবং মুসলমান হয়েও নানাদেশীয় শিল্পীদের সমন্বয়ে চিত্র তৈরি করে থাকেন। শুধু বাংলা ছবিই নয়, উর্দু এবং পাঞ্জাবী ছবিও তৈরি করে চিত্রজগতে শীর্ষস্থান অধিকার করেছেন।
