কেশব আর নূরীর অন্তর শিউরে উঠলো।
ভয়ার্ত চোখে তাকালো ওরা বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর মশালটা কেশবের হাতে দিয়ে পাথরটার পাশে এসে দাঁড়ালো। ভীষণভাবে দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে ঠেলে ফেলে দেবার চেষ্টা করতে লাগলো। হঠাৎ নড়ে উঠলো পাথরটা, সঙ্গে। সঙ্গে কাৎ হয়ে পড়লো এক পাশে।
ভাগ্যিস কেশব আর নূরী সরে গিয়েছিলো সেখান থেকে। পাথরটা ঠিক ঐ জায়গায় এসে গড়িয়ে পড়লো যেখানে একটু পূর্বে কেশব আর নূরী দাঁড়িয়েছিলো।
পাথরটা সরে যেতেই একটা পথ বেরিয়ে এলো। একটা জমাট অন্ধকার গুহা। পাথরটা সরে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা ভ্যাপসা গ্যাসের মত গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো সমস্ত গুহাটার মধ্যে।
বনহুর, কেশব এবং নূরী একসঙ্গে নাকে হাত চাপা দিলো। মাথা কেমন যেন ঝিম ঝিম করতে লাগলো তাদের। কিছুক্ষণ লাগলো তাদের সামলে নিতে।
বনহুর বললো–বহুদিন ঐ গুহায় হাওয়া প্রবেশ না করায় এই গ্যাস সৃষ্টি হয়েছে।
অপেক্ষা করলো বনহুর কিছু সময়, তারপর নূরী এবং কেশবের বাধা বিপত্তি অগ্রাহ্য করে প্রবেশ করলো সেই বদ্ধ গুহায়।
বনহুরের হস্তে তখন মশাল রয়েছে।
সেই বদ্ধ গুহায় প্রবেশ করতেই বনহুর বিস্ময়ে স্তব্দ হয়ে পড়লো। এ গুহাটা সবচেয়ে বড় এবং প্রশস্ত। কিন্তু মেঝেতে নজর করতেই আড়ষ্ট হলো সে, অগণিত নর-কঙ্কাল গুহার মধ্যে বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে পড়ে আছে। যদিও নানারকম ময়লায় কঙ্কালগুলো ঢাকা পড়ার জোগাড় হয়েছে। তবু বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কঙ্কালগুলো মানুষের ছাড়া আর কিছুর নয়।
বনহুরের ললাটে গভীর চিন্তারেখা ফুটে উঠলো। এই বদ্ধ গুহায় এতোগুলো নরকঙ্কাল এক সঙ্গে কেন? তাছাড়াও কিছু সংখ্যক নরকঙ্কাল সম্মুখস্থ পাথরখন্ডটার তলায় চাপা পড়ে থাকতে। দেখলো সে। এবার বনহুর চারিদিকে লক্ষ্য করে বুঝতে পারলো যে, গুহার মধ্যে এখন বনহুর। বোঝা মুস্কিল।
গভীরভাবে বনহুর চিন্তা করতেই বুঝতে পারলো মারাঠা দস্যুগণ হয়তোবা এই গুহা মধ্যে বসে শলা-পরামর্শ করছিলো কিংবা দরবার বসেছিলো তাদের, হয়তো ঠিক সেই সময় সহসা। কোনো দৈব-দুর্বিপাকে পড়ে দস্যুদল সেখানেই অঘোরে প্রাণ হারায়।
কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বনহুর। বহুদিন পূর্বের একটি দস্যুদলের স্মৃতি ভেসে উঠে তার মানসপটে। সুউচ্চ আসনে উপবিষ্ট দলপতি, ভীমকায় বিরাটদেহী এক পুরুষ।
দুচোখে তার আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। সম্মুখে দন্ডায়মান অগণিত দস্যু। সবাই স্থির নয়নে তাকিয়ে আছে দলপতির দিকে। দলপতি গুরুগম্ভীর কণ্ঠে তার অনুচরদের প্রতি আদেশ দান করছে।
মনোযোগ সহকারে শুনছে অনুচরগণ। ঠিক সেই মুহূর্তে ভীষণ!
কোন দৈব বিপর্যয়ে একসাথে প্রাণ হারায় দদল। হায়রে জীবন! চিরদিনের সঞ্চিত রত্ন ভান্ডার ত্যাগ করে চলে যেতে হলো!
