কাজ শেষ করে বনহুর ফিরে এলো গুহা মধ্যে।
নূরীর সংজ্ঞা ফিরানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো বনহুর।
কিন্তু বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না, নূরী আর্তচিৎকার করে উঠলো–উঃ মাগো–মা– মা–
বনহুর ঝুঁকে পড়লো নূরীর মুখের উপর, ডাকলোনূরী নূরী–
চোখ মেলে তাকালো নূরী বনহুরকে দেখতে পেলে তার চোখ মুখ আনন্দোদ্দীপ্ত হয়ে উঠলো। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে ডাকলো–হুঁর তুমি এতোক্ষণে এলে?
বনহুর নূরীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো-নূরী, সুস্থ হও আমরা জংলীদের কবল থেকে। পালাতে সক্ষম হয়েছি।
নূরী উঠে বসলো–সর্দার কই কেশব ভাই কই–এখন আমরা তবে কোথায়? কোথায় বলো?
স্থির হও সব বলছি নূরী এই তো কেশব তোমার পাশে। বনহুর কেশবকে দেখালো। তারপর ধরা গলায় বললো–কিন্তু যে আমাদের পথ প্রদর্শক সেই সাপুড়ে সর্দার আর আমাদের মধ্যে নেই।
এবার নুরীর মনে উদয় হলো সেই দৃশ্য। একজন জংলী খড়গ হস্তে এসে দাঁড়ালো সর্দারের পাশে, আর একজন একটা মাটির পাত্র উঁচু করে ধরলো। মাত্র একমুহূর্ত–সর্দারের মাথাটা খড়গের আঘাতে খসে পড়লো–তারপর আর মনে নেই কিছু। নূরী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো– বাবুজী মরে গেছে কি হবে আর আমাদের বেঁচে থেকে। ওরা আমাদের সবাইকে কেন হত্যা করলো না! আমাদের বেঁচে থেকে কি হবে হুর?
নূরী, রোদন করার সময় এটা নয়। জংলিগণ এক্ষুণি সমস্ত জঙ্গলময় ছড়িয়ে পড়বে। আমাদের সন্ধান যদি তারা পায় তাহলে আর রক্ষা নেই।
কেশব ক্রন্দনজড়িত ভয়ার্ত কণ্ঠে বললো–কেন আমরা এসেছিলাম! কেন আমরা আগে এসব কথা স্মরণ করিনি এখন কি হবে বাবু?
কেশব, মিছামিছি দুঃখ করা বাতুলতা মাত্র। এখন কি করে প্রাণে বাঁচা যায় সেই চিন্তা করো।
কি করা যায় বাবু ভেবে পাচ্ছি না। ঐ শুনুন জংলীরা বোধ হয় এদিকেই আসছে। কান পেতে শোনে কেশব।
বনহুর আর নূরীও শুনলো–দূরে মহা হই-হুল্লোড় শোনা যাচ্ছে। এখন রাত্রি নয়, দিনের আলো সব পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। বনহুর বললো–এ জায়গাটা সমতল ভূমি থেকে বেশ উঁচুতে। গর্তটাও সহজে কারো নজরে পড়বে না। তাছাড়া আমি গাছপালা দ্বারা গর্তটার মুখ বেশ করে ঢেকে দিয়েছি সহজে কেউ বুঝতে পারবে না এখানে কোনো গর্ত আছে।
হই-হুল্লোড় ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে আসছে বলে মনে হলো।
বনহুর বললো–জংলীরা আমাদের সন্ধানে অন্য পথে অগ্রসর হচ্ছে। কিছুক্ষণের জন্য আমরা নিশ্চিন্ত।
বললো নূরী–এমন করে কতক্ষণ লুকিয়ে থাকবো আমরা?
যতক্ষণ কোনো পথ আবিষ্কার না হয়। কেশবকে লক্ষ্য করে বললো আবার বনহুর–কেশব আমরা সাপুড়ে সর্দারের নির্দেশ মত অনেক দূর এগিয়ে এসেছি। ফিরে যাবার পূর্বে তার সেই গুপ্ত গুহার সন্ধান নিয়ে তবেই যাবো।
নূরী বলে উঠে–কি হবে হুর গুপ্ত গুহার সন্ধান নিয়ে। জীবন যদি হারাতে হয় তাহলে–একি, তোমার গলায় এতোগুলো হীরক হার! এগুলো তুমি কোথায় পেলে?
