বনহুর মনে মনে ক্ষুব্ধ হলেও স্থির হয়ে বসে রইলো। একবার তাকালো সে পাশের জংলী রাণীর দিকে। জংলী রাণীকে খুশি করে তবে ওদের মুক্তি সাধন করতে পারে। নূরী কিছু বোঝে না–এখন নিজকে শক্ত করে নিতে হবে। যেমন করে হোক এদের কবল থেকে মুক্তি চাই।
জমকালো ভয়ঙ্কর চেহারার জংলী সর্দারের পাশে বনহুরকে রাজ কুমারের মতই লাগছিলো। যেন যমদূতের পাশে ফেরেস্তা। বনহুরের গলায় জংলী রাণীর দেওয়া হীরকখন্ডটা থেকে আলোকচ্ছটার মত একটা নীলাভ দ্যুতি বেরিয়ে আসছিলো।
জংলী সর্দার এবার উচ্চারণ করলো–জুপি টং জো হুম হুয়াম।
জংলী রাণী উঠে বনহুরের সম্মুখে হাত বাড়ালো।
বনহুর কি করবে ভেবে পায় না, সে জড়গ্রস্তের মত উঠে জংলী রাণীর হাতের উপর হাত রাখলো।
জংলী রাণী বনহুরের হস্তের পিঠে চুম্বন করলো।
আবার শুরু হলো ঢাকের আওয়াজ।
তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচতে লাগলো সমস্ত জংলী নারী-পুরুষ।
এ যেন এক মহা প্রলয় নাচ।
আনন্দে জংলী দল যেন মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে।
নূরী সাপুড়ে সর্দারকে জিজ্ঞাসা করলো বাবা, ওরা কি জন্য এমন করছে।
বললো সাপুড়ে সর্দার–বাবুজীর সাথী রাণীজীর বিয়া হবে, তাই উরা খুশি হইয়াছে।
নূরী যেন আর্তনাদ করে উঠলো–জংলী রাণীর সঙ্গে বাবুজীর বিয়ে!
হাঁ ফুল। বাবুজীর সাথী জংলীর বিয়া হলি হয়তো আমরা প্রাণে বাচতি পারি।
চাই না বাঁচতে বাবা, ওকে আমি জংলী রাণীর হাতে দেবো না বাবা, আমার বাঁধন খুলে দাও বাবা। খুলে দাও আমার বাঁধন–
নূরীর কণ্ঠ তলিয়ে যায় ঢাকের আওয়াজের তলায়।
কিছুসংখ্যক জংলী নারী বনফুল নিয়ে ঘিরে ধরে বনহুর আর জংলী রাণীকে, কতকগুলো ফুল ছড়িয়ে দেয় জংলী রাণী আর বনহুরের মাথায়।
এবার নিয়ে যায় জংলী নারীগণ বনহুর আর জংলী রাণীকে মঞ্চের উপর থেকে নামিয়ে।
জংলী রাণীর হাতের মুঠায় তখন বনহুরের দক্ষিণ হাতখানা ধরা রয়েছে।
জংলী রাণীর সঙ্গে বনহুর চলে যায়।
নূরীর চোখের সম্মুখে নেমে আসে জমাট অন্ধকার। সহ্য করতে পারে না নূরী এই দৃশ্য, ঢলে পড়ে সে কাঠের খুঁটির সঙ্গে।
সাপুড়ে সর্দার লক্ষ্য করে নূরী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সে অত্যন্ত ভড়কে যায় কিন্তু কি উপায় আছে–তার হাত-পা সব যে খুঁটির সঙ্গে মজবুত করে বাঁধা।
জংলী সর্দার এবার হাত তুলে বলে–চুল্লং চুল্লি হুম।
অমনি ড্রাম ভর্তি কিছু তরল পদার্থ নিয়ে আসে জংলী দল।
জংলী সর্দার মাটির পাত্র ভর্তি করে পান করতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে অন্য জংলিগণ শুরু করে পান করা।
ঢাক বাজছে।
তার সঙ্গে চলেছে নাচ আর বিকট সুরে অদ্ভুত গান।
