বনহুর, কেশব আর নূরী, অন্ধকারময় গর্তের মধ্যে রইলেও তাদের দৃষ্টি ছিলো অদূরস্থ জংগল মধ্যে।
মশালের আলো অত্যন্ত নিকটে এসে পড়েছে।
ভয়ে কুঁকড়ে গেছে নূরী আর কেশব।
বনহুর উদ্যত রিভলভার বাগিয়ে গর্তের মুখে হাঁটু গেড়ে বসে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে লক্ষ্য করছে।
সমস্ত বনভূমি যেন প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে। কানে তালা লাগাবার জোগাড়। মশালের আলোতে সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বনহুর হঠাৎ চাপা কণ্ঠে বলে উঠলো–কেশব, আশ্চর্য দেখো দেখো কয়েকজন লোককে ওরা ধরে আনছে না?
কেশব আর নূরী ঢিবির উপর গর্তমুখ হতে তাকালো নিচে বনের মধ্যে। মশালের আলোতে স্পষ্ট দেখলো–অসংখ্য জংলী দল ঢাক বাজিয়ে মশাল হস্তে বন্যহস্তীর মত ঘোৎ ঘোৎ করে এগুচ্ছে। ওদের মাঝখানে কয়েকজন সভ্য মানুষ রয়েছে বলে মনে হলো।
কেশব বলে উঠলো–বাবু, বাবু এ যে রংলাল দেখছি!
বনহুর তীক্ষ্ণ নজর ফেললো নিচের দিকে–তাইতো, সাপুড়ে সর্দারের ভাতিজা রংলাল। আরও কয়েকজন লোক দেখছি তো সবাইকে ওরা পিছমোড়া করে বেঁধে আনছে।
নূরী যেন খুশি হয়ে বললো–শয়তান রংলালের দল তাহলে জংলীদের হাতে ধরা পড়েছে?
যা ভালো হয়েছে। নূরীর কণ্ঠ খুশি ভরা।
বনহুর বললো–যা খোদার কাছে হাজার শুকরিয়া। এ যাত্রা ওরা আমাদের এদিকে এলো ন্স। ঐ দেখো ওরা ওদের নিয়ে চলে যাচ্ছে। এটা জংলীদের পথ বলে মনে হচ্ছে।
কেশবের এতোক্ষণে যেন কম্প দিয়ে জ্বর ছেড়ে গেলো, সে নিঃশ্বাস নিয়ে বললো–বাঁচলাম বাবু!
নূরীর মুখ অন্ধকারে দেখা না গেলেও বনহুর বুঝতে পারলো সেও অত্যন্ত খুশি হয়েছে। বনহুরের বুকে মুখ লুকিয়ে হাফ ছেড়ে বললো–উঃ বাঁচলাম এতোক্ষণে।
জংলিগণ তখন রংলালের দলকে বন্দী করে মহা হই-হুল্লোড় এবং ঢাক বাজিয়ে ঢিবিটার বিপরীত দিকে চলে যাচ্ছে। বনহুর নির্বাকভাবে তাকিয়ে দেখছে– যেদিক থেকে জংলিগণ এলো, সেই দিকেই জংলী রাণীর আস্তানা। তবে এরা যাচ্ছে কোথায়?
বনহুর মুহূর্ত চিন্তা করে নিলো–ওরা নিশ্চয়ই কোন নতুন জায়গায় যাচ্ছে, যেখানে হবে তাদের আজ নব উৎসব। বনহুর ওদের অনুসরণ করবে–দেখবে কোথায় যায় ওরা এবং রংলালের দলকে কি করে।
বনহুর তীক্ষ্ণ নজরে দেখছে–ক্রমান্বয়ে জংলীর দল তাদের টিবি ছেড়ে অনেক দূর পিছিয়ে চলে গেলো। মশালের আলোগুলো ধীরে ধীরে ঘন হয়ে আসছে, ঢাকের আওয়াজও অস্পষ্ট লাগছে। বনহুর বললো– কেশব এবার আমাদের এ গর্তের মায়া ত্যাগ করতে হবে।
নূরী আঁতকে উঠলো–কোথায় যাবে তাহলে হুর?
