নীহার ওর কথা শুনে বলতো–আমার কাছে ছোট-বড় কোনো ভেদাভেদ নেই। মানুষ যে মানুষই এর চেয়ে বেশি আমি জানতে চাই না।
বনহুর স্তব্ধ হয়ে শোনে, নীহারের কথাগুলো তার অন্তর স্পর্শ করে। বলে বনহুর–মেম সাহেব, আপনি ধনবানের কন্যা হয়ে এমন, সত্যি এই দুনিয়ার সব মানুষের মন যদি আপনার মত হতো।
এমন সময় এসে দাঁড়ালো নাসের, গম্ভীর কণ্ঠে বললো–নীহার, এত বাড়াবাড়ি তোমার শোভা পায় না। সামান্য কুলি-মজুরদের ক্যাবিনে এসে একটা নিকৃষ্ট নাবিকের সঙ্গে তুমি এভাবে কথাবার্তা বলছো! তোমার আত্নসম্মান বোধ থাকা উচিৎ।
মুহূর্তে নীহারের মুখ কালো হয়ে উঠলো। অধর দংশন করে বললো–আমি প্রথম দিনই বলেছি, আমার সম্বন্ধে আপনি কোনোরকম উক্তি উচ্চারণ করবেন না!
নীহার, সব তোমার আব্বাকে জানিয়ে দেবো।
তাতে আমার কোনো ক্ষতি হবে না। আব্বা জানেন, তার মেয়ে কোনোদিন অন্যায় কিছু করে না। আপনি যেতে পারেন নাসের সাহেব।
রাগত দৃষ্টি নিয়ে একবার বনহুর আর কেশবের দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে যায় নাসের।
তীব্র চোখে তাকিয়ে থাকে নীহার নাসেরের চলে যাওয়া পথের দিকে।
বনহুর বলে–মেম সাহেব, কেন আপনি এখানে আসেন? উনি এতে মোটেই খুশি নন।
নীহার এবার সোজা হয়ে দাঁড়ালো, তার চোখেমুখে এক কঠিন দীপ্তভাব ফুটে উঠেছে, বললো–উনার খুশিতে আমার কিছু যায়-আসেনা বুঝলে? আমি যখন ইচ্ছা আসবো তাতে তার কি? কথাটা বলে দ্রুত বেরিয়ে যায় নীহার।
বনহুর স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে, তারপর বলে–কেশব, আমি জানতাম বড়লোকদের হৃদয় বলে কিছু নেই…একটু থেমে বললো পুনরায়–দেখলাম আজ মানুষের এক নতুন রূপ।
কেশব এখন অনেকটা সুস্থ, বনহুরের কথাগুলো শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো মুখের দিকে।
*
আবু সাঈদের পর্যটন জাহাজে নাবিক বেশে শুরু হলো বনহুরের কাজ।
ক্যাপ্টেন আবু সাঈদ বনহুরের কাজ দেখে মুগ্ধ হলেন। আরও মুগ্ধ হলেন তার আচরণে। এমন একজন সুদক্ষ নাবিককে তার জাহাজে পেয়ে অত্যন্ত খুশি হলেন তিনি।
অবশ্য বনহুরের নাবিকের কাজ পূর্ব হতেই জানা ছিলো। কারণ ইতিপূর্বে তাকে আরও অনেক জাহাজে থাকতে হয়েছে। তাছাড়া বনহুরের কান্দাই শহরে নিজস্ব একটি বড় এবং দুটি ছোট জাহাজ আছে। এসব জাহাজে সে অনেক সময় নিজে নাবিকের কাজ করেছে, কাজেই কোনো। অসুবিধা হলো না।
বনহুরের সহকারী হিসাবে কেশব আশ্রয় পেলো এই পর্যটনে।
বনহুরকে সর্বক্ষণ জাহাজে ইঞ্জিনের কাছে ব্যস্ত থাকতে হতো। তেল, কালি আর কয়লার ধুয়োতে তার নাবিক ড্রেস কালিময় হয়ে উঠতো, সুন্দর দেহের স্থানে স্থানেও লাগতো কালির প্রলেপ।
জাহাজের নাবিক ছিলো না তা নয় কিন্তু তবু বড় জাহাজ বেশি নাবিকের প্রয়োজন আবু সাঈদ তাই বনহুরকে তার জাহাজে বিনা দ্বিধায় নাবিক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
বনহুর যখন ইঞ্জিনের কাজে ব্যস্ত থাকতো তখন আবু সাঈদ স্বয়ং এসে কাজ দেখতেন, তন্ময় হতেন বনহুরের অপূর্ব কর্মদক্ষতা দেখে!