কিছুক্ষণ এভাবে নাচ-গান চলে, তারপর দেখা যায় সবগুলো জংলী ভূতলে শুয়ে নাক। ডাকাচ্ছে।
মঞ্চের উপরে চিৎ হয়ে পড়ে আছে জংলী সর্দার। মনে হচ্ছে যেন হস্তীশাবক ঘুমিয়ে পড়েছে।
ওদিকে জংলী রাণী পূর্বদিনের সেই কক্ষে নিয়ে এলো বনহুরকে। জংলী নারীগণ শুধু দরজা পর্যন্তই এগিয়ে দিয়েছে। কাষ্ঠ ফটকের ওপাশে কারো প্রবেশ চলে না।
বনহুরকে জংলী রাণী পূর্বদিনের সেই কক্ষে নিয়ে এসে দাঁড়ালো। আজও পূর্বদিনের মত কিছু ফল তার সম্মুখে বাড়িয়ে ধরলো।
বনহুর দু’একটা ফল ভক্ষণ করলো।
বনহুর যখন ফল খাচ্ছিলো তখন জংলী রাণী স্থির নয়নে তাকিয়ে দেখছিলো বনহুরকে।
খাওয়া শেষ হলে বনহুরের সম্মুখে একটি তাজা রক্ত ভরা বাটি বাড়িয়ে ধরলো।
বনহুর মাথা নেড়ে বললো ও সব সে খায় না।
জংলী রাণী বনহুরের মাথার চুলে, গালে, মুখে হাত বুলিয়ে দেখতে লাগলো। দিনের আলো হলেও ভিতরটি বড় অন্ধকার ছিলো, কাজেই গুহার মধ্যে দপ দপ করে মশাল জ্বলছিলো তখনও।
জংলী রাণী বনহুরের কানের বালা আর হাতের বালা দেখিয়ে কি যেন বললো বুঝতে পারলো না বনহুর, তবু মাথা দোলালো।
হাসলো জংলী রাণী।
এবার বনহুর জংলী রাণীর দেওয়া তার গলার হীরকখন্ডটা দেখিয়ে বললো–এগুলো তোমরা কোথায় পেয়েছো জংলী রাণী?
জংলী রাণী বনহুরের কথার জবাব না দিয়ে শুধু হাসলো, কারণ সে বনহুরের কথা কিছুমাত্র বুঝতে পারেনি।
বনহুর এবার জংলী রাণীর গলার উজ্জ্বল হীরক হার দেখিয়ে বললো–এগুলো কোথায় পেয়েছো?
জংলী রাণী মনে করলো, ওগুলো বুঝি সে তার কাছে চায়। তাই সে নিজের সমস্ত হার, মালা হাতের বালা খুলে বনহুরের গলায় হাতে পরিয়ে দিতে লাগলো।
বনহুর তো হকচকিয়ে গেলো, সে বিভ্রাটে পড়লো। বার বার বললো –না না, ওসব আমি চাই না। নেবো না আমি। তুমি কোথায় পেয়েছে তাই জিজ্ঞেস করছিলাম?
জংলীরাণী তেমনি পূর্বের ন্যায় হাসলো। কারণ সে বনহুরের কথার একবর্ণও বুঝতে পারছিলো না।
বনহুর কিন্তু অত্যন্ত বিরক্তি বোধ করছিলো জংলীরাণী তার কথা বুঝতে না পারায় অসহ্য লাগছিলো তার। বনহুর তার গলা থেকে সব আবার খুলে পরিয়ে দিলো জংলীরাণীর গলায়।
জংলী রাণী তখন বনহুরের মুখোভাব লক্ষ্য করে ঘাবড়ে গেলো।
বুঝতে পারলো বনহুর রাগ করেছে। তাই নিজের হার-মালাগুলো পুনরায় খুলে বনহুরের কণ্ঠে পরিয়ে দিয়ে হাসতে লাগলো।
বনহুর নিরূপায়–কিছু বুঝাতে পারে না জংলী রাণীকে সে। বিপদে পড়লো বনহুর, কিভাবে এর হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়। জংলী রাণীকে কাবু করা তার পক্ষে সামান্য ব্যাপার। কিন্তু জংলী রাণীর যে অসংখ্য অনুচর আছে তাদের কবল থেকে উদ্ধার পাওয়া মুশকিল। তারা শুধু ভয়ঙ্করই নয়–দুর্দান্ত নরখাদক।