যেদিকে জংলিগণ গেলো।
সর্বনাশ! ওরা আমাদের অবস্থাও সাপুড়ে সর্দারের মত করে ফেলবে। বললো নূরী।
কোনো উপায় নেই নূরী।
তাই বলে ইচ্ছা করে ধরা দেবে জংলীদের হাতে?
কে বলে ইচ্ছা করে ধরা দেবো? দেখতে চাই জংলিগণ বিপরীত পথে কোথায় চলেছে।
কি হবে জংলীদের গন্তব্য স্থানের সন্ধান নিয়ে?
তুমি বুঝবে না নূরী।
কেশব এবার কথা বললো–বাবু জংলীদের পিছু নেওয়া কি আমার ঠিক্ হবে!
সব পরে বলবো এখন শীঘ্র তোমরা প্রস্তুত হয়ে নাও।
নূরী ভীত কণ্ঠে বললো–আমার কিন্তু বড্ড ভয় করছে!
বনহুর বললো–নূরী তুমি না দস্যু দুহিতা ভয় পেলে চলবে কি করে? যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা এতোদূর অগ্রসর হয়েছি, যে কারণে আমরা হারিয়েছি আমাদের সাপুড়ে সর্দারকে সেই কাজ সফল না করে কি করে ফেরা যায়!
হুর, তুমি তাহলে গুপ্তরত্ন গুহার সন্ধান না নিয়ে ফিরবে না?
পিছু হটা বনহুরের নীতি নয়।
এরপর নূরী আর কোনো কথা বলতে সাহসী হয় না। কারণ বনহুরের কণ্ঠমধ্যে এমন একটা গাম্ভীর্য ফুটে উঠেছিলো যা তার অতি পরিচিত। বনহুরকে সে ভালভাবেই জানে। জানে সে যখন ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে তখন কাউকে সমীহ করে না। নূরী তাকে যেমন ভালবাসতো তেমনি করতো। ভয়। ক্রুদ্ধ হলে সে তখন হিংস্র জন্তুর চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতো, অতি প্রিয়জনকেও সে তখন ক্ষমা করতো না, যদি পেতো তার কোনো অপরাধ। এই বিপদসঙ্কুল মুহূর্তেও নূরীর মনে পড়লো অনেকদিন আগের একটা ঘটনা। কালু খাঁ তখন জীবিত। একদিন বনহুর দস্যুতা করে ফিরে এলো তাজের পিঠে চেপে। দেহে তার জমকালো ড্রেস, মাথায় পাগড়ি, কানে বালা। কোমরের বেল্টে সূতীক্ষ্ণ ধার ছোরা, অপর পাশে রিভলভার।
অগণিত অনুচরসহ বনহুর দরবারকক্ষে প্রবেশ করলো। প্রত্যেকটা অনুচরের হস্তে লুণ্ঠিত দ্রব্যাদি।
কালু খাঁর সম্মুখে এসে দাঁড়ালো বনহুর।
অনুচরগণ লুণ্ঠিত দ্রব্যাদি সর্দারের সম্মুখে পাকার করে রাখলো। বনহুরের পিছনে দাঁড়ালো সারিবদ্ধ হয়ে।
বনহুর কালু খাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়ে কুর্ণিশ জানালো। সমস্ত অনুচরও অনুকরণ করলো বনহুরকে, তারাও কুর্ণিশ জানালো সর্দার কালু খাঁকে।
সেদিন প্রচুর ধনরত্ন আর টাকা-পয়সা নিয়ে এসেছিলো বনহুর।
কালু খাঁ সন্তুষ্ট হয়ে বনহুরের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেছিলো সেদিন–বনহুর তুমি দস্যু-নেতা হবার যোগ্য পাত্র বটে। নাও, এই মুক্তার মালা ছড়া তুমি নাও।
বনহুরের লুষ্ঠিত স্থূপাকার মালপত্রের মধ্য হতে একটি মূল্যবান মুক্তামালা তুলে পরিয়ে দিয়েছিলো কালু খাঁ বনহুরের কণ্ঠে।
বনহুর খুশি না হয়ে মুক্তার মালা ছড়া একটানে ছিঁড়ে ছুঁড়ে দিয়েছিলো দূরে। গম্ভীর দীপ্ত কণ্ঠে বলেছিলো সেবাপু বনহুর দস্যু বটে কিন্তু লোভী নয়। মুক্তার মালার কোনোই প্রয়োজন আমার নেই।
