জংলিগণ সব অন্তর্হিত হলো সুড়ঙ্গমুখে গুহার ভিতরে। মশালের আলো এবং তাদের কলকন্ঠের চিৎকারধ্বনি আর কর্ণ গোচর হচ্ছে না।
ওদিকে পূর্বাকাশ আলোকিত করে ভোরের সূর্য উঁকি দিচ্ছে তখন।
বনহুর আর কেশব বৃক্ষতলে বসে পড়লো।
কেশব বললো–ফুলের সন্ধান না নিয়ে আমি কিছুতেই এ পর্বত ত্যাগ করবো না বাবু।
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করে বললো বনহুর–সে এ পর্বতের কোথাও নেই কেশব।
কেমন করে জানলেন বাবু?
ঐ সিগারেটের টুকরো এবং রাত্রিতে জাহাজ বা ষ্টীমারের শব্দ আমাকে নিঃসন্দেহ করেছে। কেশব।
তাহলে ফুলকে নিয়ে হরণকারীদল পালিয়ে গেছে?
সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত আমি।
এখন কি করবেন বাবু?
চলো বেলা উঠবার সঙ্গে সঙ্গে আমরা জলপ্রপাতে আমাদের ভেলা ভাসিয়ে দেই। যেমন করে হোক সন্ধান করতেই হবে নূরীর।
তাকে আমরা আর পাবো বাবু?
কেমন করে বলবো কেশব। কেমন করে বলবো বলো?
*
বনহুর আর কেশব অনেক কষ্টে তাদের তৈরি ভেলাখানা নিয়ে আসতে সক্ষম হলো। জলপ্রপাতে ভেলা ভাসিয়ে চেপে বসলো বনহুর আর কেশব।
কেশবের গন্ড বেয়ে ঝরতে লাগলো অশ্রুধারা।
বনহুরের চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত না হলেও মন তার জমাট বেদনায় গুমড়ে কেঁদে কেঁদে উঠছিলো। অতিকষ্টে নিজকে সংযত রেখেছিলো সে। কেশব কেঁদে কেটে আকুল হয়ে পড়েছে–সেও যদি কোনোরকম দুর্বলতা প্রকাশ করে তাহলেও আরও ভেঙে পড়বে।
জলপ্রপাতে ভেলা ভাসিয়ে বনহুর আর কেশব উঠে বসলো, ভোরের সূর্য তখন তীব্র হয়ে উঠেছে।
ভেলাখানা তীরবেগে ভেসে চললো উঁচু থেকে নিচের দিকে। ক্রমান্বয়ে সুড়ঙ্গমুখ অস্পষ্ট হয়ে আসছে। পর্বতমালার ভিতর দিয়ে খরস্রোতা জলপ্রপাত বেয়ে ভেলাখানা এগুচ্ছে।
বনহুর গম্ভীর স্থির কণ্ঠে বললো–কেশব, পথ চিনে রাখো, আবার আমাদের এই পথে একদিন। আসতে হবে।
অবাক হয়ে কেশব তাকালো বনহুরের মুখের দিকে বললো–সেকি বাবু?