এতো কাজ থাকতে নাবিকের কাজ বেছে নেওয়ার মধ্যে বনহুরের অভিসন্ধি যে ছিলো না, তা নয়। বনহুর আর কেশব তখন ভেলায় বসে জাহাজটিকে দেখেছিলো, কেশব লক্ষ্য না করলেও লক্ষ্য করেছিলো। বনহুর–জাহাজের গায়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা পর্যটন শব্দটা। মুহূর্তে সে বুঝে নিয়েছিলো, এ জাহাজটি সাধারণ প্যাসেঞ্জার জাহাজ নয়। নিশ্চয়ই ভ্রমণকারী জাহাজ হবে। নূরীর-সন্ধান নিতে হলে এমনি একটি যানেরই প্রয়োজন। কাজেই আবু সাঈদ যখন তার সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তখন প্রথম নজরেই বনহুর তার পরিচয় জানতে পেরেছিলো, বুঝতে পেরেছিলো এই ব্যক্তিই অধিনায়ক।
বনহুর নিজকে এ জাহাজে স্থায়ী করে নেওয়ার জন্যই নাবিক হিসাবে পরিচয় দিয়েছিলো এবং তার অভিসন্ধি সফলও হয়েছিলো। আবু সাঈদ তাকে তার জাহাজে নাবিক পদে নির্বাচিত করে নিয়েছিলেন।
বনহুর নাবিকের কাজে ব্যস্ত থাকলেও গোপনে জাহাজের সমস্ত কিছু খবরাখবর রাখতে লাগলো। সে সাবধানে সমস্ত জাহাজ অনুসন্ধান করে ফিরলো, কারণ সেদিন নুরী সেই পর্বতমালা থেকে অন্তর্ধান হয়েছিলো সেইদিন রাতে বৃক্ষশাখায় বসে সে শুনতে পেয়েছিলো জাহাজের। ইঞ্জিনের শব্দ। তাই এ জাহাজেও বনহুর নূরীকে খুঁজে ফিরেছিলো তন্ন তন্ন করে।
বনহুর আর কেশব এখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেও নীহার প্রতিদিন তাদের খোঁজখবর নিতো। কেমন আছে ওরা–একদিন না জানলে সে যেন মনে শান্তি পেতো না। ওদের ভালমন্দ দেখাশোনার দায়িত্ব যেন তার।
কোমল-প্রাণ নীহারের অন্তরের স্নিগ্ধ-সুন্দর অভিব্যক্তিকে উপেক্ষা করতে পারে না বনহুর। ওর সাক্ষাৎ কামনায় মন যেন উনুখ থাকতো বনহুরের।
বনহুর যখন ইঞ্জিনের কাজে লিপ্ত থাকতো, অদূরে এসে দাঁড়াতো নীহার, বনহুরের অজ্ঞাতে নিস্পলক নয়নে তাকিয়ে থাকতো ওর দিকে। নীহার নিজের অজান্তে কখন যে নাবিক বনহুরের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলো, সে বুঝতেই পারেনি।
আজ প্রায়-সপ্তাহের বেশি হয়ে এলো বনহুর আর কেশব এ জাহাজে আশ্রয় পেয়েছে। ইতিমধ্যে পর্যটন এখনও কোথাও নোঙ্গর করেনি। সাগরবক্ষে ধরে মেরুন্দা বন্দর অভিমুখে তাদের জাহাজ এখন চলেছে। আর দুদিন পর তাদের পর্যটন মেঘমুক্ত বন্দরে পৌঁছতে সক্ষম হবে।
মেঘমুক্ত সচ্ছ আকাশ।
