সুড়ঙ্গমুখে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা যায়।
বনহুর আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রাণভরে নীল আকাশটা দেখে নিলো। এ সুড়ঙ্গমুখ এবং জলপ্রপাতটা পর্বতের ঠিক অপর পাড়ে।
এবার বনহুর তাড়াতাড়ি নূরী এবং কেশবের নিকটে এসে বললো–গুহা থেকে বের হবার দ্বিতীয় পথ পেয়েছি।
নূরী আর কেশব কি করে রত্নগুলো ভালভাবে নিতে পারবে সেই চেষ্টা করছিলো। বনহুরের কথায় খুশিতে আনন্দধ্বনি করে উঠলো।
বনহুর বললো–রেখে দাও ওসব, আগে চলো দেখা যাক্ জলপ্রপাত বেয়ে! যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না।
জলপ্রপাত বেয়ে! এ তুমি কি বলছো বনহুর?
হা চলো দেখবে।
বনহুর নূরী এবং কেশবসহ গুহার শেষভাগে সুড়ঙ্গমুখে এসে দাঁড়ালো। মুক্ত আলো-বাতাস তার চোখেমুখে লাগতেই এবং জলপ্রপাতে নজর পড়তেই উচ্ছল হয়ে উঠলো সে খুশিতে। সোনালী সূর্যের আলো রূপালী জলপ্রপাতে পড়ে অপূর্ব সুন্দর লাগছিলো।
নূরী বনহুরের দক্ষিণ হাতখানা চেপে ধরে খুশিভরা কণ্ঠে বললো–হুঁর, কি সুন্দর–না?
বনহুর তখন গম্ভীর কণ্ঠে বললো–সুন্দরের মাধুর্য উপভোগ করার সময় এখন নয়। কি করে আমরা এখন এ গুহা থেকে জংলীদের নিষ্ঠুর দৃষ্টি এড়িয়ে চলে যেতে পারি, সেই চিন্তা করতে হবে।
বনহুরের কথায় নূরীর মুখ চিন্তাযুক্ত হলো।
কেশব বললো–ভয়ানক দুশ্চিন্তার কথা বাবু, কি করে এখান হতে যাওয়া যাবে?
উপায় একটা করতেই হবে কেশব। বনহুর সুড়ঙ্গমুখে দাঁড়িয়ে তাকাতে লাগলো দূরে চারিদিকে। সুড়ঙ্গমুখের উপরেই সুউচ্চ পর্বতমালার শ্রেণীবদ্ধ শৃঙ্গ, আর নীচে জলপ্রপাতের কাকচক্ষুর ন্যায় সচ্ছ জলরাশি পর্বতমালার গায়ে অসংখ্য গাছ-পাছড়া আর লতাগুল্ম আচ্ছাদিত।
বনহুর ভ্রূকুঞ্চিত করে কি যেন ভাবলো, তারপর বললো–এসো কেশব, আমাদের জলপথেই পালাতে হবে।
জলপথে! অবাক কণ্ঠে বললো নূরী।
বললো বনহুর–হ, জলপথে–জলপথে পালানো ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই।
কিন্তু কি করে তা সম্ভব বাবু? বললো কেশব।
সম্ভব করে নিতে হবে, বুঝলে? এসো তোমরা আমার সঙ্গে। বনহুর নূরী আর কেশবসহ সুড়ঙ্গমুখের বাইরে পা বাড়ালো। এদিকে ঘন জঙ্গল বা অন্ধকারময় নয়। পরিষ্কার আকাশ দেখা যাচ্ছে। বনহুর ওদের নিয়ে পর্বতের গা বেয়ে উপরের দিকে উঠতে লাগলো।
পর্বতের গা অত্যন্ত খাড়া ছিলো, নূরী এবং কেশবের উঠতে খুবকষ্ট হচ্ছিলো। বনহুর নূরীর হাত ধরে তাকে সাহায্য করছিলো। নূরী এবং কেশব ক্ষুধায় অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েছিলো। ঠিকভাবে চলতে পারছিলো না তারা। বনহুরের ক্ষুধাও কম নয় তবে সে সহ্য করতে পারে। কতদিন সে প্রায় সপ্তাহ না খেয়ে কাটিয়েছে হয়তো সামান্য পানি বা ফলমূল খেয়ে তাকে মাসের পর মাস জীবন কাটাতে হয়েছে। কাজেই এসব তার কাছে অতি সামান্য ব্যাপার।
