বনহুর বিফল হয়ে ফিরে যাবার লোক নয়।
যতক্ষণ তার অভিসন্ধি সিদ্ধ না হয়েছে ততক্ষণ সে বিরত হবে না। কার্যোদ্ধার করে তবেই সে ক্ষান্ত হবে। সাপুড়ে সর্দার তাকে বলেছিলো–সেই কথাটা আজও মনে আছে বনহুরের– বাবুজী সেই গুপ্তরত্ন গুহার সন্ধান আমি আজও কাউকে বলিনি। আমার ভাতিজা রংলালকে আমি বিশ্বাস করি না, তাই ওকেও বলিনি। বাবুজী আপনাকে আমি ছেলের মতই মনে করি। তাই আপনাকে আমি সেই গুপ্তরত্ন গুহার সন্ধান দিয়ে যাবো। আহা, বেচারা শেষ পর্যন্ত তাকে গন্তব্য স্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হলো না।
রাত বেড়ে আসছে।
বনহুর কেশবের পাশে শুয়ে শুয়ে ভাবছে কত কথা। ঘুম চোখে আসছে না। আজ সর্দারের প্রতিটি কথা মনে উদয় হচ্ছে একটির পর একটি করে। সাপুড়ে সর্দার সেই গুপ্তরত্ন গুহার পথের বর্ণনা বলেছিলো, বলেছিলো সে পথ কেমন। সব বনহুর আজ পুনরায় মনের পর্দায় এঁকে নিচ্ছে। গভীর মনোযোগের সঙ্গে।
কিন্তু ঘুম যে তার চোখে আসছে না, এ পাশ-ওপাশ করছে বনহুর। পাশেই কেশব ঘুমিয়ে পড়েছেনাক ডাকছে তার। নূরী ঘুমিয়েছে তার জায়গায়। মাঝখানে মাত্র কয়েক হাতের ব্যবধান। নূরীকে পাশে পাবার জন্য বনহুরের মন চঞ্চল হয়ে উঠলো।
অনেক চেষ্টাতেও বনহুর নিজকে সংযত রাখতে পারলো না। কেশবের পাশ থেকে উঠে এগিয়ে গেলো নূরীর পাশে। শিয়রে এসে বসলো বনহুর, অন্ধকারে নূরীর ললাটে হাত রাখলো।
সঙ্গে সঙ্গে নিদ্রা ছুটে গেলো নূরীর, বললো কে?
বনহুর চাপা কণ্ঠে বললো–নূরী আমি!
এতো রাতেও ঘুমাওনি কেন?
ঘুম আসছে না আমার চোখে। বনহুর নূরীর মুখখানা তুলে ধরে নিজের মুখের কাছে।
নূরী বাধা দিয়ে বলে উঠে–ছিঃ কেশব ভাই রয়েছে।
উঁ হুঁ ছাড়বো না তোমাকে।
তোমার পায়ে পড়ি হুর! তোমার পায়ে পড়ি—
নূরী!
হুর আমার লক্ষীটি!
ঘুম যে আমার পাচ্ছে না নূরী।
তুমি শোও আমি তোমার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।
তোমার কোলে মাথা রেখে শোবো।
বেশ তো শোও।
বনহুর নূরীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো।
নূরী ধীরে ধীরে ওর চুলের ফাঁকে আংগুল চালাতে লাগলো।
কখন এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো বনহুর।
নূরী ঘুমন্ত বনহুরের চিবুকে ছোট্ট একটা চুম্বন রেখা এঁকে দিয়ে আস্তে আস্তে ওরা মাথাটা নামিয়ে রাখলো নিচে। তারপর নিজের জায়গায় এসে শুয়ে পড়লো।
হঠাৎ ঢাকের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো বনহুরের, ধড়মড় করে উঠে বসলো। সঙ্গে সঙ্গে কেশব আর নূরীর নিদ্রাও ছুটে গিয়েছিলো।
বনহুর বললো মৃদু চাপা কণ্ঠে নিশ্চয়ই এ জংলীদের ঢাকের আওয়াজ।
কেশব ভয়ার্ত কণ্ঠে বললো–জংলীরা কি এদিকে আসছে?
