আবহাওয়া সংবাদে জানানো হয়েছে–উপস্থিত প্রাকৃতিক কোনো গোলযোগের সম্ভাবনা নেই।
আবু সাঈদের মনে খুশির উৎস। প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগের লক্ষণ না থাকলে তার মন আনন্দে ভরপুর থাকতো। আবু সাঈদকে জীবনে বহুবার সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়তে হয়েছে। তাঁকে বহু কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে পর্যটক হিসাবে। প্রাকৃতিক আবহাওয়া লক্ষণ সন্তুষ্টজনক। থাকলে তার খুশির অন্ত থাকতো না।
পর্যটন মেরুলা বন্দরে একদিন অপক্ষো করবে বলে ক্যাপ্টেন আবু সাঈদ জানিয়েছেন।
দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ পর্যটন’-এর আরোহিগণ জলপথে ভেসে চলেছে। মৃত্তিকার পরশ পাবার আশায় সবাই আনন্দে আপ্লুত হয়ে উঠেছে। আবু সাঈদ স্বয়ং বলেছেন, এই বন্দরে তারা সম্পূর্ণ একটি দিন অবস্থান করবেন।
*
বনহুর নানা কাজে ব্যস্ত থাকলেও সব সময় তার মনে নূরীর চিন্তা উদয় হচ্ছিলো। কিভাবে নূরীর সন্ধান সে পেতে পারে–কোথায় গেলে নূরীর দেখা পাবে কে জানে। ভাগ্যি এ জাহাজের সান্নিধ্যে আসতে পেরেছিলো, নাহলে তাদের জীবন রক্ষাই অসম্ভব হয়ে পড়তো। এখন জীবন। যখন রক্ষা পেয়েছে তখন যেমন করে হোক নূরীকে খুঁজে বের করবেই সে। কিন্তু কোন্ দিকে, কোন্ পথে–কোথায় গেছে নূরী…
বনহুরের চিন্তাজাল বাধা পড়ে, একটা শব্দে ফিরে তাকায় সে, অস্ফুট কণ্ঠে বলে–আপনি!
ইঞ্জিন-কক্ষে বনহুর মেশিনের কাজে ব্যস্ত ছিলো; দেখলো তার অদূরে দাঁড়িয়ে আছে নীহার। বনহুর ফিরে তাকাতেই নীহার বললো–সব সময় তুমি কাজ করো আলম?
বনহুর জাহাজে নিজের নাম আলম বলেছিলো। ইতিপূর্বে আরও কতবার সে এ নামেই নিজকে পরিচিত করেছিলো, এবারও সে আলম নামটাই বেছে নিয়েছিলো নিজের জন্য। নীহারের কথায় সোজা হয়ে দাঁড়ালো বনহুর, একটু হেসে বললো–মালিকের কাজে ফাঁকি দেওয়া আমার নীতি নয় মেম সাহেব।
না না, আমি তা বলছি না, বলছি তোমার কি বিশ্রাম নেই!
বিশ্রাম! গরিব বেচারীদের আবার বিশ্রাম। কাজ করা আমাদের অভ্যাস, কাজেই কোনো কষ্ট হয় না।
নীহার কোনো জবাব দেয় না, ধীর মন্থর গতিতে চলে যায় সেখান থেকে।
বনহুর আপন মনেই হাসে।
আর একদিন বনহুর ইঞ্জিনের কাজ শেষ করে ফিরে যাচ্ছিলো নিজের ক্যাবিনে সমস্ত দেহে তেলকালি মাখানো। একটু অন্যমনস্কভাবেই যাচ্ছিলো সে, হঠাৎ পাশে সন্ধ্যার ঝাপসা আলোতে দেখলো, কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। বনহুর থমকে দাঁড়িয়ে ফিরে চাইতেই দুটি আখির সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হলো তার। বনহুর বললো–মেম সাহেব আপনি!
দৃষ্টি নত করে নিয়ে বললো নীহার–এতোক্ষণে তোমার কাজ শেষ হলো বুঝি!
