এ দলটি এসেছে জলপথে। অনেক দূরদেশ থেকে তারা এখানে এসেছে কোনো এক ছবির সুটিং-এর জন্য। জাহাজে তাহাদের ক্যামেরা এবং সুটিং-এর প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি রয়েছে। আর আছে প্রচুর পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য।
ছবির পরিচালক স্বয়ং আছেন এ দলে।
তারা ভাল একটি জায়গার অন্বেষণ করে ফিরছেন। এমন সময় হঠাৎ নজর পড়লো ঘুমন্ত নূরীর উপর।
নূরীর অপূর্ব রূপচ্ছটা সবাইকে বিমুগ্ধ করলো।
স্বয়ং পরিচালকের চোখে আনন্দের দ্যুতি খেলে গেলো। একটা ভবিষ্যৎ আশার স্বপ্ন দেখলেন তিনি মনের আকাশে। হস্তস্থিত অর্ধদ্বগ্ধ সিগারেট নিক্ষেপ করে ঝুঁকে পড়লেন তিনি নূরীর মুখের কাছে। ডাকলেন পরিচালক সাহেব–এই মেয়ে শুনছো? এ মেয়ে–
অত্যন্ত ক্লান্তি আর অবসাদে নূরীর নিদ্রা ঘনীভূত হয়ে পড়েছিলো। কানে মানুষের কণ্ঠস্বর পৌঁছতেই নিদ্রা ছুটে গেলো তার। চোখ মেলতেই দেখলো–তার চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকজন লোক। চমকে উঠে বসলো নূরী। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালো সে সকলের মুখে।
পরিচালক সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে এগিয়ে এলেন নূরীর পাশে, শান্ত গলায় বললেন-তুমি এখানে এলে কি করে?
নূরী কোনো জবাব দিলো না, মনের মধ্যে তার ঝড় উঠেছে–না জানি এরা কে বা কোথা হতে এসেছে। বনহুর আর কেশবই বা গেলো কোথায়–কত দূরে। নূরী ভীত দৃষ্টি নিয়ে উঠে দাঁড়ালো, চকিত হরিণীর মত তাকাতে লাগলো এদিক-ওদিকে।
পরিচালক পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন–এই বনে তুমি কোথা হতে এসেছো? কি নাম তোমার?
নূরী কি জবাব দেবে ভেবে পায় না। পরিচালকের কথাবার্তা সে সব স্পষ্ট বুঝতে পারছে কিন্তু জবাব দিতে পারছে না। কি বলবে সে কি বলতে কি বলে বিপদে পড়বে, তাই নীরব রইলো নূরী।
পরিচালক মনে করলেন, মেয়েটি বোবা বা সে তার কথাবার্তা বুঝতে পারছে না, হয়তো বা বাংলা ভাষা সে জানে না কিংবা বোঝে না।
অন্যান্য সবাই বিস্ময়ভরা নয়নে তাকিয়ে দেখছে।
পরিচালক ইশারা করলেন মেয়েটিকে ধরে তাদের জাহাজে নিয়ে যেতে।
মালিকের আদেশ পেয়ে কয়েকজন কর্মচারী ধরে ফেললো নূরীকে, টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে চললো জাহাজের দিকে।
নূরী আঁচড় দিয়ে কামড়ে তবু উদ্ধার করতে পারলো না নিজকে। পরিচালকের অদেশে তাঁর সঙ্গিগণ নূরীকে জোর করে ধরে নিয়ে জাহাজে এনে তুললো।
এমন একটা মেয়েকে হঠাৎ বনে কুড়িয়ে পাওয়ায় খুশিতে আত্মহারা হলেন পরিচালক আসলাম আলী। তিনি আর এখানে বিলম্ব করা উচিৎ মনে করলেন না। নূরীকে একটা ক্যাবিনে বন্ধ করে রাখলেন এবং তৎক্ষণাৎ জাহাজ ছাড়ার আদেশ দিলেন।
