বলুন স্যার?
আমার কথা শুনেছো?
হাঁ স্যার, সব শুনেছি।
বনহুর এবার দ্রুত সরে এলো ক্যাবিনের পিছন থেকে। এখন তার চোখের সম্মুখে সমস্ত কিছু পরিষ্কার হয়ে এলো, কি সাংঘাতিক শয়তান লোক নাসের বুঝতে পারলো সে।
ক্যাবিনে এসে বনহুর দেখলো কেশব তার বিলম্ব দেখে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছে। বনহুর ক্যাবিনে প্রবেশ করতেই বললো কেশব–বাবু, এতোক্ষণ কোথায় ছিলেন?
বিশেষ একটু কাজে আটকা পড়ে গিয়েছিলাম। কথাটা বলে তোয়ালে আর সাবান নিয়ে বাথরুমে প্রবেশ করে বনহুর। পাইপের ঠান্ডা পানিতে বেশ করে গোসল করতে লাগলো সে। যতক্ষণ দেহের তেল কালি সাবান লাগিয়ে পরিষ্কার করছিলো ততক্ষণ তার মস্তিস্কে একটা গভীর চিন্তার আলোড়ন সৃষ্টি করে চলেছিলো। নাসেরকে যতখানি শয়তান মনে করেছিলো, তার চেয়ে শত সহস্র গুণ বেশি শয়তান সে। এ জাহাজে ক্যাপ্টেন আবু সাঈদ মোটেই নিরাপদ নন, নিরাপদ নয় তাঁর কন্যা নীহার। এমন একটা দুষ্ট বিষ-কীটকে তারা তাদের জাহাজে সানন্দে গ্রহণ করেছে। যে কীট তাদের দংশন আশায় প্রহর গুণছে। বনহুর যতই ভাবছে ততই বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠছে। নাসেরকে সে এর উপযুক্ত শাস্তি দেবে।
ফিরে আসে বনহুর বাথরুম থেকে।
এমন সময় তাদের খাবার টেবিলে ডাক পড়ে।
কেশব আর বনহুর বেরিয়ে যায়, নিচের একটা বড় ক্যাবিনে জাহাজের কুলি খালাসী আর। নাবিকদের খেতে দেওয়া হয়। টেবিলে এসে বসে বনহুর আর কেশব।
টেবিলে খাবার দেওয়ার পূর্বে হঠাৎ বনহুরের দৃষ্টি চলে যায় অদূরে ক্যাবিনের দরজায় কে একজন লোক বাবুর্চির কানে কিছু বলে দ্রুত সরে গেলো।
বাবুর্চি একটু পরে খাবার হস্তে ক্যাবিনে প্রবেশ করলো! বনহুর বাবুর্চির মুখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। কেমন যেন ভীত ভাব লক্ষ্য করলো সে তার মুখমন্ডলে। হাতের একখানা প্লেট নামিয়ে রাখলো বাবুর্চি বনহুরের সম্মুখে।
বনহুর প্লেটখানা নিজের দিকে টেনে নিতেই ভাত আর মাংসগুলো ক্যাবিনের মেঝে ঢেলে পড়ে গেলো।
বাধ্য হয়ে বাবুর্চি তাকে অন্য আর এক প্লেট খাবার দিলো। বনহুর তৃপ্তি সহকারে খেতে শুরু করলো। কিন্তু খেতে খেতে বনহুর লক্ষ্য করলো–বাবুর্চির মুখ বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে।
সেই রাতেই জাহাজ থেকে উধাও হলো বৃদ্ধ বাবুর্চি।
সমস্ত জাহাজের একটা আতঙ্ক সৃষ্টি হলো, কোথায় গেলো, কি হলো সে। বিশেষ করে আবু সাঈদ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আর বৃদ্ধ বাবুর্চিকে পাওয়া গেলো না।
*
পাহাড়িয়া ঝরণা এবং জলপ্রপাতের বিভিন্ন দৃশ্য গ্রহণের পর পরিচালক আসলাম আলী তাঁর ইউনিটসহ ফিরে চলেছেন বোম্বের দিকে। পথে আরও কতকগুলো বন-জঙ্গলের দৃশ্যও গ্রহণ করেছেন তাঁরা। ছবির আউট ডোের সুটিং প্রায় শেষ হয়ে গেছে। বাকি অংশের কাজ হবে ষ্টুডিও ফ্লোরে।