বনহুর আর কেশব মিলে গাছ-গাছড়া কেটে এবং মোটা মোটা লতাপাতা দিয়ে কাঠের একটা ভেলা তৈরি করতে শুরু করে দিলো।
বনহুর এবং কেশবের কাছে সূতীক্ষ্ণ-ধার ছোরা ছিলো, কাজেই ভেলা তৈরির ব্যাপারে তেমন বেগ পেতে হলো না।
কিন্তু এখন সবচেয়ে বেশি সমস্যা হলো খাবে কি ওরা।
নূরী নিজের চেয়ে বেশি চিন্তিত হলো তার বনহুরের জন্য। অত্যন্ত পরিশ্রমে বনহুরের সুন্দর মুখমন্ডল রাঙা হয়ে উঠেছিলো। ললাট বেয়ে ঘাম ঝরছিলো দরদর করে। বার বার বনহুর হাতের পিঠে ললাটের ঘাম মুছে ফেলছিলো।
নূরী বললো–আর কত খাটবে? সত্যি তোমার কষ্ট আমার মনকে বিচলিত করছে হুর।
হাসলো বনহুর, কোনো জবাব দিলো না।
অবিরাম প্রচেষ্টায় একটি সুন্দর মজবুত ভেলা তৈরি করে ফেললো বনহুর আর কেশব। গাছপালার ডাল এবং লতাপাতা দিয়েই তৈরি হলো ভেলাটা।
এবার বনহুর বললো–এখন খাবার অন্বেষণে চলো কেশব।
এই বন-জঙ্গল আর পর্বতে খাবার? অবাক হয়ে বললো কেশব।
হয়তো ভাগ্য প্রসন্ন হলে খাবার জুটেও যেতে পারে। বনহুর কেশবসহ অগ্রসর হলো।
নূরীও অনুসরণ করছিলো, বললো বনহুর–তোমার যেতে হবে না নূরী তুমি এখানে বসে থাকো।
নূরীর পা দুখানা অবশ হয়ে পড়েছিলো যেন। বড্ড ক্লান্তি বোধ করছিলো সে, বনহুরের কথায় সে বসে পড়লো ভেলাটার উপরে।
বনহুর আর কেশব চলে গেলো।
ক্ষুধায় কাতর শুধু বনহুর নয়–কেশব আর নূরীর জন্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়েছিলো সে। তাছাড়া ভেলায় চেপে জলস্রোতে ভাসবার পূর্বে কিছু খাবারের নিতান্ত প্রয়োজন।
বনহুর আর কেশব হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলো দূরে–অনেক দূরে। এদিকে পর্বতের গায়ে জঙ্গল বেশ ফাঁকা ও স্বল্প। প্রায় বৃক্ষই ফলশূন্য, তবে মাঝে মাঝে দু’একটা ফলযুক্ত বৃক্ষ নজরে। পড়তে লাগলো। কিন্তু সেসব ফল ভক্ষণ উপযোগী নয়।
বনহুর আর কেশব তবু এগিয়ে চলেছে।
বসে বসে ঝিমুচ্ছিলো নূরী।
ক্ষুধা এবং ক্লান্তিতে অল্পসময়েই ঘুমিয়ে পড়লো সে। শুন্য ভেলার উপরে একটি ঝরা বনফুলের মতই লাগছিলো তাকে। তৈলবিহীন রুক্ষচুল, ঘাগড়া আর ওড়না মলিন হয়ে পড়েছে। ছিঁড়েও গেছে কয়েক স্থানে। বিষণ্ণ ক্ষুধাকাতর মুখখানাকে অপূর্ব লাগছে। গহন জঙ্গলে দেবকন্যার মতই সুন্দর লাগছে নূরীকে।
এমন সময় একদল লোক এসে পড়ে সেখানে। কয়েকজনের হস্তে রাইফেল। পর্বতমালার বুক হতে জলপ্রপাতের ধারে হঠাৎ তাদের নজর চলে যায় নূরীর উপরে।
প্রত্যেকের চোখে মুখে জাগে রাজ্যের বিস্ময়।
এ-ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নেয়। ভাবে ওরা এই সুউচ্চ পর্বতগাত্রে জঙ্গলে মানবকুমারী এলো কোথা হতে। পা পা করে দলটি এসে দাঁড়ালো নূরীর পাশে ভেলাখানার অদূরে। নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে দেখছে ওরা–একি আশ্চর্য ব্যাপার।
