বনহুর মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখছে। যদিও গাঢ় জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে তারা চলেছে তবু বৃক্ষ-লতাপাতার ফাঁকে আকাশের কিঞ্চিৎ অংশ দেখা যাচ্ছিলো।
রাত প্রায় শেষ হয়ে এলো। ভোরের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। রাত যদি শেষ হয়ে যায়। তাহলে আত্মগোপন করা মুস্কিল হবে। বনহুর একটু চিন্তিত হলো।
আরও জোরে পা চালিয়ে অগ্রসর হলো তারা।
কিছুটা এগুতেই পুনরায় ঢাকের আওয়াজের ক্ষীণ শব্দ কর্ণগোচর হলো বনহুর, কেশব আর নূরীর।
শিউরে উঠলো নূরী–হুর, জংলিগণ বোধ হয় ফিরে আসছে।
বনহুর আর কেশব কান পেতে শুনতে লাগলো।
কেশব বললো-হাঁ, আমারও ঐ রকম মনে হচ্ছে।
বনহুর বললো–না ওরা ফিরে আসছে না। বোধ হয় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ঢাক বাজাচ্ছে। যাক তবু নিশ্চিন্ত হলাম, এবার আমরা অল্প সময়ে জংলীদের অনতিদূরে পৌঁছতে সক্ষম হবো।
বেশ কিছুক্ষণ চলার পর ঢাকের আওয়াজ আরও স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হয়ে কানে বাজতে লাগলো।
কেশব আর নূরীর মুখ ভয়ে বিবর্ণ হলেও বনহুরের মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হলো।
বেশ কিছুদূর অগ্রসর হবার পর ঢাকের আওয়াজ একেবারে স্পষ্ট শোনা যেতে লাগলো। কিন্তু মশালের আলো দৃষ্টিগোচর হলো না। বনহুর বললো নূরী, জংলিগণ কোনো গোপন জায়গায় স্থির হয়ে ঢাক বাজিয়ে চলেছে। দেখছো না ঢাকের আওয়াজ একভাবে বেজে চলেছে।
তাইতো ওরা অগ্রসর হচ্ছে না বা ফিরেও আসছে না, তা হলে শব্দ আরও জোরে কানে এসে বাজতো। কিন্তু আমার কেমন যেন ভয় করছে হুর?
এখন মন থেকে ভয়-ভীতি মুছে ফেলা নূরী। কেশব, তুমি নিশ্চয়ই ভয় পাওনি তাই না?
কেশব ভয় পেয়েছিলো নূরীর মতই কিন্তু বনহুরের এ কথার পর আর সে ভয় পাবার কথা বলতে পারলো না। কিছুই না বলে নিশ্চুপ চলতে লাগলো।
আর কিছুটা অগ্রসর হয়েই বনহুর, কেশব আর নূরী আরও বিস্মিত হলো–ঢাকের আওয়াজ এখন তারা একেবারে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু আওয়াজ স্পষ্ট হলেও কেমন যেন অস্পষ্ট ধরনের। মনে হচ্ছে, কোনো পাতালগহ্বর থেকে শব্দটা পৃথিবীর বুকে ভেসে আসছে।
আরও অবাক হলো ওরা তিনজন।
ঢাকের শব্দ শোনা যাচ্ছে বটে কিন্তু মশালের আলো তো নজরে পড়ছে না।
তবু বনহুর, নূরী আর কেশব অগ্রসর হচ্ছে।
এখন কিন্তু ঢাকের আওয়াজ স্পষ্ট শোনা গেলেও ঠিক বোঝা যাচ্ছে না আর কতদূর বা কোথায় জংলীদল ঢাক বাজাচ্ছে।
হঠাৎ বনহুরের দলের নজরে পড়লে–তাদের অনতিদূরে অন্ধকারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক পর্বতমালা। বনের পশ্চিম দক্ষিণজুড়ে জমাট অন্ধকারের মতই লাগছে পর্বতমালাগুলো।
অন্ধকারেও বনহুরের মুখ উজ্জ্বল হলো, আলো থাকলে নূরী আর কেশব লক্ষ্য করতো বটে, প্রশ্নও করে বসতো নানারকম। এসব প্রশ্নের জবাব বনহুর দিতো কিনা সন্দেহ। কিন্তু ওরা অন্ধকারে বনহুরের মুখোভাবের পরিবর্তন লক্ষ্য করতে পারছিলো না, কাজেই নীরবে শুধু অনুসরণ করছিলো তাকে।
সম্মুখে জমকালো রাক্ষসের মত পর্বতমালা লক্ষ্য করে নূরী আর কেশব দাঁড়িয়ে পড়লো।
বললো নূরী–এ যে পর্বতমালা, তবে কি জংলিগণ পর্বতের ওপাশে চলে গেছে?
