কেশব আর নূরীও হাতে তুলে নিলো, অবাক হয়ে দেখতে লাগলো মোহরে কোনোরকম সন তারিখ নেই, শুধু ভয়ঙ্কর জীবজন্তু আর অদ্ভুত সব মূর্তি আঁকা রয়েছে। বনহুর গুহার মধ্যে ঘুরে ফিরে দেখতে লাগলো। এক একটা কামরার মত ছোট-বড় অনেক গুহা রয়েছে। পর্বতমালার মধ্যে যে এমন ফাঁকা আর অনেকগুলো গুহা পাশাপাশি থাকতে পারে বিস্ময়কর ব্যাপার।
বনহুর তার নিজের আস্তানা তৈরি করেছে কৌশলে নানা পদ্ধতিতে অত্যদিক বিস্ময়করভাবে কিন্তু এ গুহা যে তার চেয়েও বিস্ময়কর। পাথর কেটে কেটে তৈরি করা হয়েছে, দুর্গম সুড়ঙ্গ পথ আর বিভিন্ন ধরনের গুহা। হঠাৎ গুহার মধ্যে প্রবেশ করতেই বনহুর চমকে উঠলো। এ গুহাটা জমাট অন্ধকার এবং অত্যন্ত জঙ্গলাকীর্ণ। মাকড়সার জাল আর নানারকম পোকামাকড়ের ভীড়। মানুষের সাড়া পেয়ে বড় বড় মাকড়সাগুলো জাল বেয়ে এদিক ওদিক ছুটে পালাতে লাগলো।
বনহুরের হস্তে তখনও মশাল ছিলো। মশালের আলোতে সে দেখতে পেলো এক একটা মাকড়সার চোখ যেন মশালের আলোতে জ্বলছে। কেমন যেন কটমট করে তাকাচ্ছে ওরা। অন্ধকার গুহার প্রেত আত্মার মতই লাগলো।
বনহুর মশাল উঁচু করে এগুতেই মাকড়সা এবং অন্যান্য জীবজন্তুগুলো সরে যেতে লাগলো। বনহুর মশালের আলোতে এবার গুহাটার মেঝেতে নজর ফেললো। চমকে উঠলো বনহুর অসংখ্য লৌহ-অস্ত্র স্তূপাকার হয়ে পড়ে আছে। যদিও সেগুলো মরচে ধরা এবং অযত্নে বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে আছে তবু বেশ বোঝা যাচ্ছে সেগুলো বহু পুরোনকালের অস্ত্রশস্ত্র। বনহুর অবাক হয়ে এসব অস্ত্র দেখতে লাগলো। যতই দেখছে ততই যেন দু’চোখে রাজ্যের বিস্ময় জাগছে। আরও কিছুটা এগুলো সে মশাল উঁচু করে দেখতে লাগলো সে। বুঝতে পারলো বনহুর–এই গুহাটি সম্পূর্ণ কোনো দস্যুর আস্তানা ছিলো। মারাঠা জলদস্যুদের আস্তানা হবে। বনহুর স্তূপাকার অস্ত্রগুলোর পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। মরচে ধরা অস্ত্রগুলো হাতে তুলে নিয়ে দেখতে লাগলো অবাক হয়ে।
এমন সময় নূরী কোঁচড়ে এক গাদা মনি মুক্তা আর হীরক নিয়ে বনহুরের পাশে এসে দাঁড়ালো কেশবও এসে পড়লো নূরীর সঙ্গে।
নূরী বললো– বনহুর কি দেখছো? এগুলো কি?
বনহুর অস্ত্রগুলো নেড়ে-চেড়ে দেখতে দেখতে বললো–এগুলো অস্ত্র।
অস্ত্র!
হ নূরী বহু বছর আগের অস্ত্র এগুলো। দেখছো না মরচে ধরে কেমন জিরজিরে হয়ে গেছে।
কেশব ততক্ষণে মরচে ধরা জরাজীর্ণ অস্ত্রগুলো হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখছে। বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো সে–এগুলো কি ধরনের অস্ত্র বোঝা যাচ্ছে না কিন্তু?
বনহুর বললো–বহুদিন পূর্বে এ ধরনের অস্ত্রই ব্যবহৃত হতো। কোনো মারাঠা জলদস্যুর আস্তানা ছিলো এ গুহা। এসব অস্ত্র এবং ধনরত্ন সবই সেই দস্যুদের।
বললো কেশব–তাহলে জংলীরা এখানে কি করে সন্ধান পেলো?
