বনহুর কোনোরকম চিৎকার করবার পূর্বেই নূরী আর্তনাদ করে উঠলো–উঃ মা গো সর্বনাশ, হুর–সাপ–হুঁর–।
কেশব কি করবে, সেও আর্তনাদ করে শুরু করলো–হ্যায় এবার কি হবে কি হবে–বাঁচাও কে কোথায় আছো। কেশব নিচে লাফালাফি করতে লাগলো।
বনহুর এক হস্তে ফাটলের মধ্যের একটা শক্ত করে শিকড় ধরে অন্য হস্তে সাপটার কবল থেকে নিজকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো। রিভলভার অবশ্য তার পকেটেই আছে কিন্তু বের করার সুযোগ পাচ্ছে না।
পাথরটার উপরে সর্পরাজের সঙ্গে চললো ভীষণ লড়াই।
নূরী আর কেশব নিচে আর্ত-চিৎকার করে চললো।
নূরী যখন দু’হাতে চোখ ঢেকে আকুলভাবে কাঁদছে তখন হঠাৎ পর-পর দুটো শব্দ হলো, রিভলভারের আওয়াজ গুড় ম গুড় ম্। তারপরই উপর থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরে পড়তে লাগলো।
কেশব আর নূরী উপরের দিকে ভয়ার্ত নয়নে তাকালো। দেখলো –বনহুর বামহস্তে একটা শিকড় ধরে দক্ষিণ হস্তে সাপটাকে তার নিজের দেহ থেকে ছাড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করছে।
নূরী মনে মনে খোদার নাম স্মরণ করতে লাগলো।
অল্পক্ষণেই সাপটা কুন্ডলী পাকিয়ে থপ করে নিচে এসে পড়লো। সেকি বিরাট বিপুলদেহী অজগর সাপ। মাটিতে পড়ে উল্টে পালোট করতে লাগলো। রক্তে ভিজে উঠলো পাথরখন্ডের গা গুলো। ঠিক সাপটার বুকের কাছে রিভলভারের পর-পর দুটি গুলী বিদ্ধ হয়েছিলো।
গুলী করার পরই বনহুর রিভলভার পকেটে রেখেছিলো এবং সাপটাকে দক্ষিণ হস্তে শরীর থেকে মুক্ত করে নিচে ফেলে দিয়েছিলো। এতক্ষণে নূরী প্রাণভরে নিশ্বাস নিলো। পা দিয়ে সাপটাকে লাথি দিতে লাগলো সে ক্রুদ্ধ হয়ে।
ঠিক সেই মুহূর্তে বনহুরের আনন্দভরা কণ্ঠ শোনা গেলো পেয়েছি নূরী, পেয়েছি–
বনহুর পাথরের উপরিভাগে উঠে পড়েছিলো সে, ওদিকে নজর করতে দেখতে পেলো– পাথরটার অপর পাশে বড় আকারের একটা চাকার সংযোগ রয়েছে।
বনহুর পাথরটার উপরিভাগে উঠে পড়েছিলো সে ওদিকে নজর করতেই আশায়-আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে ‘পেয়েছি পেয়েছি’ বলে চিৎকার করে উঠেছিলো। বনহুর পাথরটার ফাঁক দিয়ে ওদিকে নজর করতেই দেখতে পেয়েছিলো-ওপাশে পাথরটার নিচের দিকে মস্ত বড় আকারের তিনটা পাথরের তৈরি চাকা। এবার বনহুর যেভাবে উপরে উঠে গিয়েছিলো, সেইভাবে দ্রুত নেমে এলো নীচে।
বনহুর বললো–কেশব, এবার এ পাথরখানা সরিয়ে ফেলার কৌশল জানতে পেরেছি। বনহুর কথা শেষ করে পাথরখানার পূর্ব ধারে গিয়ে ভীষণ জোরে ধাক্কা দিতে লাগলো। না, একটুও নড়লো না পাথরটা। বনহুরের সুন্দর মুখমন্ডল রাঙা হয়ে উঠলো। দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে বার বার ধাক্কা দিচ্ছে সে। কেশবও সাহায্য করতে লাগলো তার দেহের সমস্ত বল দিয়ে কিন্তু একচুল নড়লো না পাথরখানা।
