বনহুরকে দেখামাত্র নূরী তার দিকে ছুটে যাবার জন্য পা বাড়াতেই জংলীরা তাকে ধরে ফেললো।
সর্দার আর কেশবকেও ধরে রেখেছে কয়েকজন জংলী।
বনহুরের হাত দুখানা মোটা লতা দিয়ে পিছমোড়া করে বাঁধা রয়েছে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বনহুর।
সর্দার, কেশব আর নুরীর হাতও বেঁধে এনেছে জংলীরা।
তাদের চারপাশ ঘিরে কতকগুলো জংলী ঢাক বাজিয়ে চলেছে।
হঠাৎ জংলী সর্দার দক্ষিণ হাত উঁচু করে উঠে দাঁড়ালো।
সঙ্গে সঙ্গে ঢাকের আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেলো।
জংলী দল সমস্ত দেহ নুইয়ে অভিবাদন করলো।
এবার জংলী সর্দার এক রকম অদ্ভুত শব্দ করে উঠলো– হুংহো হুয়াই হু লং লো।
অমনি জংলী দল এক একটা মোটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে এক এক জনকে বেঁধে ফেললো মজবুত করে।
সারিবদ্ধভাবে কতকগুলো গাছের গুঁড়ি মাটিতে পোতা রয়েছে।
এক একটা গুঁড়ির সঙ্গে এক একজনকে পিছমোড়া করে বাঁধলো।
বনহুরকে মাঝের মোটা খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে নিলো।
এবার এক মর্মান্তিক দৃশ্য শুরু হলো।
প্রত্যেকটা খুঁটির পাশে চারজন করে জংলী বর্শা উদ্যত করে দাঁড়ালো।
এবার তাদের সম্মুখে একটা অগ্নিকুন্ড জ্বেলে দেওয়া হলো।
দাউ দাউ করে অগ্নিকুন্ডটা জ্বলে উঠলো। গহন জঙ্গলের মধ্যে শুরু হলো এক মহা প্রলয় নৃত্য। ঢাকের তালে তালে কতকগুলো জংলী নারী-পুরুষ নৃত্য শুরু করলো। যেন হস্তিশাবকগণ দুলে দুলে নৃত্য করছে।
জংলী সর্দার এবার আর একটা শব্দ করলো–হুম্ হুয়া হুই হুই…
অমনি নাচ বন্ধ হলো।
জংলী সর্দার একটা শব্দ করলো–চুংচিও হুম হুয়াম্।
তৎক্ষণাৎ কয়েকজন জংলী বর্শা উদ্যত করে দাঁড়ালো।
আর এক মুহূর্ত–এবার নিহত হবে বনহুরের দল।
সেই দন্ডে জংলী রাণী জংলী সর্দারকে লক্ষ্য করে বললো–ভূঁই হু হুম নং হুম…শব্দটা বড় করুণ শোনালো জংলী রাণীর কণ্ঠে। সে আংগুল দিয়ে বনহুরকে দেখালো।
জংলী সর্দার তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো বনহুরের দিকে। ক্রুদ্ধভাবে গর্জন করে। উঠলো–নুয়ং হুম হুই নো কুম্ কুম্।
জংলী রাণী ভীমকায় জংলী সর্দারের পায়ে উবু হয়ে পা জড়িয়ে ধরলো–উঁই হু পিও হুম্ হুম্ নং ননা কুম্।
পূর্বের ন্যায় গর্জে উঠলো জংলী সর্দার–নো নো কুম কুম হুই হুম—
এবার জংলী রাণী মাথার মুকুট খুলে রাখলো জংলী সর্দারের পায়ের কাছে।
সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত জংলী হাতের অস্ত্র মাটিতে নামিয়ে রাখলো।
নত মস্তকে দাঁড়ালো সবাই।
সেকি এক নীরব নিস্তব্ধতা।
মৃত্যু মুহর্তেও বনহুর, কেশব, সর্দার আর নূরীর চোখে বিস্ময় ঝরে পড়েছে। সবাই স্তব্ধ হয়ে দেখছে জংলীদের কার্যকলাপ।
এততক্ষণ তাদের মৃতদেহ কাঠের খুঁটির সঙ্গে ঝুলে পড়তো, যদি না জংলী রাণী বাধা দিতো।
