স্তব্দ হয়ে তাকিয়ে রইলো কালু বনহুরের দিকে।
সমস্ত অনুচরের অন্তর কেঁপে উঠলো। এইবার কালু খাঁ নিশ্চয়ই বনহুরকে হত্যা করে ফেলবে। কিন্তু আশ্চর্য, পর মুহূর্তেই কালু খাঁ জড়িয়ে ধরেছিলো বনহুরকে বুকের মধ্যে, বলেছিলো –বেটা তুই শুধু দস্যু নেতাই হবি না, পৃথিবী বিখ্যাত দস্যু হবি তুই। লোভ, মোহ তোকে কোনদিন আকৃষ্ট করতে পারবে না।
আড়াল থেকে সব সেদিন দেখেছিলো নূরী। কালু খাঁর কথায় তার অন্তর ভরে উঠেছিলো। সেদিন দেখেছিলো বনহুরের সাহস, দেখেছিলো কতবড় তার বুকের বল। দস্যু সর্দার কালু খাঁর সম্মুখে সে তার দান উপেক্ষা ভরে বিনষ্ট করতে পেরেছিলো।
আরও কতদিনের কথা নূরীর অন্তরে গাঁথা হয়ে আছে। বিশেষ করে বনহুরের স্মৃতিগুলো নূরীর মনের আকাশে ধ্রুব তারার মতই চিরদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
বনহুরের সৌন্দর্যেই নূরী শুধু অভিভূত ছিলোনা তার পুরুষোচিত আচরণে বিমুগ্ধ ছিলো সে! বনহুরের আবেগ মাখা কণ্ঠ তাকে যেমন করতো আত্মহারা তেমনি তার পৌরুষভরা কণ্ঠস্বর ওকে করে তুলতো ভীত। বনহুরের সম্মুখে যেতে তখন সাহসী হতো না নূরী।
আজ যখন বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–পিছু হটা দস্যু বনহুরের নীতি নয়। এরপর নূরীর। আর কোনো কথা বলার মত দুঃসাহস হলোনা। জানে নূরী–বনহুর যা বলবে তা সে করবে। তাতে যদি তার প্রাণ যায় তবু সে নাছোড়বান্দা।
বনহুর বললো–আর মুহূর্ত বিলম্ব করা ঠিক নয়, তোমরা আমাকে অনুসরণ করো!
বনহুর উদ্যত রিভলভার হস্তে গর্তমধ্য হতে বেরিয়ে পড়লো।
কেশব আর নূরীও বের হলো তার পিছু পিছু।
নূরীর ওড়নার আঁচলে জংলী রাণীর দেওয়া সেই হীরকখন্ডগুলো রয়েছে। সেগুলো নূরী সযত্নে রক্ষিত করেছিলো আঁচলে।
কেশবের হাতে সূতীক্ষ্ণধার ছোরা।
বনহুরের হস্তে রিভলভার।
সম্মুখে বনহুর মাঝখানে নূরী আর কেশব পিছনে।
জংলীদল অনেক দূরে চলে গেছে। তাদের মশালের আলো মাঝে মাঝে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে ঘন জঙ্গলের ফাঁকে, আর ঢাকের আওয়াজ এখনও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
উঁচু ঢিবিটির গা বেয়ে নেমে আসতে লাগলো বনহুর, কেশব আর নূরী। বনহুর নূরীকে মাঝে মাঝে হাত ধরে সাহায্য করছিলো, কখনও বা কেশব ওকে নামিয়ে নিচ্ছিলো।
অল্পক্ষণেই ঢিবির পাদমূলে এসে হাজির হলো ওরা তিনজনা।
বনহুর বললো–আমরা অন্ধকারে আত্মগোপন করে জংলীদের অনুসরণ করবো। কেশব,নুরী–এসো তোমরা। আমার মনে হচ্ছে যে পথে জংলীগণ অগ্রসর হচ্ছে সেপথ কোনো গোপন আস্তানার পথ।
কেশব বললো–তাইতো, আমরা যেদিক থেকে পালিয়ে এসেছিলাম ওরা ঠিক তার বিপরীত দিকে চলে যাচ্ছে।
হাঁ, আমি তাই দেখতে চাই ওরা কোথায় যাচ্ছে। বনহুর কথাটা বলে চলতে লাগলো।
বললো নূরী–রংলালের দলকে ওরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
