এবার আবু সাঈদের সঙ্গে যারা এসেছেন সবাই প্রায় বয়স্ক ভদ্রলোক, কেবল নাসের ছিলো অল্পবয়সী যুবক। নাসের আবু সাঈদের বন্ধু হাশেম চৌধুরীর ছেলে। উচ্চশিক্ষিত আধুনিক মডার্ণ ছেলে। এ ছেলেটিকে আবু সাঈদ বড় পছন্দ করেন এবং ভবিষ্যতে কন্যা মিস নীহারকে সমর্পণ করবেন ওর হাতে–এই উদ্দেশ্যেই তিনি নাসেরকে পর্যটক হিসাবে সব সময় সঙ্গে রাখেন।
মিস নীহার কিন্তু নাসেরকে তেমন সমীহ করতো না, বা ভাল চোখে দেখতো না। কারণ নাসের ছিলো অত্যন্ত অসৎ চরিত্র যুবক। প্রায়ই সে নীহারকে তার প্রেমবাসনা জানাতো।
নীহার উপেক্ষা করতো তাকে, কিন্তু পিতার জন্যই কঠিন কিছু বলতে পারতো না।
নাসের শিক্ষিত ছেলে হলেও মন তার ছিলো কুৎসিত লালসাপূর্ণ এবং লোভী। তেমনি সুচতুর ছিলো সে। ভিতরের রূপটা তার কেউ সহজে ধরতে পারতো না, এমন কি জনাব আবু সাঈদ পর্যন্ত নয়। বিড়াল তপস্বীর মত নিজেকে সাধু সাজিয়ে কার্যসিদ্ধির উপায় খুঁজতো। আবু সাঈদ নাসেরের ভিতরের রূপ সম্বন্ধে না জানলেও নীহারের কাছে কিন্তু অজানা ছিলো না।
শুধু তাই নয়, নাসেরের মনে আরও একটা দূরভিসন্ধি লুকিয়ে ছিলো যা কেউ জানে না বা জানতে পারেনি। এমন কি, নাসেরের কয়েকজন দুষ্ট বন্ধুবর এই জাহাজে ছিলো–তারাও জানতো না তার মনের কথা।
বনহুর আর কেশবকে যখন জাহাজে উঠিয়ে আনা হলো তখন জাহাজের প্রায় সকলেই এসে ডেকের উপরে ভিড় জমিয়েছিলো। জনাব আবু সাঈদের সঙ্গে তার কন্যা নীহারও এসে দাঁড়ালো। তার চোখেও বিস্ময়, পিতার মতই জানার বাসনা–কে এরা? কি এদের পরিচয়? আর এসেছেই বা কোথা হতে?
আবু সাঈদ স্বয়ং জিজ্ঞাসা করলেন–কোথাকার লোক এরা জানতে পারি কি?
যারা বনহুর আর কেশবকে বোটে তুলে নিয়ে এসেছিলো তাদের একজন জবাব দিলো, বললো–স্যার, জাহাজডুবি হয়ে এদের এ অবস্থা হয়েছে। কোথাকার লোক এখনও আমরা জানতে পারিনি।
বনহুর একবার ডেকের উপরে সকলের মুখে দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে তাকালো আবু সাঈদের মুখে, বললো–আমি নাবিক, জাহাজডুবি হয়ে আমার এ অবস্থা। আমার সঙ্গীও আমাদের জাহাজেরই একজন কর্মচারী।
সংক্ষেপে বনহুর নিজের বক্তব্য শেষ করে নিলো।
আবু সাঈদের চোখমুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, তাদের জাহাজে একজন ভাল নাবিকের নিতান্ত প্রয়োজন ছিলো। নিজেদের লোকজনদের বলে দিলেন তিনি এদের প্রতি ভাল ব্যবস্থা নিতে।
পিতার পাশে দাঁড়িয়ে নীহার এদের অবাক হয়ে দেখছিলো। করুণায় মন তার ভরে উঠেছিলো, জানি কত অসহায় এরা! আসলেই নীহার ছোটবেলা হতেই ছিলো অত্যন্ত মিষ্ট-স্বভাব মেয়ে, মায়া-মমতায় ভরা ছিলো ওর হৃদয়। ব্যথিতের ব্যথা তাকে চঞ্চল করে তুলতো।
আজ বনহুর আর কেশবের অবস্থা তার মনে আঘাত করলো। পিতা তার অনুচরদের আদেশ করে চলে গেলেও নীহার গেলো না, সে দাঁড়িয়ে রইলো তাদের পাশে।
অল্পক্ষণ পরেই একজন গরম দুধ নিয়ে এলো।
নীহার তার হাত থেকে দুধের গেলাস নিয়ে নিজেই এগিয়ে ধরলো বনহুরের মুখের কাছে।
বনহুর কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকালো, একটু হাসবার চেষ্টা করে বললো–মেম সাহেব, আমার হাতে দিন। সত্যি আপনার কত দয়া!