অগ্নিকুন্ডটা আরও ভীষণ আকার ধারণ করেছে। অগ্নিকুন্ডের লেলিহান শিখার তীব্র তাপ এসে লাগছে তাদের দেহে।
মৃত্যু অনিবার্য জেনে কারো মুখে কোনো কথা নেই।
নূরীর চোখে অশ্রু শুকিয়ে গেছে।
সাঁ সাঁ করে বাতাস বইছে।
দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।
মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছে কয়েকটা প্রাণী।
এখানে জংলিগণ যেমন অস্ত্র মাটিতে নামিয়ে রাখলো অমনি জংলী সর্দার হাত তুলে বললো– ফুলোই হুম, নাংলো ফুং।
অমনি জংলী রাণী উঠে দাঁড়ালো, মুখমন্ডল দীপ্ত উজ্জল হয়েছে, খুশি হয়েছে বলে মনে হলো।
জংলী সর্দার বললো আবার–লাংলো লুই হুম…
জংলী রাণী আসন গ্রহণ করলো।
সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত জংলিগণ ভূতল হতে অস্ত্র হাতে উঠিয়ে নিলো।
জংলী সর্দার ইংগিৎ করলো, হাত তুলে দেখালো বনহুরকে।
অমনি দুইজন জংলী বনহুরের দিকে এগিয়ে গেলো। সবাই বিস্ময় ভরা দৃষ্টি নিয়ে জংলীদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করছে। দুইজন জংলী বনহুরের দিকে এগুতেই নূরী আর্তনাদ করে উঠলো– হুর, হুর, ওদের সঙ্গে যেও না হুর!
বনহুর এবার ফিরে তাকালো নূরীর দিকে, কোনো কথা সে বললো না।
সাপুড়ে সর্দার বললো–ওরা বাবুজিকে খুন কইরিবে না মা ফুল। তুই কাদিস না।
ততক্ষণে বনহুরের বন্ধন উন্মোচন করে দিয়েছে জংলীদ্বয়। এবার বনহুরকে নিয়ে ওরা মঞ্চের উপরে উঠে গেলো।
নূরী আর্তনাদ করে কাঁদছে–হুর, তুমি যেও না।
হুর……যেও না ……
বনহুর এসে জংলী সর্দারের সম্মুখে দাঁড়ালো।
জংলী সর্দার হাতখানা বাড়িয়ে দিলো বনহুরের সম্মুখে।
বনহুর বুঝতে পারলো–তার সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করতে চায় জংলী সর্দার। বনহুর হাত রাখলো জংলী সর্দারের হাতের উপর।
এবার জংলী সর্দার বনহুরের হাতের পিঠে চুম্বন করলো। ঠিক পূর্বদিন রাতে জংলী রাণী যেভাবে তার হস্তপৃষ্ঠে চুম্বন করেছিলো।
সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো আবার ঢাকের আওয়াজ।
বনহুরকে জংলী সর্দার তার পাশের আসনে বসার জন্য ইংগিত করলো।
বনহুর আসন গ্রহণ করলো।
জংলী রাণী তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে, দু’চোখে তার আনন্দের দ্যুতি খেলা করছে।
দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকালো বনহুর মঞ্চের নিচে যেখানে কাষ্ঠ গুঁড়ির সঙ্গে পিছমোড়া করে বাঁধা আছে সাপুড়ে সর্দার, কেশব আর নূরী।
নূরী রোদন করছে অবিরত।
বনহুরের প্রাণ বিচলিত হলো, বিশেষ করে নূরীর চোখের পানি তার মনে অস্বস্তি এনে দিচ্ছিলো। বনহুর জংলীদের ভাষা বুঝতেও পারছে না বা বলতেও পারছে না। তবু জংলী সর্দারকে লক্ষ্য করে বনহুর ইংগিৎ করলো ওদের মুক্ত করে দিতে।
কিন্তু জংলী সর্দার মাথা দুলালো–মুক্তি তাদের দেবে না।
