জলপ্রপাতের স্বচ্ছ জল পান করে আরও দুটোদিন কেটে গেলো। ভেলাখানা এবার আপন ইচ্ছায় ছুটতে শুরু করেছে, অত্যন্ত দ্রুত এগুচ্ছে ভেলাটা।
বনহুর ভাবলো, হয় এবার জীবন রক্ষা হবে নয় মৃত্যু হবে। সমস্ত দিন ভেলাখানা একভাবে চলার পর বিকেলের দিকে একটা শব্দ তার কানে আসতে লাগলো, ঠিক জলোচ্ছাসের শব্দ বলে মনে হলো বনহুরের।
অনুমান মিথ্যা নয় সন্ধ্যার পূর্বেই তাদের ভেলাখানা একটা বড় নদীতে এসে পড়লো। নদী হলেও অত্যন্ত খরস্রোতা এবং তরঙ্গায়িত প্রশস্ত নদী। এততক্ষণ বনহুর এই নদীর তীব্রগর্জন শুনতে পাচ্ছিলো। বনহুর চিন্তাগ্রস্ত হলো, বিশেষ করে কেশব অত্যন্ত দুর্বল, ক্ষীণ হয়ে পড়েছিলো। বড় নদীতে ভেলাখানা একখন্ড কাষ্ঠ টুকরার মত ঢেউয়ের বুকে দুলে দুলে এগুচ্ছিলো।
কেশব বললো একবার–আর যে পারছি নে বাবু?
বনহুর কেশবের বুকে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো–এখন আমাদের ভেলা বড় নদীতে এসে পড়েছে। আর কিছু সময় ধৈর্য ধরো কেশব, হয়তো কোনো ষ্টিমার বা জাহাজের নজরে পড়ে যেতে পারি।
কেশব শুকনো ঠোঁট দু’খানা জিভ দিয়ে চাটতে লাগলো। সূর্যের চাপ অত্যন্ত বেড়ে গেছে, কালো হয়ে উঠেছে কেশবের মুখ। বনহুরের সুন্দর মুখমন্ডল নিষ্প্রভ মলিন, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি চুলগুলো এলোমেলো। মর্মান্তিক অবস্থা বনহুর আর কেশবের।
বনহুর আর কেশব যখন মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়ে নিচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ধুম্ররাশি নজরে পড়লো বনহুরের, দূরে অনেক দূর ক্ষীণ রেখার মত। কিছুক্ষণ পরেই কানে একটা শব্দ এলো, ঠিক জাহাজের ইঞ্জিনের শব্দ বলেই মনে হলো তার।
আশায়-আনন্দে বনহুরের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। কেশবকে ডেকে বললো বনহুর–ভাই কেশব, কোনো জাহাজ এদিকে আসছে বলে মনে হচ্ছে। হয়তো আমরা এবার বাঁচতে পারি।
বনহুরের কথা সত্য নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে স্পষ্ট দেখতে পায় একটি জাহাজ দ্রুত এগিয়ে আসছে এই পথে।
মুহূর্ত বিলম্ব না করে বনহুর নিজের দেহ থেকে জামাটা খুলে নিয়ে নাড়তে লাগলো।
জাহাজখানার গতি ক্রমান্বয়ে মন্থর হয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে। তাহলে দেখতে পেয়েছে ওরা তাদের ভেলাখানাকে।
কিছু সময় জাহাজখানা তাদের ভেলার অতি নিকটে এসে পড়লো। বনহুর লক্ষ্য করলো, জাহাজ থেকে বোট নামানো হচ্ছে।
এবার বনহুর কেশবকে তুলে বসিয়ে দেবার চেষ্টা করে বললো–আমাদের উদ্ধারের জন্য বোট আসছে। কেশব, তুমি নিজকে একটু শক্ত করে নাও।
কেশব ধুকছিলো, অতিকষ্টে উঠে বসলো ভেলার বুকে। বনহুর ওকে ধরে রইলো মজবুত করে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বোটখানা নিয়ে দুটি লোক এগিয়ে এলো বনহুর আর কেশবের ভেলার নিকটে।
বনহুর দেখলো এরা সম্পূর্ণ বাঙালি। ভেলার নিকটে পৌঁছে শুদ্ধ বাংলায় বললো–তোমরা কে? তোমাদের এমন অবস্থা কেন?
