বনহুর আর কেশব নূরীকে না দেখতে পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো, চিৎকার করে ডাকতে লাগলো–নূরী নূরী নূরী–
কিন্তু কোথায় নূরী!
কেশব ছুটাছুটি শুরু করে–একবার এদিকে যায়–একবার ওদিকে। মুখ তার অন্ধকার বিষাদময় হয়ে উঠেছে মুহূর্তে।
নূরীকে কেশব নিজ বোনের মতই স্নেহ করে–ভালবাসে। একদিন অবশ্য নূরীকে সঙ্গিনীরূপে পাবার জন্য সে উন্মুখ ছিলো, আজ তার ভালবাসা পবিত্রতার বন্ধনে গম্ভীর হয়ে উঠেছে। নূরীর অদর্শনে কেশব পাগলের মত বনের মধ্যে এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করতে লাগলো আর উচ্চকণ্ঠে ডাকতে লাগলো–ফুল, ফুল, কোথায় তুমি গেলে ফুল—
বনহুর নির্বাক নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার কেঁচড় হতে ফলগুলো গড়িয়ে পড়লো ভূতলে।
কেশব বনের মধ্যে ডেকে ডেকে এক সময় ফিরে এলো বনহুরের সম্মুখে, ব্যাকুল কণ্ঠে বললো–এখন কি হবে বাবু?
বনহুর কোনো জবাব দিলো না বা দিতে পারলো না। আর কিইবা দেবে! হৃদয়ে আগুন জ্বলছে–এতবড় ভুল সে করলো কি করে! এই যে পর্বতমালা রয়েছে, এই যে গাছপালা রয়েছে–বনহুর বা কেশবের এখনও কোনো হিংস্র জীবজন্তু নজরে পড়েনি। গেলো কোথায় নূরী! হঠাৎ বনহুরের দৃষ্টি চলে গেলো ভেলার পাশে। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ে চক্ষু তার স্থির হয়ে গেলো, উবু হয়ে হাতে তুলে নিলো একখন্ড অর্ধদগ্ধ সিগারেট।
সোজা হয়ে দাঁড়ালো বনহুর, অর্ধদগ্ধ সিগারেটটা চোখের সম্মুখে ধরে বললো–কেশব এখানে কোনো সভ্য সমাজের মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিলো।
কেশবও অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছে সিগারেটের টুকরাটা, বললো সে–বাবু তাহলে ফুলকে কি কোনো মানুষ ধরে নিয়ে গেছে?
হ নূরীকে কোনো সভ্য সমাজের মানুষ ধরে নিয়ে গেছে। জংলী বা অসভ্য জাতিরা এমন সিগারেট পাবে কোথায় বলো? কিন্তু কারা তারা এবং নূরীকে নিয়ে গেলই বা কোথায়?
বাবু নিশ্চয়ই জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করেছে।
না কেশব, জঙ্গলে তারা যাবে না, নিশ্চয়ই নিচের দিকে–মানে পর্বতের পাদমূলে নেমে গেছে।
বনভূমি এবং পর্বতের পাদমূলে বনহুর আর কেশব নূরীর অন্বেষণ করে ফিরলো তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফিরলো তারা দু’জন সমস্ত দিন ধরে। একসময় সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলো পর্বতমালার গায়ে।
বনহুর হতাশ হয়ে বসে পড়লো ভূতলে। সন্ধ্যার অন্ধকার শুধু বিশ্বটাকেই অন্ধকারময় করে দেয়নি তার অন্তরের সমস্ত আলোও যেন নিভে গেলো বেলাশেষের অস্তমিত আলোকরশ্মির সঙ্গে সঙ্গে।
কেশবের অবস্থা আরও শোচনীয়। একে ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর সে তদুপরি নূরীর অন্তর্ধান নিয়ে সমস্ত দিন ধরে প্রায় সমস্ত পর্বতমালা এবং পর্বতের পাদমূল চষে ফিরেছে তবু যদি ফিরে পেতো তাকে। অত্যন্ত ভেঙে পড়লো কেশব। বনহুর মুষড়ে পড়লেও সে কঠিন পুরুষ–সহ্য করা। তার অভ্যাস হয়ে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ হতবাক বিষাদমগ্ন হয়ে থেকে বললো বনহুর–কেশব, নূরী এ পর্বতমালা বা এ জঙ্গলে নেই। তাকে নিয়ে হরণকারী দল চলে গেছে দূরে কোথাও।
তাহলে কি হবে বাবু? কেঁদে উঠে বললো কেশব।
কি বলবো কেশব, আমি যে তোমার প্রশ্নের জবাব দিতে অক্ষম। এমন যে হবে আমি ভাবতেও পারিনি।
সত্যি বাবু, কোথা থেকে কেমন করে কারা এলো যারা ফুলকে চুরি করে নিয়ে গেলো। আহা ফুল না জানি কত চিৎকার করেছে কত ডেকেছে আমাদের দু’জনাকে–
কেশবের ক্রন্দনভরা আকুল কণ্ঠে বনহুরের মন আরও গুমড়ে কেঁদে উঠে বলে বনহুর– কেশব, আজ রাত আমাদের এ বনেই কাটাতে হবে।
তারপর কি করবেন বাবু?
