বনহুর সূতীক্ষ্ণ-ধার ছোরাখানা নিয়ে চুপি চুপি সুড়ঙ্গ মুখের অনতিদূরে একটু আড়ালে দাঁড়ালো। কান পেতে শুনলো কোন শব্দ পাওয়া যায় কিনা।
কোনো শব্দ এলো না সুড়ঙ্গমুখ থেকে।
বনহুর সন্তর্পণে এগুতে লাগলো।
একেবারে সুড়ঙ্গমুখে এসে অবাক হলো বনহুর। পাহারাদার জংলীদ্বয় সুড়ঙ্গ মুখের দেয়ালে ঠেশ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। বনহুর ছোট্ট একটা পাথরের টুকরা তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিলো একজনের দেহে। আশ্চর্য জংলীটা একটুও নড়লো না।
বনহুর পুনরায় আর একটি পাথরের টুকরা অপরজনের দেহে নিক্ষেপ করলো।
কিন্তু সেও নড়লো না।
তবে কি ওরা নেশা করেছে কিছু! বনহুর সুড়ঙ্গমুখ থেকে বেরিয়ে এলো বাইরে। গাছপালার আড়ালে আত্মগোপন করে অগ্রসর হলো।
সুড়ঙ্গ মুখের অদূরেই কাঠের বিরাট মঞ্চ।
বনহুর বিস্ময়ভরা নয়নে দেখলো মঞ্চের আশে পাশে জংলীদল সব ছড়িয়ে পড়ে আছে। চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে জংলী সর্দার হস্তী শাবকের মত। বনহুর আরও দেখলো প্রত্যেকের সামনে এক একটা মাটির হাড়ির মত বস্তু পড়ে রয়েছে। মঞ্চের অদূরে কয়েকটা বড় বড় ঢোলের মত ড্রাম। সেই সব ড্রামে একরকম তরল পদার্থ রয়েছে। বনহুর এগিয়ে আসতেই একটা উৎকট গন্ধ তার নাকে প্রবেশ করলো। বুঝতে পারলো সে ঐ গন্ধ কিসের। একরকম তালগাছ জাতীয়। বৃক্ষ থেকে জংলিগণ এই রস সংগ্রহ করে এবং কোনো উৎসবে পান করে।
বনহুর নিশ্বাস ফেলে বাচলো যা জংলিগণ তাহলে সব মাতাল হয়ে জ্ঞান শূন্য রয়েছে। দ্রুত এগিয়ে গেলো বনহুর কাষ্ঠ খুঁটিগুলোর দিকে।
নিকটে পৌঁছতেই বনহুরের চুক্ষুস্থির হয়ে গেলো। বনহুরের দস্যু প্রাণও শিউরে উঠলো ক্ষণিকের জন্য। যদিও সে একটু পূর্বে চার চারটা জংলীকে হত্যা করেছে তবু এ দৃশ্য তাকে উদভ্রান্ত করে তুললো। দেখলো–তখনও খুঁটির সঙ্গে ঠিক পূর্বের মত করে বাঁধা অবস্থায় রয়েছে সাপুড়ে সর্দার কেশব আর নূরী। কিন্তু সাপুড়ে সর্দারের দেহে মস্তক নেই। কি বীভৎস দৃশ্য!