নিজের পরিচয় দেওয়া বনহুরের পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব হয়না-বিশেষ করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। আজও বনহুর মিথ্যা বলতে বাধ্য হলো, বললো–জাহাজডুবি হয়ে আজ আমাদের এ অবস্থা।
লোক দুটির চোখেমুখে সহানুভূতির ছাপ ফুটে উঠলো, তুলে নিলো ওরা বনহুর আর কেশবকে তাদের বোটে।
জাহাজে পৌঁছে বনহুর বুঝতে পারলো, এরা বাংলাদেশের লোক। কথাবার্তায় আরও জানতে পারলো সে–এ জাহাজটির আরোহিগণ পর্যটক। দেশ হতে দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানোই এদের কাজ। নতুন নতুন দেশ, নতুন নতুন জায়গা, এবং অদ্ভুত জিনিস আবিষ্কার করাই হলো এ জাহাজের সকলের উদ্দেশ্য।
জাহাজের ক্যাপ্টেন খাস বাঙালি, বয়স ষাটের অধিক হবে। সুদীর্ঘ বলিষ্ঠ চেহারা, চোখেমুখে আভিজাত্যের ছাপ সুস্পষ্ট। বড় অমায়িক ভদ্রলোক, নাম আর সাঈদ চৌধুরী। প্রচুর অর্থের মালিক। আবু সাঈদ, বিশেষ করে বাঙালিদের মধ্যে এতো-বড় ধনবান অর্থশালী বিত্তলোক কমই আছে। বয়স ষাট হলেও দেহ এবং মন সজীব এবং বলিষ্ঠ। আবু সাঈদের ছোটবেলা হতেই নেশা– বিশেষ বিশেষ জিনিস আবিষ্কার করা। নতুনত্বের নেশায় তিনি সর্বক্ষণ ব্যস্ত। সংসারে তার একমাত্র কন্যা নীহার ছাড়া আর তেমন কোনো আকর্ষণ নেই। প্রচুর কর্মচারী দ্বারা কোম্পানী পরিচালিত হয়ে থাকে, কাজেই কোম্পানী চালনার জন্য তাকে কোনোরকম চিন্তা করতে হয় না। তিনি বছরের প্রায় তিন ভাগ সময় নিজের জাহাজ ‘পর্যটন’ নিয়ে সাগরবক্ষে পাড়ি জমিয়ে থাকেন। তার জন্মস্থান বাংলাদেশের কোন এক অখ্যাত পল্লী, কিন্তু তাঁর সমস্ত কায়কারবার এবং কোম্পানী চিটাগাং শহরে অবস্থিত। এ শহরেই এখন তিনি বাস করেন, বিরাট বাড়ি-গাড়ি-ঐশ্বর্য–সব আছে।
অবশ্য জাহাজ ‘পর্যটনে তার সব কিছু–একটা গোটা সংসারের যাবতীয় আছে। পাশাপাশি দুটো ক্যাবিনে পিতা-পুত্রী থাকেন।
জাহাজটি অত্যন্ত বড় না হলেও খুব সুন্দর এবং আধুনিক ধরণের কয়েকটি ক্যাবিন বেড় রুম আকারে ব্যবহৃত হয়ে থাকে ডাইনিং কিচেন এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় আরও ক্যাবিন আছে।
কুলী-মজুর ও খালাসীদের জন্য জাহাজের নিচের তলায় কয়েকটি ক্যাবিন–এ ক্যাবিনগুলোতে থাকে কর্মরত খালাসিগণ। নিচের তলাতেই একটি ক্যাবিনে আশ্রয় পেলো দস্যু বনহুর আর কেশব।
ক্যাপ্টেন আবু সাঈদের ক্যাবিনের পাশেই একটি বড় ক্যাবিন–সেই ক্যাবিনে থাকে আবু সাঈদের সঙ্গী-সাথী পর্যটক দল। দেশ হতে দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানোই যাদের নেশা, সংসারের বন্ধন আবদ্ধ রাখতে পারে না তাদের কোনোদিনই। আবু সাঈদের বন্ধু-বান্ধবের দল ঠিক কতকটা তার মতই, তাই সখ করে অনেক সময় তারাও সঙ্গী হত মিঃ সাঈদের সঙ্গে।
