এখানে সুড়ঙ্গ বেশ কিছুটা প্রশস্ত কিন্তু এদিকে ওদিকে তেমনি জমাট অন্ধকার। মশালের আলোরছটা আসছে বেশ কিছুটা দূর হতে।
বনহুর নূরী আর কেশব আলোর ছটা লক্ষ্য করে সেদিকে এগুতে লাগলো। বিরাট গুহা, যেন একটা প্রাসাদ। পর-পর কয়েকটা সুড়ঙ্গমুখ রয়েছে প্রত্যেকটা সুড়ঙ্গমুখে এককালে লৌহ কপাট ছিলো বলে মনে হচ্ছে–এখন অবশ্য লৌহ কপাটের কিছু কিছু ভগ্ন অংশ দেখা যাচ্ছে।
বনহুর যত এগুচ্ছে ততই তার বিস্ময় বাড়ছে।
এখন তারা আলো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। গুহার ঠিক মাঝখানে নজর পড়তেই নূরী দু’হাতে চোখ ঢেকে আর্তচিৎকার করে উঠলো।
বনহুর আর কেশব দেখলো–সুড়ঙ্গ মধ্যে ঠিক মাঝখানের প্রশস্ত একটি জায়গায় কয়েকটা মস্তকহীন মৃতদেহে ঝুলছে। পা উপরের দিকে মাথাটা ঠিক নিচের দিকে ঝোলানো। প্রত্যেকটা মৃতদেহের নিচে এক একটি মাটির গামলা দেওয়া রয়েছে। কিন্তু গামলায় রক্ত নেই সামান্য কিছু রক্ত তখন গামলাগুলোর তলায় জমাট বেঁধে আছে।
বনহুর ফিরে তাকালো নূরীর দিকে নৃরী ঢলে পড়ে যাচ্ছিলো, ধরে ফেললো বনহুর।
কেশব ভয়ার্তস্বরে বললো–বাবু এ যে দেখছি–কথা শেষ না করে কাঁপতে থাকে কেশব ঠক ঠক করে।
বনহুরের হাতের উপর নূরীর সংজ্ঞাহীন দেহটা এলিয়ে পড়েছে। বনহুর বললো–হ কেশব তোমার অনুমান ঠিক এই যে মৃতদেহগুলো দেখছো এগুলো রংলালের দলের। ঐ দেখো মাঝখানের মস্তকহীন দেহটা রংলালের বলে মনে হচ্ছে।
কেশব ভীত নজরে তাকিয়ে বললো–হাঁ বাবু, ঐ তো রংলালের দেহ। বাবু জংলীরা ওদের। অমনভাবে কেটে ফেলেছে কেন?
জংলীরা ওদের মস্তক কেটে রক্ত পান করেছে। ঐ দেখছে না প্রত্যেকটা মৃতদেহের নিচে মাটির গামলা দেওয়া রয়েছে।
দেয়ালে কতকগুলো মশাল পোতা রয়েছে তারই আলোতে সব স্পষ্ট দেখাচ্ছিলো।
বললো বনহুর–কেশব, জংলিগণ আজ এখানে নর-রক্ত পান করে উৎসব পালন করেছে।
পর-পর কাষ্ঠখন্ডে মৃতদেহগুলো ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। প্রত্যেকটা দেহের অদূরে তাদের ছিন্ন মস্তক পড়ে আছে। সেকি বীভৎস দৃশ্য! কেশব কিছুতেই এ দৃশ্য সহ্য করতে পারছিলো না, সে দু হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়লো। নূরীর অবস্থা আরও সঙ্কটময়, সংজ্ঞাহীন নূরীর দেহটা এখনও বনহুরের বাহুর মধ্যে আবদ্ধ।
বনহুর স্থিরভাবে তাকিয়ে দেখছে জংলীদের নৃশংস হত্যার শেষ পরিণতি। রংলালের দলে ছিলো কয়েকজন তার মধ্যে একজন ব্যাঘ্ৰ কবলে প্রাণ দিয়েছে। আর বাকীগুলোর শেষ পরিণতি জংলীদের হাতে হয়েছে। কঠিন প্রাণ বনহুরের–তবু সে কেমন যেন বিব্রত হয়ে পড়লো।
বনহুর নূরীকে নিয়ে সরে গেলো সেখান থেকে।
কেশব অগত্যা বনহুরকে অনুসরণ করলো। কিছুটা এগুতেই দেখলো ওদিকে একটা উঁচু ঠিক আসনের মত জায়গা। বনহুর নূরীকে শুইয়ে ওর মাথাটা তুলে নিলো কোলে, বার বার ডাকতে লাগলো–নূরী, নূরী, নূরী–
অল্পক্ষণ পর নূরী চোখ মেলে তাকালো।
বনহুর বললো–নূরী, শক্ত হতে হবে। এতো সহজে, এতো সামান্যে সংজ্ঞা হারালে চলবে কি করে? উঠো নূরী, তুমি না দস্যু বনহুরের সঙ্গিনী।
নূরী চারিদিকে ভয়ার্ত নজরে তাকিয়ে দেখতে লাগলো পরে কম্পিত কণ্ঠে বললো– মৃতদেহগুলো কার বনহুর?