বহুকাল আগের এ গুহা দস্যুদের অস্তিত্ব মুছে যাবার পর জংলীদের কবলে এসে গেছে বলে মনে হচ্ছে। উঠে দাঁড়ালো বনহুর আরও ভিতরের দিকে এগুতে লাগালো সে। নূরী হাত চেপে ধরলো বনহুরের না না, যেও না ওদিকে।
বনহুর বললো–সব কিছু আমি দেখতে চাই নূরী।
আমার গা কিন্তু কাঁটা দিয়ে উঠছে।
কেশবের মুখে কোনো কথা নেই।
বনহুর হেসে বললো–মৃত্যুগহ্বরে এসে মৃত্যুকে ভয় করলে চলবে কি করে? এসো আমার সঙ্গে।
বনহুর নূরী আর কেশবসহ অগ্রসর হলো। দক্ষিণ হস্তে তার জ্বলন্ত মশাল রয়েছে।
মানুষের সাড়াশব্দ পেয়ে নানারকম জীব এদিক-সেদিক ছুটে পালাতে লাগলো। মাকড়সা, বাদুড়, বিছা অগণিত রয়েছে। কিছুটা এগুতেই একটা সাপ ফোঁস করে উঠলো।
নূরী আর্তনাদ করে বনহুরকে আঁকড়ে ধরলো।
বনহুর মশাল উঁচু করে বাড়িয়ে ধরতেই সাপটা সরে গেলো ওদিকে।
মাকড়সাগুলোর চোখ দেখে নূরী ভীত হলো, বললো–ওগুলো কামড়ে দেবে হুর।
কেশব বললো–বাবু আর না যাওয়াই ভাল। এ সব গুহায় মানুষ আসে না।
নূরী বললো–হুঁর জংলিগণ তাহলে এসব দিকে আসে না বুঝি?
হাঁ, ওরা এসব গুহায় আসে না বা দেখেনি বলেই মনে হয়। জংলিগণ সম্মুখে যা দেখেছে বা পেয়েছে তাই নিয়েই খুশি হয়েছে। এসব দেখার মত সখ তাদের নেই।
কি হবে এসব দেখে বলো তো? আমার কিন্তু বড্ড ভয় করছে। কথাগুলো বলে নূরী বনহুরের জামার আস্তিন চেপে ধরে এগুতে লাগলো।
ওদিকে কিছুটা অগ্রসর হতেই বনহুর থমকে দাঁড়ালো। সম্মুখে একটা বিরাট পাথর পথ রোধ করে পড়ে আছে। হঠাৎ বনহুরের দৃষ্টি চলে গেলো পাথরটার নিচে। বিস্ময়ের পর বিস্ময় জাগলো, দেখলো পাথরের নিচে চাপা পড়ে আছে কতকগুলো কঙ্কাল। কারো বা মাথা ভিতরে শুধু অর্ধেকটা বাইরে, আর কোনটার সম্মুখভাগ বাইরে–পিছন দিকটা ভিতরে।
বনহুর অবাক চোখে দেখছে। ভাবছে, ব্যাপার কি এমন কেন! হাঁটু গেড়ে বসে একটা কঙ্কালে হাত দিলো বনহুর। সঙ্গে সঙ্গে কঙ্কালের হাড়গুলো ঝরে গুড়ো হয়ে খসে পড়লো।
উঠে দাঁড়ালো বনহুর বললো –নূরী, ওপাশে আমাকে যেতে হবে।
ওপাশে? অবাক কণ্ঠে প্রশ্ন করলো বনহুর।
হাঁ এই পাথরের চাপটার ওপাশে আমি যেতে চাই।
সর্বনাশ, ওপাশে কি করে যাবে তুমি?
যাওয়াটা অত্যন্ত অসম্ভব নূরী, কিন্তু আমাকে যেতেই হবে। আমি দেখতে চাই ওপাশে কি আছে।
আচ্ছা লোক তুমি হুর, দেখছো মানুষের কঙ্কাল চাপা পড়ে আছে? নিশ্চয়ই ওপাশে ভয়ঙ্কর কোনো বিপদ ওৎ পেতে আছে।
বিপদ– হাঃ হাঃ হাঃ অট্টহাসি হেসে উঠলো বনহুর। সে ভয়ঙ্কর হাসির শব্দে অন্ধকার গুহা থর থর করে যেন কেঁপে উঠলো।