কেশব বললো–আমারও সেই রকম মনে হচ্ছে বাবু। জংলিগণ নিশ্চয়ই পর্বতের ওপাশে গিয়ে ঢাক বাজাচ্ছে। তাই এমন অস্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
বনহুর বললো এবার–ওপাশে নয় কেশব, জংলিগণ এই পর্বতের ভিতরে প্রবেশ করেছে এবং সেখানে তাদের উৎসব চলছে।
নূরী অবাক কণ্ঠে বললো– পর্বতের ভিতরে, বলো বনহুর?
হ নূরী, দেখছো না শব্দটা কেমন গুরুগম্ভীর মনে হচ্ছে।
কেশব বললো–মশালের আলো কই? আলো তো নজরে পড়ছে না?
বললাম তো পর্বতের ভিতরে চলে গেছে ওরা। বললো বনহুর।
এমন সময় দূরে মোরগের ডাক শোনা গেলো।
আকাশ ফর্সা না হলেও ভোর হবার লক্ষণ দেখা গেলো।
বনহুর বললো–দূরী, তোমরা এসো, জংলিগণ এখন হয়তো ফিরে যাবার জন্য পর্বতের মধ্য হতে বেরিয়ে আসবে। ওরা বের হবার পূর্বেই আমাদের লুকিয়ে পড়তে হবে। আর বিলম্ব করোনা তোমরা।
নূরী মাটিতে বসে পড়লো আমি চলতে পারছি না।
সেকি, উঠে পড়ো–এক্ষুণি হয়তো ওরা বেরিয়ে আসবে।
মিথ্যা নয়–বনহুরের কথা শেষ হয় না, হঠাৎ পর্বতের মধ্যে ঢাকের আওয়াজ দ্রুত এবং আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো।
বনহুর নূরীকে একরকম প্রায় টেনে নিয়ে চললো, কেশবও অনুসরণ করলো বনহুরকে। পর্বতের গায়ে আশে পাশে প্রচুর বৃক্ষ-লতা-গুল্ম রয়েছে, আর রয়েছে অসংখ্য ফাটল।
বনহুর নূরী আর কেশবকে নিয়ে লুকিয়ে পড়লো পর্বতের একটি ফাটলের মধ্যে। একি ফাটলটা যেন ভূমিকম্পের মত কাঁপছে। বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে নূরী আর কেশবকে লক্ষ্য করে বললো– এখান থেকে চলে নূরী-কেশব। এটাই জংলীদের পর্বতগুহার মুখ বলে মনে হচ্ছে।
সত্যিই ফাটলসহ পর্বতের কিছুটা অংশ যেন দুলে দুলে উঠছে। পায়ের নিচেও ভূমিকম্পের। মত কাঁপছে। বনহুর নূরী এবং কেশবসহ দ্রুত ফাটলের বাইরে বেরিয়ে এলো। অমনি ফাটলের মুখটা ভীষণভাবে নড়ে উঠলো।
বনহুর নূরী আর কেশবকে একটানে টেনে নিয়ে ওদিকে একটা পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো। ভাগ্য বলতে হবে পাথরের নিচেই একটা মস্ত বড় গর্ত। নূরী আর কেশবকে গর্তের ভিতরে লুকিয়ে দিয়ে নিজে পাথরের আড়ালে আত্মগোপন করে দেখতে লাগলো বনহুর।
আশ্চর্য হয়ে দেখলো বনহুর–পর্বতের গায়ে ফাটলটার ভিতর থেকে হুড় হুড় করে বেরিয়ে আসছে অসংখ্য জংলী দল। মশালের আলোতে বনভূমি আলোকিত হয়ে উঠলো। সকলের হাতে একটি করে মশাল।