আমার মনেও সেই প্রশ্ন নূরী, আস্তানা ছেড়ে বিপরীত পথে কোথায় চলেছে ওরা কে জানে। কেশব, নূরী–তোমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে আমাকে অনুসরণ করো। হয় কার্যোদ্ধার হবে নয় জংলিদের হাতে প্রাণ যাবে।
উঃ! কি ভীষণ মানুষ তুমি? নূরী চলতে চলতে বললো।
বনহুর বললো-ঘাবড়াবার সময় এটা নয়, কাজেই কথা না বলে নীরবে এসো।
মনে মনে নূরী আতঙ্কিত হলেও কোনো কথা না বলে চলতে লাগলো। জানে সে কোনো বাধা বিঘ্নই বনহুরকে তার সঙ্কল্প থেকে বিরত করতে সক্ষম হবে না।
ভীষণ জঙ্গলে গভীর রাত্রিতে জমাট অন্ধকারে অত্যন্ত সাবধানে চলতে হচ্ছিলো তাদের। অল্পক্ষণ পূর্বে জংলিগণ ঢাক বাজিয়ে মশাল জ্বালিয়ে চলে গেছে এই পথে, কাজেই হিংস্র জীবজন্তুর তেমন কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
জংলীদের মশালের আলো দূরে–অনেক দূরে সরে গেলেও রাত্রির অন্ধকারে বেশ স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিলো, তাছাড়া ঢাকের আওয়াজও গুরুগম্ভীর স্বরে ভেসে আসছিলো তাদের কানে।
জংলীদের অনুসরণ করে পথ চলতে কিছুমাত্র অসুবিধা হচ্ছিলো না বনহুরের দলের।
নূরীকে নিয়ে অবশ্য বেশ বিব্রত হচ্ছিলো বনহুর, কারণ সে অন্ধকারে বার বার হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলো। বনহুর আর কেশব তাকে সাহায্য করছিলো।
ধীরে ধীরে জংলীদের মশালের আলো অস্পষ্ট হয়ে আসছে। ঢাকের আওয়াজ লক্ষ্য করে এগুতে লাগলো তারা। সেকি দুর্গম পথ! এ পথে মানুষ কখনও চলতে পারে! তদুপরি রাতের অন্ধকার।
অবিশ্রান্ত চলেছে ওরা।
এখন মশালের আলোর ক্ষীণ– রশ্মিও আর নজরে পড়ছে না। ঢাকের শব্দও ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে আসছে।
তবু বনহুর, কেশব আর নূরীর চলার বিরাম নেই।
জংলিগণ যে বনহুরের দলের চলার গতির চেয়ে দ্বিগুণ বেশি জোরে চলছিলো তাতে কোনো ভুল নেই। কারণ জংলিদের চলার সঙ্গে পেরে উঠা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। অবশ্য বনহুর যদি একা হতো সে জংলীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গহন বনে আত্মগোপন করে একেবারে পৌঁছে যেতো তাদের অতি নিকটে।
কিন্তু নূরীর জন্যই বনহুর জংলীদের ঠিকভাবে অনুসরণ করে অগ্রসর হতে পারছিলো না।
ওদিকে ঢাকের আওয়াজও আর শোনা যাচ্ছে না।
ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হয়ে এসেছে ঢাকের শব্দ।
কেশব বললো–বাবু, এখন আমরা কোন্ পথে চলবো? ঢাকের আওয়াজ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছেনা আর?
হাঁ, অসুবিধা হবে এখন, তবু আমাদের যেতে হবে। দেখতে চাই জংলিগণ কোথায় গেলো।
নীরবে অগ্রসর হচ্ছে ওরা।
ঢাকের শব্দ আর শোনা যাচ্ছে না।
তবে বনহুর অনুমানে চলতে লাগলো যে পথে জংলীদের মশালের আলো অদৃশ্য হয়েছিলো। যেদিকে ঢাকের আওয়াজ মিশে গেছে ঠিক সেই পথ অনুসরণ করে অন্ধকারে এগুতে লাগলো।
