বনহুর উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে–তাকে হয়তো সহজে হত্যা করবে না, জংলী রাণীর নজর তার উপরে পতিত হয়েছে, তার সৌন্দর্য জংলী রাণীকেও আকৃষ্ট করেছে কিন্তু আশঙ্কা সাপুড়ে সর্দার, কেশব আর নূরীর জন্য। জংলীরা যদি ওদের হত্যা করে বসে–
বনহুরের চিন্তাজালে বাধা পড়ে, জংলী রাণী বনহুরের কন্ঠ তার বাহু দুটি দিয়ে বেষ্টন করে ধরেছে। একি! জংলী রাণীর ওষ্ঠদ্বয় তার গন্ড স্পর্শ করেছে। কি তীব্র উষ্ণময় সে ওষ্ঠদ্বয়!
বনহুর মুহূর্তে জংলী রাণীর বাহুবন্ধন থেকে নিজকে মুক্ত করে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। কঠিন বিরক্তি ভাব ফুটে উঠলো তার চোখেমুখে।
বনহুরের আচরণে জংলী রাণী ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠলো। ক্রুদ্ধ নাগিনীর মত জ্বলে উঠলো আর কালো চোখ দুটো। সেকি জ্বালাময় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চোখ দুটো দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে। অধর। দংশন করে জংলী রাণী।
বনহুর তাকালো জংলী রাণীর মুখের দিকে।
দৃষ্টির সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো বনহুর। .
আতঙ্কিত হলো–জংলী রাণীর মুখোভাব সাংঘাতিক হয়ে উঠেছে। এখন কি করা তার কর্তব্য। সাপুড়ে সর্দার কেশব আর নূরীকে বাঁচাতে হবে নিজকেও বাঁচতে হবে। দ্রুত চিন্তা করতে লাগলো বনহুর। এই মুহূর্তেই হয়তো জংলী রাণী করতালি দিয়ে তার অনুচরগণকে এনে বসবে, হয়তো বা তাকে পুনরায় বন্দী করে নিয়ে যাবে সেই মঞ্চের সম্মুখে। বেঁধে ফেলবে সেই কাষ্ঠ খুঁটির সঙ্গে তারপর হত্যা করবে বল্লম দিয়ে এক একজন করে। বনহুর মৃত্যুর জন্য ভীত নয় কিন্তু এতোগুলো প্রাণ বিনষ্ট হবে! না না, জংলী রাণীকে এভাবে ক্রোধান্ধ করা চলবে না। তাকে খুশি করে তবেই কার্যোদ্ধার করতে হবে। কিন্তু কি করে তা সম্ভব! বনহুর পুনরায় তাকায় জংলী রাণীর দিকে।
জংলী রাণী তখন ক্রুদ্ধভাবে অধর দংশন করে চলেছে। সেকি রুদ্র মূর্তি! এত বিপদেও বনহুরের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠলো। এবার সে মন স্থির করে নিলো, বাড়িয়ে দিলো দক্ষিণ হাতখানা জংলী রাণীর সম্মুখে।
বনহুর জানতো তার কথা জংলী রাণী বুঝতে পারবে না। সে লক্ষ্য করেছে এদের সন্ধি স্থাপনের কায়দা তাই বনহুর তার দক্ষিণ হাত প্রশস্ত করে দিলো জংলী রাণীর সম্মুখে।
সঙ্গে সঙ্গে জংলী রাণীর মুখমন্ডল খুশিতে উচ্ছল হয়ে উঠলো। হাসির ছটা দেখা দিলো তার মুখে! বনহুরের হাতের উপর হাত রাখলো জংলী রাণী।
বনহুর জংলী রাণীর হস্তপৃষ্ঠে চুম্বন করলো।
*