চলে যাবো এ বন ছেড়ে।
কিন্তু ফুল! ফুলের সন্ধান না নিয়ে আপনি কেমন করে এ বন ত্যাগ করবেন বাবু?
গভীর চিন্তাযুক্ত কণ্ঠে বললো বনহুরফুল আর এ জঙ্গলে নেই কেশব! তাকে নিয়ে হরণকারীদল এ জঙ্গল, এ পর্বতমালা ত্যাগ করে চলে গেছে।
বনহুর আর কেশব রাতটা কাটিয়ে দেবার মানসে একটা বৃক্ষে আহরণ করলো, চওড়া ডাল। দেখে বসলো দু’জনা। নিচে হঠাৎ কোনো জীবজন্তুর আবির্ভাব ঘটতে পারে, সেজন্যই গাছের ডালে উঠে বসেছিলো ওরা।
গাছের ডালে উঠে বসার একটু পর হঠাৎ একটা শব্দ ভেসে এলো জাহাজের শব্দ ছাড়া অন্য কিছু নয়। কিন্তু বহু দূর-দূরান্ত হতে এ শব্দ আসছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পর্বতমালার ঠিক সম্মুখ বা পিছন কোন দিক থেকে আওয়াজ আসছে তাও বোঝা যাচ্ছে না।
কেশব বললো–এটা কিসের শব্দ বাবু?
বনহুর অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শব্দটা শোনার পর বললো–কোনো জাহাজ আমাদের পর্বতের আশপাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। কিংবা কোনো স্টীমারের শব্দ–
বাবু, এই জাহাজেই ফুলকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, না হলে এদিকে কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া গেলো না।
এ কথার কোনো জবাব দিলো না বনহুর।
গভীর রাতে একটু তন্দ্রার মত হয়ে পড়েছিলো বনহুর আর কেশব। হঠাৎ একটা হই-হুঁল্লোড়ের শব্দে তন্দ্রা ছুটে গেলো। দেখলো ওরা দু’জনা দূরে–অনেক দূরে পর্বতের পাদমূলে ঠিক যেখানে রত্নগুহার মুখ এবং যেখান দিয়ে জলপ্রপাত বেয়ে চলেছে সেখানে অসংখ্য মশালের আলো দপ দপ করে জ্বলছে। যদিও আলোকরশ্মি খুব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো না এবং হই-হুল্লোড়ও অত্যন্ত অস্পষ্ট তবু বোঝা যাচ্ছে সেখানে খুব হট্টগোল চলেছে।
কেশব আর বনহুর বৃক্ষশাখায় বসে দেখতে লাগলো।
অল্পক্ষণ লক্ষ্য করতেই বনহুর বুঝতে পারলো– জংলিগণ ছাড়া ওরা অন্য লোক নয়। বনহুর বললো–কেশব চলো ওখানে যেতে হবে।