প্রত্যাবর্তন কালে পরিচালক আসলাম আলী কয়েকদিনের জন্য মেরুন্দা বন্দরে তাদের জাহাজ নোঙ্গর করার জন্য আদেশ দিয়েছিলেন। বেশ কিছুদিন হলো তারা বোম্বে ত্যাগ করে দূর-দূরান্তে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ইউনিট অত্যন্ত পরিশ্রান্ত–কাজেই তাদের বিশ্রামের প্রয়োজন।
আসলাম আলীর যাত্রা এবার অত্যন্ত শুভ। পাহাড়িয়া ঝরণা এবং জলপ্রপাতের যে দৃশ্যগুলো তিনি এবার গ্রহণ করতে পেরেছেন তা অত্যন্ত সুন্দর ও অপূর্ব হয়েছে। শুধু দৃশ্য গ্রহণেই তিনি জয়ী হননি, লাভ করেছেন অপ্সরী সমতুল্যা বনকুমারীকে।
আসলাম আলীর হৃদয়ে অদ্ভুত বাসনা, কোনক্রমে ঐ বনকুমারীকে যদি বশে আনতে পারে তাহলে তাঁর ছবির জন্য আর নায়িকার অন্বেষণে হা হুতাশ করে মরতে হবে না। হাজারে এমনি একটি মেয়ে নজরে পড়ে কিনা সন্দেহ।
নূরীই হলো সেই বনকুমারী।
নূরীকে জাহাজে আনার পর থেকে চলেছে তাকে সাধ্য-সাধনা! কিসে সে খুশি হবে, কিসে তার মন সচ্ছ স্বাভাবিক হবে সব সময় সেই চেষ্টা চলেছে।
এ জাহাজে নূরীর সেবা-যত্নের ত্রুটি নেই। সুন্দর সুসজ্জিত একটি ক্যাবিনে নূরীকে রাখা হয়েছে। মূল্যবান পরিচ্ছদে তাকে সজ্জিত করা হয়েছে। নানাবিধ খাদ্যসম্ভারে তার সম্মুখস্থ টেবিল পরিপূর্ণ। ইউনিটের প্রতিটি লোক নূরীকে খুশি করার জন্য উন্মুখ রয়েছে। কিন্তু এতো করেও কেউ নূরীর মুখে হাসি ফোঁটাতে সক্ষম হয়নি।
স্বয়ং আসলাম আলী নিজেও নূরীর জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সর্বক্ষণ নূরীর সুখ-সুবিধার জন্য ব্যাপৃত তিনি। নিজে এসে তাকে বলে বলে খাওয়ান সস্নেহ মিষ্ট কথায় সন্তুষ্ট করতে চেষ্টা করেন।
এতো করেও নূরীর চোখের অশ্রু শুষ্ক হয় না। এতো পেয়েও সে সন্তুষ্ট নয়। করুণ বিষ। মুখমন্ডল, ম্লান দুটি ডাগর আঁখি। স্তিমিত তার মুখের হাসি।
পরিচালক নূরীকে পেয়ে যেমন খুশি হয়েছেন, তেমনি হয়েছেন চিন্তিত। এতে করেও কিছুতেই নূরীকে বশে আনা সম্ভব হচ্ছে না তাদের।
অনেক সাধ্য-সাধনা করে যদিও নূরী সামান্য কিছু খাবার মুখে দিয়েছে কিন্তু আজও একটি কথাও সে বলেনি কারো সঙ্গে। এমনকি নিজের নামটাও ব্যক্ত করেনি সে।
এ জাহাজে নূরী যেন একটি আজব জীব।
নূরীকে জাহাজে নিয়ে আসার পর ইউনিটের সবাই তাকে বিস্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে দেখেছিলো। নূরীর চেহারা স্বাভাবিক বাঙালি মেয়ের মত ছিলো না অদ্ভুত অপূর্ব চেহারা ছিলো তার। কতকটা ইরানী মেয়েদের মত দেখতে ছিলো সে। মাথার চুল ঘন লালচে এবং কোঁকড়ানো! তরবারীর মত বাঁকানো দুটি ভূযুগল। ডাগর ডাগর হরিণ চোখে মোহময় দৃষ্টি। ছিপছিপে লম্বা গড়ন, উন্নত নাসিকা, সরু ওষ্ঠদ্বয়।
