ভয়-বিহ্বল কণ্ঠে বললো কেশব–বাবু ওখানে যাওয়া ঠিক হবে না ওরা জঙ্গলী দল—
সে আমি বুঝতেই পারছি কেশব, জংলী দল তাদের রত্নগুহায় মানুষ প্রবেশের গন্ধ পেয়েছে।
তাই বুঝি—
হা, ওরা উন্মাদ হয়ে উঠেছে এখন।
সেখানে যাওয়াটা কি তাহলে উচিত হবে বাবু?
না গিয়ে যে উপায় নেই কেশব। দেখতে চাই নূরী, ওদের কবলে পড়ে যায়নি তো?
তাই তো বাবু, চলুন চলুন বাবু আর দেরী করবো না। কেশব গাছ থেকে নামতে শুরু করলো, নূরীর কথা মনে হতেই ভয়-ভীতি ভুলে গেলো সে।
বনহুর আর কেশব দ্রুত চলতে লাগলো, একরকম প্রায় ছুটেই চললো ওরা। রাতের অন্ধকার হলেও বনটা ফাঁকা কাজেই চলতে অসুবিধা হচ্ছিলো না। তবে পর্বতের গা বেয়ে নিচে নামতে একটু সাবধানতা অবলম্বন করতে হচ্ছিলো তাদের।
অত্যন্ত দ্রুত চলার জন্য কিছু সময়ের মধ্যেই তারা দু’জন অনেক নিচে নেমে এলো। এখান হতে পর্বতের পাদমূল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মশালের উজ্জ্বল আলোতে দেখলো বনহুর আর কেশব অসংখ্য জংলী সুড়ঙ্গমুখের বাইরে ছুটাছুটি আর হই-হুল্লোড় করছে। বনহুর বুঝতে পারলো জংলী দল তাদের রত্ন-গুহায় মানুষের প্রবেশ জানতে পেরেছে এবং গুহার পিছন দরজা মুক্ত দেখে ভীষণ ক্ষেপে গেছে।
এক এক জংলীকে ক্রুদ্ধ অবস্থায় ঠিক হিংস্র জন্তুর মতই লাগছিলো। সেকি জমকালো তাদের চেহারা! সমস্ত শরীরে সাদা সাদা রেখা টানা ঠোঁট এবং দাঁতগুলোও সাদা ধবধবে। চোখগুলো দেহের আকারে ক্ষুদ্র মাথার চুলগুলো খাড়া খাড়া আর খাটো। প্রত্যেকের হস্তে সূতীক্ষ্ণ-ধার বর্শা আর বল্লাম।
বনহুর আর কেশব একটা গাছের আড়ালে বেশ কিছু উঁচুতে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো। জংলিগণ কি যেন একরকম শব্দ করছে আর ছুটোছুটি হুটোহুটি করছে।
মশালের আলোতে সুড়ঙ্গমুখ এবং আশপাশ আলোকিত হয়ে উঠেছে। সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে বনহুর ও কেশব। নূরীর সন্ধানে বনহুর তীক্ষ্ণ নজরে দেখতে লাগলো, কিন্তু নূরী বা কোনো সভ্য মানুষের চিহ্ন দেখতে পেলো না। ভাবলো বনহুর নূরীকে নিশ্চয়ই ওরা হত্যা করেছে বা গুহার ভিতর বন্দী করে রেখেছে। বুকটা ধক ধক করে উঠলো কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো–নুরী জংলীহস্তে বন্দী হয়নি। তাকে সভ্য সমাজের কোনো দুষ্ট দল ধরে নিয়ে গেছে–সে নিজ চোখে দেখেছে দামী সিগারেটের টুকরো–
হঠাৎ বনহুরের চিন্তা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। সে দেখলো সুড়ঙ্গ মুখে এসে দাঁড়িয়ে আছে জংলী রাণী তার প্রেমানুরাগিনী বিচিত্রময়ী নারী। চোখেমুখে তার কঠিন ভাব, দু’চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। অদ্ভুত শব্দে কি যেন উচ্চারণ করলো জংলী রাণী।
সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত জংলী নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়ালো।
জংলী রাণী সুউচ্চ কণ্ঠে পুনরায় কিছু উচ্চারণ করলো। অমনি বনহুর লক্ষ্য করলো– কয়েকজন জংলী গুহার ভিতরে প্রবেশ করলো।
স্তব্ধ হয়ে দেখছে বনহুর আর কেশব।
কেশব বললো ফিস ফিস করে না জানি কি দেখতে হবে বাবু। আমার মাথা ঘুরছে আমি আর দাঁড়াতে পারছি না–
তুমি বসে পড়ো কেশব তোমাকে দেখতে হবে না।
বনহুর তাকে বসতে বললেও সে বসতে পারলো না। বনহুরের পিছন দিকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলো।
বিস্ময়ভরা নজরে দেখলো বনহুর আর কেশব এক অদ্ভুত কান্ড! যেসব জংলী গুহামধ্যে প্রবেশ করেছিলো তারা কয়েকজন মিলে রত্নসিন্দুক ধরে বের করে নিয়ে এলো, সুড়ঙ্গমুখে সারিবদ্ধ করে রাখলো।
বনহুর আর কেশব অন্ধকারেও একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিলো। দেখলো বনহুর আর। কেশব-জংলী রাণী হাত উঁচু করে কি যেন শব্দ করলো অমনি বলিষ্ঠ জংলিগণ এক একটা রত্নসিন্দুক তুলে নিয়ে নিক্ষেপ করলো গভীর জলোচ্ছাসের মধ্যে।
কেশব অস্ফুট আর্তকণ্ঠে বললো–বাবু, সর্বনাশ-ওরা রত্নসিন্দুকগুলো গভীর জলপ্রপাতের মধ্যে নিক্ষেপ করছে। হায় কি হলো বাবু?
কেশব স্থির হও। ওরা বুদ্ধিমানের কাজই করছে। কারণ রত্নগুহার সন্ধান মানুষ যখন জানতে পেরেছে তখন তারা এ গুহা সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত নয়, তাই নিশ্চিন্ত স্থানে ওরা রত্নসিন্দুকগুলো লুকিয়ে রাখলো।
গভীর জলমধ্যে নিক্ষেপ করে ওরা—
হাঁ, ওরা নিশ্চিন্ত হলো।
বাবু!
কেশব, আমিও নিশ্চিন্ত হলাম। কারণ রত্নসিন্দুকগুলো এখন ঠিক জায়গায় রক্ষিত রইলো।
বাবু! কেশবের চোখেমুখে বিস্ময়, অন্ধকারে কেশবের মুখ বনহুর দেখতে না পেলেও তার কণ্ঠস্বরে মনোভাব বুঝে নিলো।
বললো বনহুর–কেশব, জংলিগণ তাদের রত্নসিন্দুক যেখানেই লুকিয়ে রাখুক, দস্যু বনহুরের কবল থেকে নিশ্চিন্ত রাখতে সক্ষম হবে না। জংলীরা সিন্দুকগুলো জলমধ্যে নিক্ষেপ না করলেও আমিই ওগুলো জলমধ্যে গোপন রেখে তবেই যেতাম। যা আমার কাজগুলোই ওরা সমাধা করলো।
কেশব স্তব্ধ হয়ে গেছে। কোনো কথা তার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হলো না।
বনহুর অন্ধকারেই একটু হাসলো, তারপর বললো–কেশব তুমি কি মনে করো ওগুলো আমাদের নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিলো?
বাবু, তাহলে কি ওগুলো নিতেন না?
না কেশব, এখন ওসব নেওয়া কিছুতেই সম্ভব ছিলো না। কারণ আমরা এখন কোন পথে কেমনভাবে কোথায় গিয়ে পৌঁছব কে জানে। জীবন রক্ষাই সঙ্কটাপন্ন হয়ে দাঁড়াবে।
রত্নসিন্দুক সামলাবে কখন? ঐ দেখো জংলিগণ এবার নিশ্চিন্ত মনে ফিরে যাচ্ছে। আর কোনা চিন্তা নেই ওদের। হঠাৎ হেসে উঠে অদ্ভুতভাবে বনহুর তারপর হাসি থামিয়ে বলে–নির্বোধ জংলী দল–