হাঁ মেম সাহেব।
এমন সময় নাসের এসে দাঁড়ালো সেখানে, চোখেমুখে তার কঠিন ভাব ফুটে উঠেছে। ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললো নাসের নীহার, পুনরায় তুমি ঐ নিকৃষ্ট নাবিকের সঙ্গে কথা বলছো? এতোটুকু লজ্জা বোধ নেই তোমার?
নীহারও ফোঁস করে উঠলো, তীব্রকণ্ঠে বললো লজ্জা বোধ থাকলে আপনি আর আসতেন আমাকে সাবধান করে দিতে। কারণ আমি আপনাকে অনেক আগেই সাবধান করে দিয়েছি।
কথাটা বলে হন হন করে চলে গেলো নীহার সেখান থেকে।
বনহুরও চলে গেলো তার নিজ ক্যাবিনের দিকে।
মাঝপথে নাসের ক্রুদ্ধ পশুর ন্যায় দাঁড়িয়ে গর্জন করতে লাগলো। যত রাগ গিয়ে গড়লো বনহুরের উপর। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর অন্ধকারে এগিয়ে চললো।
বনহুর কিন্তু চলে গেলেও আসলে সে একটা থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছিলো। নাসের। অন্ধকারে এগুতেই বনহুর তাকে গোপনে অনুসরণ করলো। আলগোছে সন্তর্পণে এগুতে লাগলো।
নাসের জাহাজের পিছন দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বনহুর বেশ দূরত্ব রেখে ক্যাবিনের আড়ালে আত্মগোপন করে তাকে অনুসরণ করেছে। নাসেরের চলার প্রতি এবং ভাবসাব লক্ষ্য করে বনহুরের মনে সন্দেহের দোলা জেগেছে। নিশ্চয়ই এ যুবক নীহার বা তার পিতার হিতাকাঙ্খী নয়।
কিছুদূর এগুতেই বনহুর দেখতে পেলো, ওদিকের একটা ক্যাবিনে প্রবেশ করলো নাসের। সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ হয়ে গেলো ক্যাবিনার।
বনহুর এবার দ্রুতপদে ক্যাবিনের পিছনে যে শার্শী ছিলো তার পাশে এসে দাঁড়ালো। শুনতে পেলো নাসেরের গলার আওয়াজ, বলছে সে-শম্ভু, ঐ নাবিক বেটাকে প্রথমে সরাতে হবে।
একটা হেড়ে কর্কশ কণ্ঠস্বরে শোনা গেলো–কার কথা কইছেন স্যার? ঐ নতুন নাবিকটার কথা?
হা, শম্ভু ঐ বেটা জাহাজে আসার পর আমি লক্ষ্য করেছি নীহার যেন কেমন আনমনা হয়ে গেছে। বেটার সৌন্দর্য ওর হৃদয়ও জয় করে নিয়েছে মনে হচ্ছে।
ঠিক বলেছেন স্যার। ছোটলোক নাবিকের চেহারা এমন হয়–এর পূর্বে দেখিনি।
দেখোনি, কিন্তু জানো আমার সব অভিসন্ধি এবার ওর জন্য বিনষ্ট হবে? নীহারকে আমি চাই আর তার সঙ্গে চাই নীহারের পিতার বিপুল ঐশ্বর্য।
স্যার, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, আপনি যখন হুকুম করবেন তখনই আমি নীহারকে আপনার মুঠায় এনে দিতে পারি।
কিন্তু আমি জোর করে তার ভালবাসা আদায় করতে চাই না শম্ভু। কৌশলে তার ভালবাসা। আদায় করে তার সমস্ত সম্পত্তির ন্যায্য অধিকারী হতে চাই।
এবার শোনা যায় আর একটি কণ্ঠস্বর–স্যার, আপনার হুকুমের অপেক্ষায় আছি আমরা। আপনার সামান্য ইংগিতে সমস্ত জাহাজে আমরা আগুন ধরিয়ে দিতে পারি। বলুন ক্যাপ্টেনকে কিভাবে হত্যা করতে হবে?
থামো। এখনও সে সময় আসেনি। তার পূর্বে ঐ নাবিক বেটাকে সরাতে হবে…শম্ভু?