বনহুরের গম্ভীর শান্ত মিষ্ট কণ্ঠস্বরে নীহার মুগ্ধ হলো। দুধের গেলাসটা বনহুরের হাতে দিয়ে, আর এক গেলাস দুধ নিয়ে কেশবের মুখে তুলে ধরলো।
কেশব অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলো, কাজেই নিজ হাতে খাবার মত সে সমর্থ ছিলো না। নীহারের হস্তে কেশব দুধ পান করতে লাগলো।
বনহুরের দুধ পান তখন হয়ে গিয়েছিলো, নিস্পলক নয়নে সে তাকিয়ে দেখছিলো নীহারের। অপূর্ব মমতায় ভরা মুখখানা। বনহুর এমন মেয়ে জীবনে কমই দেখেছে। বিশেষ করে ধনবান দুহিতাগণ এমন হয় না।
কেশবকে যখন নীহার নিজ হস্তে দুধ পান করিয়ে দিচ্ছিলো ঠিক তখন নাসের এসে দাঁড়ালো। সেখানে। ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো সে একবার বনহুর আর কেশবের দিকে। তারপর ব্যঙ্গভরা কণ্ঠে বললো–নীহার, তোমার বিবেক বলে কিছু নেই দেখছি। কোথাকার কি ছোটলোক তাদের সেবায় এগিয়ে গেছো তুমি?
কেশবের দুধ পান হয়ে গিয়েছিলো, খালি গেলাস হাতে উঠে দাঁড়ালো নীহার, চোখে রাগত দৃষ্টি নিয়ে স্থির কণ্ঠে বললো সেনাসের সাহেব, আপনাকে আমার সম্বন্ধে এতো বেশি ভাবতে দেখে আমি দুঃখিত। আমার খুশিমত কাজ আমি করবো, এতে আপনি কোনো কথা বলতে আসবেন না।
নীহার, তোমার সম্বন্ধে আমি কেন এত বেশি ভাবি তা তুমি নিশ্চয়ই জানোনা, এখানে সেকথা বুঝিয়ে বলতে চাই না। কিন্তু এসব তোমার সাজে না মনে রেখো।
বনহুর মুহূর্তে বুঝে নিলো ব্যাপারখানা, নীরবে তাকিয়ে দেখে নিলো নাসের সাহেবকে একবার।
নীহার চলে গেলো।
অন্যান্য কর্মচারী বনহুর আর কেশবকে তাদের জন্য নির্ধারিত ক্যাবিনে নিয়ে বেডে শুইয়ে দিলো। জাহাজের ডাক্তার তাদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হলেন।
*
কয়েক দিনেই কেশব আর বনহুর সুস্থ হয়ে উঠলো। তবু ডাক্তারের আদেশ অনুসারে আরও কয়েকদিন তাদের বিশ্রাম করতে হলো।
রোজই একবার করে বনহুর আর কেশবের ক্যাবিনে এসে খোঁজ নিতো নীহার। বনহুরের বেডের পাশে এসে দাঁড়াতো সে, জিজ্ঞাসা করতো তারা এখন কেমন আছে। ঠিকভাবে ঔষধ পথ্যাদি খাচ্ছে কিনা ওরা তাও জেনে নিতে ভুলতো না।
নীহার যখন উদ্বিগ্নভাবে তাদের ভালমন্দ নিয়ে প্রশ্নবাদ করতো, তখন বনহুর হেসে বলতো মেম সাহেব, আপনি বড় ভাল মেয়ে। আমরা গরিব বেচারী জেনেও আপনার দয়ার অন্ত নেই।
