জংলিগণ সবাই বেরিয়ে এলো, ঢাক বাজিয়ে যারা চলেছে তারা এখন সকলের পিছন সারিতে। কিন্তু অবাক হলো বনহুর-রংলালের দল এখন তাদের মধ্যে নেই।
বনহুর সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলো কিন্তু জংলিগণ তাকে দেখতে পাচ্ছিলো না। যদিও জংলীদের অবস্থান হতে সে বেশি দূরে ছিলো না।
জংলিগণ আনন্দে আত্মহারা।
সবাই ঢাক বাজিয়ে এবার ফিরে চললো।
যেমন সারিবদ্ধভাবে সবাই এসেছিলো তেমনি এখনও মিছিল হয়ে চললো। কোনোদিকে নজর ছিলো না ওদের। অবশ্য ওরা জানে এস্থানে তাদের জংলিগণ ছাড়া আর কারো গমন সাধ্য নেই।
জংলিগণ যখন পাথরখন্ডটার একেবারে পাশ কেটে চলে যাচ্ছিলো তখন বনহুর নিজকে গোপন করে রেখেছিলো পাথরের তলায় গর্তের মধ্যে যেখানে নূরী আর কেশব ছিলো। নূরী আর কেশবের অবস্থা মৃতপ্রায়– হঠাৎ যদি জংলীদের দৃষ্টি কোনক্রমে এদিকে আসে তাহলে আর উদ্ধার নেই।
বনহুরের হস্তে রিভলবার ও কেশবের হস্তে সূতীক্ষ্ণ-ধার ছোরা যদিও ছিলো তাহলেও অসংখ্য জংলীদের সঙ্গে পেরে ওঠা তাদের সাধ্য নয়। নৃশংস জংলী দলের হস্তে তীক্ষ্ণ-ধার বল্লাম-বর্শা ও আরও অনেক রকম লৌহ এবং পাথরের অস্ত্র রয়েছে।
রুদ্ধ নিশ্বাসে বনহুর কেশব আর নূরী দেখছে। তাদের চোখের সম্মুখ দিয়ে মোটা থামের মত কতকগুলো পা চলে গেলো সারিবদ্ধভাবে।
ঢাকের আওয়াজ এবং মশালের আলো স্তিমিত হয়ে আসছে ক্রমান্বয়ে।
হাফ ছেড়ে বাঁচালো বনহুর, কেশব আর নূরী।
জংলীদের চলার ধরন অত্যন্ত দ্রুত; কাজেই অল্পক্ষণে জংলীর দল বহুদূরে চলে গেলো।
পাথরের ওপাশের গর্তের মধ্য থেকে বেরিয়ে এলো ওরা। পূর্বদিকে তখন ফর্সা হয়ে এসেছে। প্রভাতের স্নিগ্ধ হাওয়া গহন জঙ্গলের জমাট অন্ধকার ভেদ করে একটা শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দিয়ে গেলো তাদের সমস্ত দেহে।
পাখির কলরবে মুখর হয়ে উঠলো বনভূমি।
বনহুর বৃক্ষ-লতা-পাতার ফাঁকে তাকালো আকাশের দিকে। ভোরের আলোতে তার মুখমন্ডলকে দীপ্ত উজ্জ্বল মনে হলো। বনহুর হয়তো দয়াময়ের নিকট লাখ লাখ শুকরিয়া করে নিলো।
নূরীর হাত ধরে বললো বনহুর–এসো তোমরা।
কেশবও অনুসরণ করলো বনহুর আর নূরীকে।
যে ফাটলের মধ্যে থেকে জংলিগণ সারিবদ্ধভাবে বেরিয়ে এসেছিলো সেইদিকে অগ্রসর হলো তারা। বেশিদূর নয়–তাদের অনতি দূরেই সে ফাটলটা।
প্রথম বনহুর নূরী আর কেশবকে নিয়ে এই ফাটলের মধ্যেই লুকিয়েছিলো। সে কল্পনাও করতে পারেনি–এটা পর্বত মধ্যে প্রবেশের একটি সুড়ঙ্গমুখ।
বনহুর নূরী এবং কেশবসহ ফাটলমুখে এসে দাঁড়ালো। ঘন লতা-পাতা আর ছোট ছোট জঙ্গলের ফাঁকে মসৃণ একটা পথ নজরে পড়লো।
প্রভাতের আলো এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বৃক্ষাদির ফাঁকে সূর্যের আলো প্রবেশ করছে। একটু একটু করে। পাখিরা নীড় ছেড়ে ডানা মেলে আকাশে উড়ছে।