বন্ধ ক্যাবিনে কুদ্ধ সিংহীর ন্যায় ছট ফট করতে লাগলো নূরী। মাথার চুল ছিঁড়তে লাগলো টেনে। মেঝেতে পা আছড়ে দেয়ালে মাথা ঠুকে রোদন করতে লাগলো সে।
জাহাজ তখন চলতে শুরু করেছে।
পরিচালক এবং অন্যান্য সহকর্মী একটা ক্যাবিনে বসে আলাপ-আলোচনায় মেতে উঠলেন। এমন একটা অপ্সরীর মত যুবতীকে তারা লাভ করেছেন, যার জন্য আনন্দে উৎফুল্ল সবাই।
প্রধান সহকারী বশীর আহম্মদ বললেন–স্যার বরাৎ বলতে হবে। হঠাৎ এই গহন জঙ্গলে এমন রত্ন কুড়িয়ে পাবো আমরা কল্পনাও করিনি।
হা, সত্যিই বলেছেন আহম্মদ সাহেব।
ক্যামেরাম্যান জ্জোহা চৌধুরী বললেন–আমাদের আগামী ছবির নায়িকার জন্য মেয়েটি সুন্দর মানাবে।
অন্য একজন সহকারী বললো–মেয়েটিকে বাগে আনাই বড় মুস্কিল হবে বলে মনে হচ্ছে।
মিঃ আহম্মদ বললেন–বনের পশুও পোষ মানে, আর এতো মানুষ। কৌশলে একে বশে আনতে হবে, বুঝলেন গম্ভীর কণ্ঠে বললেন–আশ্চর্য, এমন স্থানে মেয়েটি এলো কি করে?
সহকারীদের একজন বললো–হয়তো জংলীদের মেয়ে।
ক্যামেরাম্যান জ্জোহা চৌধুরী বললেন–আমার মনে হয় কোনো ইরানী মেয়ে।
আর একজন বললো–ঠিক তাই হবে, ইরানীদের মেয়েরাই এতো বেশি সুন্দরী হয়।
অন্য আর একজন বললো “কাশ্মিরী মেয়ের মত কিন্তু চেহারা—
এক একজন এক একরকম মতামত প্রকাশ করতে লাগলো মেয়েটি সম্বন্ধে।
পরিচালক তখন গভীরভাবে ভেবে চলেছেন কার মেয়ে কোথা হতে এলো এই পর্বতমালার উপরে। জনহীন নির্জন স্থানে কিভাবে এলো মেয়েটি– সব যেন বিস্ময়কর লাগছে তাঁর কাছে।
*
সমস্ত জাহাজময় চলেছে যুবতীটিকে নিয়ে নানারকম আলাপ আলোচনা। এক একরকম মতামত চলতে লাগলো। এমন কি কুলি খালাসী এবং সারেঙ্গাদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হলো।
এখানে যখন নূরীকে ক্যাবিনে আবদ্ধ করে তাকে নিয়ে নানা রকম আলোচনা চলছে তখন এক গাদা সুস্বাদু ফলমূল নিয়ে ফিরে আসে বনহুর আর কেশব। প্রচুর ফল সংগ্রহ করে এনেছে তারা নূরীর জন্য।
কিন্তু ভেলার পাশে এসে বনহুর আর কেশব নূরীকে না দেখতে পেয়ে হতভম্ব হয়ে পড়লো। প্রথমে মনে করলো নূরী নিকটে কোথায় গেছে; তাই বনহুর চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলো। এখানে বন হলেও বেশ ফাঁকা এবং পরিস্কার। বহুদূরে নজর চলে যায়। কোনোরকম হিংস্র জীবজন্তু এ জঙ্গলে নেই, তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। বনহুর আর কেশব নূরীকে একা রেখে যেতে কোনোরকম দ্বিধা বোধ করেনি।
নূরীও অত্যন্ত ক্লান্তি বোধ করায় ওদের সঙ্গে যায়নি বা যেতে রাজি হয়নি।
বনহুর অবশ্য কেশবকে নূরীর নিকটে থাকবার জন্য বলেছিলো কিন্তু নূরীই তাকে থাকতে দেয়নি তখন। বনহুর একা যাবে–কোনো অসুবিধায় পড়বে, সেই কারণে নূরী চিন্তিত হয়ে পড়েছিলো। এমন পরিস্কার স্বচ্ছ সুন্দর জায়গায় তার কোনো বিপদ ঘটবে বা ঘটতে পারে, কল্পনাও করতে পারেনি সে।