বনহুর এবার গভীরভাবে কি যেন চিন্তা করতে লাগলো। যা হোক, বেশিক্ষণ বিলম্ব করাও সমাচীন নয়। হঠাৎ যদি জংলিগণ এসেই পড়ে তাহলে আর নিস্তার নেই। মরতেই হবে তখন।
বনহুর একটা পাথরখন্ডে বসে ভাবতে লাগলো।
নূরী এসে বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো। কেশবের উপস্থিতিতে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলো নূরী। নিজের ওড়নার আঁচলে বনহুরের মুখের এবং গন্ডের ঘাম মুছে দিতে লাগলো।
একটু বিশ্রাম করে নিয়ে বনহুর উঠে পড়লো, পাথরটার চারিদিকে নিপুণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। দেখতে লাগলো সে। হঠাৎ বনহুরের চোখেমুখে খুশি উপচে পড়লো, এবার বনহুর বুঝতে পেরেছে কি ভাবে এ পাথরটা সরানো যাবে। পাথরটার ঠিক পশ্চিম পাশে দাঁড়িয়ে চাপ দিতেই ধীরে ধীরে সেটা একপাশে সরে যেতে লাগলো।
পাথরখন্ডটা সরে যেতেই পর্বতমালার মধ্যে বেরিয়ে এলো একটা সুদীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ। বনহুর অস্ফুট আনন্দধ্বনি করে উঠলো-হুঁররে, পেয়েছি পেয়েছি, সাপুড়ে সর্দারের সেই ভান্ডারের গুহা বনহুরের সুন্দর মুখমন্ডলে খুশি যেন উপচে পড়ছে। ওষ্ঠদ্বয় হাসিতে স্ফীত হয়ে উঠেছে। দু’চোখে করে পড়ছে একটা অদ্ভুত দ্যুতি।
বনহুর নূরী এবং কেশবসহ সুড়ঙ্গপথে অগ্রসর হলো।
সুড়ঙ্গপথে চলতে গিয়ে তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছিলো না। তবে অন্ধকারটা ক্রমেই গাঢ় হয়ে আসছে। বনহুরের হাতের মুঠোয় নূরীর হাত।
কেশব পিছনে তাকে অনুসরণ করছে।
সুড়ঙ্গমুখ ছেড়ে যতই ওরা ভিতরে প্রবেশ করছিলো ততই পৃথিবীর আলো নিভে আসছিলো। সুড়ঙ্গমুখ দিয়ে যতটুকু আলো আসছিলো এটুকু আলোই ছিল তাদের সম্বল। জংলিগণ মশাল হস্তে সুড়ঙ্গ মধ্যে প্রবেশ করে–তাই তাদের পৃথিবীর আলোর কোনো প্রয়োজন হয় না।
সুড়ঙ্গপথটা কিছুদূর অগ্রসর হয়েই বাঁদিকে মোড় ফিরেছে। বনহুর, নূরী এবং কেশব বামদিকে সুড়ঙ্গপথ ধরে কিছুটা এগুতেই আলোর ছটা তাদের চোখ বাঁধিয়ে দিলো। বনহুর বললো– মশালের আলো।
কেশব আর নূরী আঁতকে উঠলো, ভীত কণ্ঠে বললো–জংলীদের লোক এখনও আছে। এখানে?
দেখা যাক। বনহুর রিভলভার বের করে গুলী ভরে নিলো। বনহুরের চোরা পকেটে এখনও বেশ কয়েকটা গুলী মজুত আছে। সে আসবার সময় কিছু গুলী তার চোরা পকেটে লুকিয়ে নিয়েছিলো।
বনহুর সন্তর্পণে সম্মুখে এগুতে লাগলো।
তার পিছনে নূরী এবং কেশব।
বনহুরের হস্তে গুলী ভরা রিভলভার, কেশবের হস্তে সূতীক্ষ্ণ ধার ছোরা। নূরীও তার খোঁপার ভিতর দেহরক্ষী ছোরাখানা বের করে নিলো।
চারিদিকে তীক্ষ্ণ নজর নিক্ষেপ করে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলো বনহুর। কেশব আর নূরী তাকে অনুসরণ করছে।