হাঁ কেশব, আগে নূরীকে খুঁজে বের করবো। তারপর ফিরে যাবো আমার আস্তানায়। আমার দলবল নিয়ে আবার আসবো। না হলে সাপুড়ে সর্দারের শেষ বাসনা সিদ্ধ হবে না।
বনহুরের কথা শেষ হয় না, একটা বর্শা এসে বিদ্ধ হয় বনহুরের ঠিক পাশে ভেলার গায়ে।
চমকে এক সঙ্গে ফিরে তাকায় বনহুর আর কেশব। বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যায়, দেখতে পায়– তীরে একটা জমকালো বিরাট অশ্বপৃষ্ঠে বসে আছে জংলী রাণী স্বয়ং। বাতাসে তার কটা চুলগুলো উড়ছে। দক্ষিণ হস্তে তার আর একখানা উদ্যত বর্শা।
২.১৪ নাবিক দস্যু বনহুর
ভাগ্যিস বর্শাখানা বনহুরের দেহে বিদ্ধ হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে জংলীরাণীর নিক্ষিপ্ত দ্বিতীয় বর্শাও তীরবেগে ছুটে এলো। মুহূর্ত বিলম্ব না করে বনহুর কাৎ হলো একপাশে।
বর্শাখানা এসে ঠিক বনহুরের সম্মুখে ভেলায় গেঁথে গেলো। সামান্যের জন্য তার দেহে বিদ্ধ হয়নি বা হলো না।
ভীত স্বরে কেশব বললো–সর্বনাশ! বাবু, জংলীরাণী অশ্ব নিয়ে ছুটে চলছে আমাদের ভেলার সঙ্গে।
বনহুর সোজা হয়ে বললো–অশ্বের গতির চেয়ে আমাদের ভেলার গতি আরও দ্রুত আছে।
বনহুরের কথা মিথ্যা নয়, তাদের ভেলা অত্যন্ত দ্রুত ভেসে চলেছে। কারণ জলপ্রপাতের গতি এখানে খুব বেশি।
ওদিকে পাড়ের উপর দিয়ে অশ্বপৃষ্ঠে এগুচ্ছে জংলীরাণী। হস্তে তার আর একখানা উদ্যত বর্শা। বনহুর তাকিয়ে দেখলো অশ্বপৃষ্ঠে আরও কতকগুলো বর্শা বাঁধা রয়েছে, জংলীরাণী তারই। একটি করে বর্শা খুলে নিয়ে নিক্ষেপ করছে তাদের লক্ষ্য করে।
ভেলাখানা অত্যন্ত বেগে স্রোতের টানে সম্মুখ দিকে ভেসে চলেছে। প্রশস্ত নদীবক্ষে কোনো বাধা পাচ্ছিলো না বা কোনো অসুবিধা হচ্ছিলো না ভেলাখানার।
বনহুর আর কেশব ভেলাখানা শক্ত করে ধরে বসে রইলো কিন্তু তাদের দৃষ্টি রয়েছে তীরস্থ অশ্বপৃষ্ঠে ছুটে চলা জংলীরাণীর দিকে। রুদ্রাণী মূর্তি নিয়ে এগিয়ে আসছে জংলীরাণী।
কেশবের মুখ ছাই-এর মত ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।
বনহুরের মুখমন্ডলে একটা কঠিন ভাব ফুটে উঠেছে। জংলীরাণীকে কাবু করা তার পক্ষে অসম্ভব হবে না, কারণ জংলীরাণীর অসংখ্য জংলী অনুচরগণ এখন তার সঙ্গে নেই। কিন্তু যেভাবে। তাদের ভেলা চলেছে তাতে জংলীরাণীর কবলে ধরা পড়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই।
অল্পক্ষণের মধ্যেই ভেলা বহুদূরে চলে গেলো।
ওদিকে জংলীরাণী অশ্বপৃষ্ঠে তীরবেগে ছুটে আসছে।
পর্বতের পাদমূল বেয়ে জলপ্রপাতটি–কাজেই দু’ পাশের তট শুধু কঠিন পাথরে তৈরি এবং অত্যন্ত উঁচুনীচু। জংলীরাণী অশ্বপৃষ্ঠে ভেলাখানাকে অনুসরণ করলেও ঠিকমত এগুতে সক্ষম। হচ্ছিলো না। তবু ক্ষান্ত হবার কোনো লক্ষণ নেই জংলীরাণীর মধ্যে।
জমকালো বিরাটদেহী অশ্ব কতকটা বনহুরের তাজের মত দেখতে। এতো বিপদেও। জংলীরাণীর অশ্বটিকে লক্ষ্য করে বনহুরের মনে তার তাজের কথা স্মরণ হতে লাগলো। কতদিন। সে তাজকে দেখে না, তাজের পিঠে চাপেনি। না জানি আর সে কোনোদিন তাজের পিঠে চাপতে পারবে কিনা কে জানে।
বনহুর জংলীরাণীর অশ্বচালনা দেখে শুধু বিস্মিতই হলো না, মুগ্ধও হলো। বিনা লাগামে জংলীরাণী অশ্ব চালনা করছিলো। শুধুমাত্র লাগামের মত করে একখানা রশি ছিলো তার হাতের মুঠায়!
সূর্যের আলোকে জংলীরাণীর কণ্ঠের মূল্যবান হীরকখন্ডগুলো থেকে উজ্জ্বল দ্যুতি ঠিকরে বের হচ্ছিলো। বহুদূর হতে বনহুর আর কেশবের চোখ যেন ধাধিয়ে যাচ্ছিলো।