সে পরে শুনো এখন উঠো দেখি। বনহুর নূরীকে উঁচু করে তুলে ধরলো এবং নূরীসহ দাঁড়াতে চেষ্টা করলো।
বনহুরকে ধরে উঠে দাঁড়ালো নূরী। কিছুক্ষণে সুস্থ হয়ে উঠলো সে।
নূরীকে এবার মৃতদেহের দিকে না নিয়ে অন্যদিকে এগুলো বনহুর। হঠাৎ তার নজর চলে গেলো অদূরে–দেখলো কতকগুলো লৌহ সিন্দুক স্তরে স্তরে সাজানো। সিন্দুকগুলোর প্রত্যেকটার গায়ে শিকল আটকানো রয়েছে।
বনহুর কেশব আর নূরী দ্রুত অগ্রসর হলো।
বনহুর একটা মশাল তুলে নিলো হাতে। মশালগুলো জ্বলে জ্বলে প্রায় নিভু নিভু হয়ে এসেছিলো। জংলিগণ চলে যাবার সময় কতকগুলো মশাল রেখেই গিয়েছিলো।
মশাল হস্তে বনহুর লৌহ সিন্দুকের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। বনহুরের চোখ দুটো যেন দীপ্ত হয়ে উঠেছে।
লৌহ সিন্দুকের ডালা খুলে ফেললো বনহুর। অমনি মশালের আলোতে সিন্দুকের মধ্যস্থ বস্তুগুলো থেকে উজ্জ্বল দ্যুতি ঠিকরে পড়তে লাগলো। চোখ ঝলসানো নীলাভ আলোকরশ্মির মত ছটা।
নূরী আর কেশব ভুলে গেলো বীভৎস মৃতদেহগুলোর কথা। মন থেকে ভয় যেন মুছে গেলো মুহূর্তে। নূরী দু’হাতে যতটুকু আঁচল ভরে তুলে নিয়ে উচ্ছল কণ্ঠে বললো–হুঁর, এ যে মনি-মুক্তা আর হীরে। মনি-মুক্ত-হীরে আঁচল ভরে নিতে লাগলো নূরী।
হেসে বললো বনহুর–সবই এখন তোমার। কত নেবে নূরী নাও।
বনহুর দ্বিতীয় সিন্দুকটা খুলে ফেললো এবার।
নূরী আর কেশবের চোখে বিস্ময়ের পর বিস্ময় জাগলো। বনহুরের আস্তানায় বহু ধন-রত্ন মনি মুক্তার অলঙ্কার আছে কিন্তু এতো তো নেই। লুট করে যা নিয়ে আসে বনহুর তা তো জমিয়ে রাখে না সে বিলিয়ে দেয় দীনহীন গরিবদের মধ্যে। আজ একসঙ্গে এতোগুলো মনি-মুক্তা আর হীরক অলঙ্কার দেখে বনহুরের চোখেও বিস্ময় জাগে।
কেশব তো হতভম্ব হয়ে গেছে।
বনহুর পর-পর কয়েকটা সিন্দুক খুলে দেখে নিলো। সবগুলো মনি-মুক্তা আর হীরে-সোনা দানায় পরিপূর্ণ। সর্বশেষ দুটো সিন্দুক খুলে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে হতবাক হলো বনহুর। অবাক হয়ে দেখলো–এ দুটো সিন্দুকে শুধু রয়েছে স্বর্ণ মোহর। অদ্ভুত ধরনের এ মোহরগুলো।
বনহুর একটা মোহর তুলে নিয়ে এপিঠ-ওপিঠ উল্টে দেখে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো–শত শত বছর পূর্বের এ মোহর।