বনহুর দু’হাতে নিজের চোখ দুটো একবার ঢেকে ফেললো। তারপর আবার তাকালো ধীরে ধীরে সাপুড়ে সর্দারের দেহ থেকে মাথাটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। মাথাটা পড়ে আছে ঠিক তার পায়ের কাছে। চাপ চাপ রক্ত জমাট বেঁধে আছে ছিন্ন গলাটার উপর।
বনহুর কেশব আর নূরীর দিকে তাকালো।
ওরা দু’জনাই জ্ঞানশূন্য অবস্থায় রয়েছে। দু’জনারই মাথাটা কাৎ হয়ে আছে এক পাশে।
বনহুর দ্রুত হস্তে কেশবের বন্ধন উন্মোচন করে দিলো তারপর ঝাঁকুনি দিয়ে ডাকলো –কেশব–কেশব উঠো–উঠো শীঘ্র–উঠো– কেশব–কেশব–
কেশব আস্তে চোখ মেলে তাকালো, পর মুহূর্তে বনহুরকে জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলো–বাবু সর্দারজীকে ওরা কেটে ফেলেছে–রক্ত খেয়েছে ওরা–রক্ত–
হাঁ দেখলাম। কেশব যা হবার হয়েছে, আর বিলম্ব করে কোনো ফল হবে না। ওরা সবাই নেশায় অজ্ঞান হয়ে আছে। এই মুহূর্তে পালাতে হবে! বনহুর কেশবকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিয়ে দ্রুত নূরীর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে নূরীর বন্ধন ছুরি দিয়ে কেটে ফেলে কিন্তু নূরীর জ্ঞান ফিরে আসে না কিছুতেই। ওদিকে জংলীগণের সংজ্ঞা ফিরে এলে আর রক্ষা থাকবে না। তাছাড়া জংলী রাণীও যদি জেগে উঠে তাহলে নিস্তার নেই।
বনহুর নূরীর সংজ্ঞাহীন দেহটা কাঁধে তুলে নিলো। কেশবকে লক্ষ্য করে বললো–দ্রুত পা চালিয়ে চলো কেশব।
কেশব কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো –বাবু সর্দারের–
তার জন্য দুঃখ করার সময় এখন আর নেই কেশব। তাড়াতাড়ি চলে এসো–বনহুর নূরীর দেহটা কাঁদে নিয়ে ক্ষিপ্রগতিতে গহন জঙ্গল মধ্যে আত্মগোপন করলো।
সংজ্ঞাহীন নূরীর দেহটা কাঁধে নিয়ে যতদূর সম্ভব পা চালিয়ে চললো বনহুর। কেশব তাকে অনুসরণ করে চলেছে।
দূরে–অনেক দূরে চলে যেতে হবে। নাহলে জংলীগণ জেগে উঠলে আর তাদের রক্ষা থাকবে না। সমস্ত বনভূমি চষে ফেলবে জংলীরা।
অনেকটা পথ চলার পর হঠাৎ বনহুর আর কেশবের কানে ভেসে এলো ঢাকের আওয়াজ।
বললো বনহুর–কেশব,সর্বনাশ জংলীরা জেগে উঠেছে। তাদের নেশা ছুটে গেছে—
এখন কি হবে তাহলে বাবু?
জীবন রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে হবে। কেশব, নূরীর জ্ঞান এখনও ফিরে এলো না।
বাবু ফুলের জ্ঞান ফিরে এসেছিলো, কিন্তু যখন সাপুড়ে সর্দারের মাথা কেটে ফেলা হলো তখন আমার চোখ দুটো কেমন যেন মুছে এলো–ঠিক সেই সময় ওর জ্ঞানও চলে গেছে।
হাঁ তাই হবে কিন্তু এখন কোথায় যাওয়া যায় বলো?
হঠাৎ কেশব বলে উঠলো–বাবু, ঐ দেখেন সামনে একটা পাথরের ঢিবি চলুন আমরা ঐ ঢিবির আড়ালে লুকিয়ে পড়ি।
তাইতো ঢিবির মতই লাগছে–চলো দেখা যাক কোনো উপায় হয় কিনা।
বনহুর নূরীর সংজ্ঞাহীন দেহটা নিয়ে অগ্রসর হলো।
কেশব চললো পিছু পিছু।
ঢিবিটার নিকটে পৌঁছতেই আনন্দে বনহুরের মন দুলে উঠলো। ঢিবির ওপাশের বিরাট একটা গর্ত নজরে পড়লো। আপাততঃ এখানে আত্মগোপন করা যায়। গর্তটা বেশ বড়সড় তিন জনের পক্ষে যথেষ্ট হবে।
বনহুর নূরীসহ গর্তমধ্যে প্রবেশ করলো।
কেশবও এলো তার সঙ্গে।
নূরীকে গতমধ্যে শুইয়ে দিয়ে বনহুর দ্রুত বেরিয়ে গেলো। কেশবও বেরিয়ে যাচ্ছিলো। বনহুর বাধা দিয়ে বললো–তুমি ওর পাশে থাকো, আমি এক্ষুণি আসছি।
কোথায় যাবেন বাবু?
এখানেই রয়েছি যাবো না কোথাও। বনহুর বেরিয়ে গেলো এবং সূতীক্ষ্ণ-ধার ছোরা দিয়ে কতকগুলো ডাল পালা ঝোপঝাড় কেটে এনে গর্তটার মুখে চাপা দিলো–যেন বাইরে থেকে কেউ বুঝতে না পারে।