বনহুর গম্ভীর গলায় বললো–জংলী রাণীর উপহার।
মুহূর্তে নূরীর মুখ কালো হয়ে উঠলো। জংলী রাণী যখন বনহুরকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলো, তখন নূরীর বুকে কে যেন তীর বিদ্ধ করে দিয়েছিলো। নিজকে সে কিছুতেই স্থির রাখতে পারেনি। অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো নূরী–জংলী রাণীর উপহার তুমি সযতনে গলায় করে আনছো? না না, ও হার আমি তোমায় পরতে দেবো না–নূরী একটানে বনহুরের কণ্ঠের হীরক হার ছিঁড়ে ফেললো।
উজ্জ্বল হীরকগুলি ছড়িয়ে পড়লো মেঝেতে।
কেশব বলে উঠলো–একি করলে ফুল? দ্রুতহস্তে হীরক গুলো কুড়িয়ে তুলতে লাগলো সে।
বনহুরের মুখ গম্ভীর হলো।
নূরী বনহুরের জমার আস্তিন চেপে ধরলো–জংলী রাণীর উপহার তুমি কেন গ্রহণ করলে বলো? কেন নিলে এসব?
নূরী মনকে এত সঙ্কীর্ণ করো না। জংলী রাণীর উপহার গ্রহণ না করে আমার কোনো উপায় ছিলো না।
তুমি-তুমি–
হাঁ হাঁ নূরী–এই নাও এসব তোমার। বনহুর কেশবের হাত থেকে হীরক খন্ডগুলো নিয়ে নূরীর আঁচলে তুলে দেয়।
নূরী পাথরের মূর্তির মত নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে।
*
জংলীদের কবল থেকে কোনোরকমে আত্মগোপন করে দু’দিন কাটিয়ে দিলো বনহুর কেশব আর নূরী। গর্তটার মধ্যে কোনো অসুবিধা হলো না তাদের।
বনহুর বাইরে গিয়ে ফলমূল সংগ্রহ করে আনতো। কেশব আর নূরীকে কোনো সময় সে বাইরে যেতে দিতো না। হঠাৎ কখন জংলিগণ এদিকে এসে পড়ে–তাহলে কিছুতেই ওদের কবল থেকে বাঁচতে পারবে না তারা।
ইতিমধ্যে জংলীরা আশে পাশে জঙ্গলে তন্ন তন্ন করে খুঁজে গেছে।
বনহুর আর কেশব গাছপালার পাতা এনে শয্যা তৈরি করেছে। গর্তের একপাশে শোয় কেশব আর বনহুর। অপর ধারে শোয় নূরী।
সমস্ত দিন ধরে পরামর্শ চলে তিন জনের মধ্যে কেমন করে এখান থেকে পালানো যায়। কিন্তু পালানোর কোনো উপায় খুঁজে পায়না। যে পথেই তারা পালাতে যাবে সেই পথেই ধরা পড়ার সম্ভাবনা আছে। সমস্ত জংগলময় জংলী রাণীর ক্ষুব্ধ অনুচরগণ পাহারা দিয়ে চলেছে।
দিবারাত্র তারা সূতীক্ষ্ণ বল্লম নিয়ে অন্বেষণ করে ফিরছে। এই ঢিবিটা এমন জায়গায় যেখানে সহজে কারো দৃষ্টি যায় না এবং সেই কারণেই এতোক্ষণও তারা জংলীদের কড়া নজর এড়িয়ে জীবিত রয়েছে।
আজ তৃতীয় দিন।
বনহুর লক্ষ্য করেছে–কেশব আর নূরী যেন হাঁফিয়ে উঠেছে। দুশ্চিন্তায় ম্লান হয়ে উঠেছে তাদের মুখমন্ডল। বিশেষ করে সর্দারের নৃশংস মৃত্যু তাদের দুজনার হৃদয়ে দারুণ আঘাত করেছে। বনহুরও সর্দারের মৃত্যুতে কম মর্মাহত হয়নি, কিন্তু বনহুর জীবনে এর চেয়েও বিকৃত মৃতদেহ দেখেছে এর চেয়েও নৃশংস হত্যা সে নিজে করেছে। কাজেই তার মনে সর্দারের মৃত্যু তেমন করে রেখাপাত করতে পারেনি। তাছাড়াও সর্দারের কথা ভাববে কখন সে। তার মস্তিস্কে এখন নানারকম চিন্তার প্যাঁচ চলেছে। জংলীদের মৃত্যু-ছোবল থেকে নূরী ও কেশবকে বাঁচাতে হবে। শুধু জীবন রক্ষাই এখন বনহুরের উদ্দেশ্য নয়। তার প্রবল ইচ্ছা যে অভিসন্ধি নিয়ে তারা এতোদূর অগ্রসর হয়েছে সেই গুপ্তরত্ন গুহার সন্ধান না নিয়ে সে ফিরবে না।