সন্তর্পণে বনহুর উঠে দাঁড়ালো। তাকিয়ে দেখলো জংলী রাণী নিদ্রার কোলে ঢলে পড়েছে। মশালের আলোগুলো স্তিমিত হয়ে এসেছে। নিভু নিভু মশালের আলোতে জংলী রাণীর কণ্ঠের। উজ্জ্বল রত্নাভরণগুলো থেকে আলোকচ্ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছিলো।
জংলী রাণীর পরিয়ে দেওয়া কয়েক গাছা রত্নহার এখনও বনহুরের গলায় দুলছে। বনহুর নিজের কণ্ঠের দিকে তাকিয়ে দেখে নিলো তারপর তাকালো একবার জংলী রাণীর দিকে। আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে দ্রুত সুড়ঙ্গ মুখের দিকে অগ্রসর হলো।
প্রথম দ্বারে দু’জন জংলী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমুচ্ছিলো। বনহুর আস্তে এসে দাঁড়ালো তাদের পাশে। একসঙ্গে দু’জনার গলা দু’হাতের মধ্যে চেপে ধরলো। চাপ দিতে লাগলো দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে।
বনহুরের বলিষ্ঠ বাহুর কঠিন চাপে অল্পক্ষণেই অবশ হয়ে এলো জংলীদ্বয়ের দেহ। ভূতলে লুটিয়ে পড়লো জংলীদ্বয়। বনহুর এবার আরো দ্রুত চলতে লাগলো।
একটি দ্বার পেরিয়েছে সে।
দ্বিতীয় দ্বার।
এখানে বনহুরকে একটু বেগ পেতে হলো। কারণ পাহারারত জংলীদ্বয় পায়চারী করছিলো। তারা তাদের জংলী রাণীকে সজাগভাবে পাহারা দিয়ে থাকে।
মশালের আলোতে জংলীদ্বয়ের হস্তের বর্শাফলা ঝক্ মক্ করে উঠছে।
বনহুর সুড়ঙ্গ পথের আড়ালে আত্মগোপন করে দাঁড়ালো। যেমন তার সম্মুখে একজন জংলী অন্যমনস্কভাবে পায়চারী করতে করতে এসে পড়লো অমনি বাম হস্তে টেনে নিয়ে দক্ষিণ হস্তে গলা টিপে ধরলো।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড– জংলীটা মুখ বিকৃত করে ভূতলশায়ী হলো। লোকটার মুখ থেকে একটা গোঙ্গানীর মত শব্দ বেরিয়ে এসেছিলো।
শব্দ শোনা মাত্র দ্বিতীয়জন দ্রুত এগিয়ে এলো।
অমনি বনহুর আড়ালে লুকিয়ে পড়লো।
যেমন জংলীটা তার সঙ্গীর পাশে ঝুঁকে দেখতে গিয়েছে অমনি বনহুর তাকেও পূর্বজনের মত এটে ধরলো। সুড়ঙ্গ মধ্যে চীৎ করে ফেলে বুকের উপর চেপে বসে টিপে ধরলো ওর গলাটা। একটা গোঙ্গানীর মত শব্দ হলো, পরক্ষণেই জিভটা বেরিয়ে এলো এক পাশে। সমস্ত শক্তি দিয়ে। চাপ দিলো বনহুর।
আর নড়ছে না জংলীটা।
বনহুর বুঝতে পারলো–এরও মৃত্যু ঘটেছে। উঠে দাঁড়ালো এবার বনহুর। আরও একটা দরজা পেরুতে হবে তাকে। সেখানেও আছে দু’জন বল্লমধারী জংলী। তাদের কাবু করে তবেই বের হতে হবে বাইরে পৃথিবীর আলোতে।
বনহুর অতিদ্রুত এবার সুড়ঙ্গ মুখের দিকে অগ্রসর হলো। এবার সে তার নিজের কোমরের ছোরখানা মুক্ত করে নিলো।
খোদাকে ধন্যবাদ দিলো বনহুর কারণ এখনও তার কাছে রিভলভার এবং সূতীক্ষ-ধার ছোরাটা। রয়েছে। অবশ্য সভ্য সমাজের শ্রেষ্ঠ জীবগুলোর হস্তে যদি বন্দী হতো তাহলে সর্বপ্রথম তার নিকট হতে অস্ত্র কেড়ে নিতো তারা। জংলীরা নৃশংস বটে কিন্তু সুচতুর নয় এবং সেই কারণেই এখনও তাদের সঙ্গের সব কিছু সঙ্গেই রয়েছে।