বনহুর আনমনা হয়ে পড়েছিলো, হঠাৎ নূরীর করুণ কণ্ঠস্বরে সম্বিৎ ফিরে আসে তার।
নূরী ডাকে–বনহুর, শিঘ এসো,জংলীরা এসে পড়বে। এসো, তোমার পায়ে পড়ি হুর, শিঘ্র এসো তুমি…
বনহুর আর বিলম্ব না করে ফিরে আসে দ্রুত নূরী আর কেশবের পাশে। আর এখানে দেরী করা মোটেই উচিত নয়।
বনহুর নূরী এবং কেশব ফিরে আসে রত্ন ভরা সিন্দুকগুলোর পাশে।
বনহুর বলে এবার–নূরী এসব তুমি নিতে চাও?
হাঁ নিতে চাই হুর। কিন্ত আমি অবাক হচ্ছি, তুমি আমাকে এ প্রশ্ন করলে কেন? তুমি কি এ সব চাও না?
হেসে বললো বনহুর– এ সব নিয়ে কি হবে নূরী? এ সবে কিইবা প্রয়োজন আমার?
এ তুমি কি বলছো হুর?
ঠিকই বলছি।
তবে এত করে কেন এলে এখানে? সাপুড়ে সর্দারের জীবনই বা গেলো কেন? আর…
বেশ চলো, কত নিতে চাও নাও।
কেশব বললো–সিন্দুকগুলোসহ নিয়ে যাওয়া যায় না কি?
যায়, কিন্তু নেবে কেমন করে? গহন জঙ্গলে যানবাহন তো আর নেই। তাছাড়া ওগুলো যৎসামান্য ভার নয়, প্রায় অনেক ওজন হবে।
নূরী তখন আঁচলে যা নিয়েছিলো সেগুলো আরও ভালভাবে পুটলী করে বাঁধতে থাকে।
কেশব তার জামাটা ভূতলে পেতে যতটুকু ধরে নিতে থাকে।
বনহুর তখনও গুহামধ্যে চারিদিকে তাকিয়ে দেখছিলো।
যতই দেখছে ততই যেন ওর দেখার বাসনা জাগছে। কত দিন আগের কতরকম স্মৃতি জড়িয়ে আছে এসব গুহার মধ্যে। বনহুর এবার গুহার পশ্চিমদিকে অগ্রসর হলো। অনেকটা এগিয়ে গেছে। বনহুর–এমন সময় একটা শব্দ ভেসে এলো তার কানে। কান পেতে স্থির হয়ে দাঁড়ালো বনহুর। অল্পক্ষণ শোনার পর বুঝতে পারলো, নিকটেই কোথাও জলপ্রপাতের শব্দ এটা। বনহুর আরও দ্রুত এগুতে লাগলো।
ওদিকে একেবারে গুহার শেষ প্রান্তে গিয়ে বনহুর চমকে দাঁড়ালো। স্পষ্ট দেখলো–একটা সুড়ঙ্গমুখ রয়েছে সেখানে এবং সেই মুখে লৌহকপাট আটকানো আছে।
বনহুরের মুখ খুশিতে দীপ্ত হলো, এদিকে যে এমন একটা গোপন পথ আছে, কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। বনহুর দৃঢ় হস্তে জিরজিরে লৌহকপাটে ঝাঁকুনি দিলো। লৌহকপাট হলেও অনেক দিনের অব্যবহারে মরচে ধরে একেবারে অকেজো হয়ে পড়েছিলো। বনহুরের দৃঢ়হস্তের ঝাঁকুনিতে খসে পড়লো ভূতলে।
সঙ্গে সঙ্গে একটা সচ্ছ শীতল হাওয়া বনহুরকে আলিঙ্গন জানালো। বনহুর কিছুটা এগিয়ে গিয়ে তাকাতেই দেখলো–ঠিক তাদের গুহার এই গোপন সুড়ঙ্গমুখের অতি নিকটেই বেয়ে চলেছে একটি জলপ্রপাত। ঠিক পাহাড়িয়া নদী বলা চলে। ভালভাবে লক্ষ্য করতে বনহুর দেখলো– সুড়ঙ্গমুখের সঙ্গে সিঁড়ির ধাপের মত কতকগুলো ধাপ চলে গেছে নিচের দিকে ঠিক জলপ্রপাতের নিকটে।