আমার সেই রকমই মনে হচ্ছে। কারণ ঢাকের আওয়াজ ক্রমশ স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে।
তাহলে কি হবে হুর? অন্ধকারে নূরী বনহুরের জামার আস্তিন চেপে ধরে তার বুকের কাছে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলো।
বনহুর নূরীকে নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নিয়ে বললো– ঠিক বোঝা যাচ্ছে না–ওরা এদিকে আসছে, না ওই পথে অন্য কোথাও যাচ্ছে।
কান পেতে শুনলো ওরা–ঢাকের আওয়াজ অল্পক্ষণেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বনহুর। বললো–তোমরা অপেক্ষা করো, আমি বাইরে গিয়ে দেখছি।
নূরী এটে ধরলো বনহুরকে–দেহে প্রাণ থাকতে তোমাকে বাইরে যেতে দেবো না।
বনহুর হাসলো, বললো–কতক্ষণ আমাকে ধরে রাখতে পারবে নূরী? জংলী রাণী যদি তোমার কাছ থেকে আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়?
দাঁতে দাঁত পিষে বললো নূরী–যুদ্ধ করবো তার সঙ্গে।
পারবে জংলী রাণীর অনুচরদের সঙ্গে?
না পারি মরবো, তারপর জংলী রাণী তোমাকে নিয়ে যাবে আমার কাছ থেকে–বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে নূরীর কণ্ঠ।
বনহুর নূরীর গন্ডে মৃদু চাপ দেয়, কিছু বলতে যায় সে কিন্তু কেশবের উপস্থিতি তাকে বিরত করে।
কেশব বলে–মশালের আলো না?
বনহুর নূরীকে সরিয়ে দিয়ে গর্তের মুখের কাছে সরে আসে।
সেও দেখতে পায় অসংখ্য মশালের আলো সারিবদ্ধভাবে গহন জঙ্গলে এগিয়ে আসছে। ঢাকের আওয়াজ এখন আরও বেড়ে গেছে চরম আকারে। বনহুর ভীত না হলেও আতঙ্কিত হলো, নিশ্চয়ই ওরা জানতে বা বুঝতে পেরেছে এখানে তারা লুকিয়ে আছে।
নূরী আর কেশব প্রায় কেঁদেই ফেললো।
বনহুর ছোরাখানা কেশবের হাতে দিয়েই নিজে রিভলভার প্রস্তুত করে নিলো। বনহুরের চোরা পকেটে এখনও বেশ কয়েকটা গুলী জমা ছিলো।
ক্রমেই মশালের আলো স্পষ্ট মনে হচ্ছে।
দ্রুত যেন আলোগুলো এগিয়ে আসছে। নূরী পুনরায় আঁকড়ে ধরলো বনহুরকে।
কেশবের অবস্থাও শোচনীয়। কাঁপতে শুরু করেছে কেশব।
বনহুর বললো–নূরী মানুষ চিরকাল বাঁচতে আসেনি। কাজেই মরতে যখন একদিন হবেই তখন এতো ভীত হবার কারণ কি? কেশব মরতে যদি চাও তবে বীরের মতই মরবে– দুঃখ কি এতে। সাহস সঞ্চয় করে নাও তোমরা, আমার মনে হচ্ছে–ওরা আমাদের অবস্থান জানতে পেরেছে।
ঢাক-ঢোল বাজিয়ে এভাবে কেন আসছে ওরা? বললো নূরী?
ওটা ওদের নিয়ম। বিশেষ করে জংলীরা যখন রাত্রিতে গহন জঙ্গলে বিচরণ করে তখন জ্বলন্ত মশাল আর ঢাকের আওয়াজ তাদের বন্য হিংস্র জীবজন্তুর কবল থেকে রক্ষা করে থাকে।
কেশব বলে উঠলো আবার –বাবু ঐ দেখুন ওরা প্রায় এসে পড়েছে।
বনহুর বললো–কোনোরকম কথা না বলে চুপ করে থাকতে হবে। যতক্ষণ ওরা আমাদের গুহার ভিতরে প্রবেশ না করে ততক্ষণ আমরা নিশ্চুপ রইবো।
বনহুর আর কেশবের কথাবার্তা অত্যন্ত চাপা স্বরে হচ্ছিলো।