বনহুর ফাটলটার দক্ষিণ-পূর্ব পার্শ্বে তাকালো সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ ধ্বনি করে উঠলো–পেয়েছি পেয়েছি সাপুড়ে সর্দারের সেই গুপ্তরত্ন ভান্ডারের সন্ধান পেয়েছি।
কেশব আর নূরী অবাক হয়ে তাকালো।
বনহুর বললো–সাপুড়ে সর্দার বলেছিলো যেখানে পাশাপাশি পর্বতের তিনটি শৃঙ্গ–দু’পাশে দুটি ছোট ছোট শৃঙ্গ আর মাঝখানের শৃঙ্গটা আকারে বড় এবং ঠিক গরিলার মস্তকের মত দেখতে। সেটাই রত্নভাণ্ডার গুহার প্রবেশমুখ।
একসঙ্গে কেশব আর নূরী তাকালো সম্মুখস্থ পর্বতমালার দিকে। সত্যিই দু’পাশে দুটো আকারে ছোট শৃঙ্গ আর মাঝখানের শৃঙ্গটা প্রায় আকাশ চুম্বন করছে কিন্তু শৃঙ্গটার উপরিভাগ ঠিক একটি গরিলার মাথার মত।
বনহুর অগ্রসর হলো ফাটলটার দিকে।
জমকালো পাথরের গায়ে শেওলা জাতীয় পদার্থ জমে জমে মাটির স্তর তৈরি হয়েছে, তারই গায়ে নানা জাতীয় বৃক্ষ-লতা-গুল্ম সৃষ্টি করেছে ঝোপজাড় আর জংগল।
ফাটলটার মধ্যে প্রবেশ করলো ওরা তিনজন। কিন্তু বেশিদূর অগ্রসর হতে পারলো না। কিছুদূর এগুতেই দেখলো পাথরের বিরাট একটা চাপ দ্বারা ফাটলের মধ্যকার সুড়ঙ্গমুখ বন্ধ।
বনহুর থমকে দাঁড়ালো।
কেশব আর নূরীও দাঁড়িয়ে পড়তে বাধ্য হলো।
বনহুরের ললাটে দেখা দিলো চিন্তার ছাপ।
কেশব বললো–বাবু, এখন কি করে ভিতরে যাবেন?
জংলীদল যখন এই পথে বেরিয়ে এসেছে তখন নিশ্চয়ই ওপাশে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। তোমরা অপেক্ষা করো, আমি চেষ্টা করে দেখি।
নূরী ভীত কণ্ঠে বললো-জংলিগণ যদি হঠাৎ আবার এসে পড়ে?
বললো বনহুর–না এখন ওরা আর ফিরে আসবে না। বনহুর কৌশলে ফাটলের মুখের পাথর। বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো।
খাড়া পিচ্ছিল পাথর বেয়ে উঠা কম কথা নয়। বনহুর অত্যন্ত চেষ্টা করে উঠছিলো। ফাটলের আশে পাশে যে সব আগাছা বা লতা-গুল্ম ছিলো তারই শিকড় আঁকড়ে ধরে কোনোরকমে এগুচ্ছিলো।
নূরী আর কেশব বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলো। কি অদ্ভুত কৌশলে বনহুর এগুচ্ছে উপরের দিকে। নূরী জীবনে বনহুরকে বহু অসাধ্য সাধন করতে দেখেছে। আজ যেন সে আরও বেশি আবাক হচ্ছে। নূরী যেমন বিস্মিত হচ্ছিলো তেমনি ভীতও হচ্ছিলো, হঠাৎ যদি পড়ে যায় তাহলে কি উপায় হবে! ফাটলের মুখে পাথরখানা অনেক উঁচু এবং খাড়া। নিচে কঠিন পাথর সমতল নয়, পাথরখন্ডগুলো লাল আকারের ছোট-বড় অনেক রকম।
অতো উঁচু থেকে পড়ে গেলে মৃত্যু সুনিশ্চয় তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
নূরী বনহুরকে নেমে আসার জন্য বার বার অনুরোধ করতে লাগলো। বনহুর কিন্তু তার কথা কানে না নিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। অত্যন্ত পরিশ্রমে নানা উপায়ে কিছুক্ষণেই অনেক উপরে উঠে গেছে বনহুর। সমস্ত দেহ তার ঘামে ভিজে চুপসে উঠেছে। হঠাৎ ফাটলের মধ্যে দেয়ালের গায়ে বিরাট এক অজগর বেরিয়ে এলো। জড়িয়ে ধরলো বনহুরের দেহটাকে অক্টোপাশের মত।
