স্মিত হেসে বললো বনহুর–জংলী রাণীর উপহার।
রুদ্ধ কণ্ঠে বললো নূরী–জংলী রাণী?
হাঁ, যাকে প্রথম আমরা ঐ মঞ্চের উপর দেখেছিলাম।
কি সর্বনাশ! ঐ জংলী রাণী তোমাকে–না না, ওটা তুমি ফিরিয়ে দিয়ে এসো হুর, ওটা তুমি ফিরিয়ে দিয়ে এসো।
নূরী, এটা ফিরিয়ে দিলে হয়তো জীবন দিতে হবে। থাক না ক্ষতি কি? তাছাড়া জানো এটা মূল্যবান হীরক।
চাই না হীরক। এটা দিয়ে তোমাকে কেড়ে নেবে আমার কাছ থেকে। নূরী বনহুরের বুকে মাথা রেখে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো।
বনহুর নূরীর চিবুক ধরে উঁচু করে বললো–নূরী, আমাদের এতোগুলো জীবনের পরিবর্তে জংলী রাণীর কাছে আত্মসমর্পণ করাই কি উচিৎ নয়?
না, আমি তা চাই না। মৃত্যু আমার কাছে অনেক ভাল তোমাকে হারানোর চেয়ে।
আমি যদি রাণীকে তার উপহার ফিরিয়ে দেই তার পরিণতি কি জানো?
জানি মরতে হবে।
শুধু আমাকে নয়, তোমাকেও ওরা হত্যা করবে আর ঐ ওদের দু’জনাকে। দুটো নিরীহ প্রাণ আমাদের জন্য বিনষ্ট হবে।
নূরী তাকালো–অসহায় করুণ চোখে তাকিয়ে আছে কেশব আর সাপুড়ে সর্দার তাদের দিকে। চোখে মুখে ভীত ভাব। মুখ ফ্যাকাশে বিবর্ণ হয়ে উঠেছে।
বললো বনহুর–নূরী, জংলীরা কত বড় ভয়ঙ্কর তা আমি একটু পূর্বেই বুঝতে পেরেছি। ওরা আমাকে তাজা রক্ত এনে দিয়েছিলো পান করার জন্য।
নূরী কোনো কথা বললো না নীরবে রোদন করে চললো। পুব আকাশ দৃষ্টিগোচর হলেও বোঝা গেলো রাত ভোর হয়ে আসছে। বন্য মোরগ দলের কণ্ঠ ভেসে আসছে দূর দূরান্ত থেকে। পাখিরা সব বৃক্ষ শাখায় কলরব শুরু করেছে।
বনহুরের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে নূরী।
সাপুড়ে সর্দার আর কেশব কাঠের খুঁটিতে ঠেশ দিয়ে নাক ডাকাচ্ছে।
বনহুরের চোখেও নিদ্রা জড়িয়ে আসছে। ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে সেও কাঠের খুঁটিতে ঠেশ দিয়ে।
*
মাসুমা, আমার মন বলছে সে কোনো বিপদে পড়েছে। আমি যে বড় অস্থির বোধ করছি। ভাই। মনিরা প্রায় কাঁদো কাঁদো কন্ঠে কথাটি বললো।
মাসুমা হাসার চেষ্টা করে বললো–ছিঃ অযথা মন খারাপ করা উচিৎ নয়, তাছাড়া তোর স্বামী। তো আর ছোট্ট ছেলে নয়। তাঁর চেহারা দেখেই মনে হয় অসীম শক্তিবান তিনি। সত্যি মনিরা তোর স্বামী ভাগ্য বলতে হবে।
কিন্তু ভাগ্য হলে কি হয় বল্ তাকে তো ধরে রাখতে পারলাম না কোনোদিন। ওকে ভালবেসে চিরদিন আমার চোখের পানি শুকালো না মাসুমা। আর যে আমি পারছি না সহ্য করতে।
কি করবি সহ্য না করে কি উপায় আছে! যেমন গেছেন তেমনি আবার হঠাৎ একদিন এসে হাজির হবেন।
আর যদি তার কোনো অমঙ্গল ঘটে থাকে?
ও সব চিন্তা করতে নেই বোন। নিশ্চয়ই তিনি ভাল আছেন। আবার ফিরে আসবেন।
মনিরা মাসুমার সান্ত্বনায় আশ্বস্ত হতে পারে না। কে যেন তার মনের গহনে ডেকে বলছে তোমার স্বামীর অমঙ্গল ঘটেছে। তার সম্মুখে ভয়ঙ্কর বিপদ।
মনিরার চোখের অশ্রুতে বসন সিক্ত হয়।
মাসুমা চিন্তিত হলো। কদিন সে এমনি সান্ত্বনা বাক্যে ওকে ভুলিয়ে রাখবে।
হাশেম চৌধুরীও ভয়ঙ্কর ভাবনায় পড়লেন। মনিরা সব সময় বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুধু রোদন। করছে। নাওয়া-খাওয়া প্রায় ছেড়ে দিলো সে। এমনি করে ক’দিন বাঁচতে পারে মানুষ।
বনহুরের জন্য শুধু মনিরাই নয়, নূরীর অবস্থাও তাই হয়েছে। নূরী কাঁদছে বনে জংলীদের বন্দীশালায় বসে; আর মনিরা কাঁদছে দিল্লী নগরীর বুকে। মনিরা স্বামীর বিরহে উন্মাদিনী আর নূরীর প্রিয়কে হারানোর আশঙ্কা।
জংলী রাণীর নজরে পড়েছে বনহুর।
ভোর হতেই ঢাকের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো নূরীর। সাপুড়ে সর্দার কেশব আর বনহুরও জেগে উঠেছে। সবাই বিস্ময়ভরা নয়নে দেখলো–বন্দীশালার বাইরে কয়েকজন জংলী বর্শা হস্তে দন্ডায়মান। আর দুইজন প্রবেশ করেছে বন্দী শালার ভিতরে।
অদ্ভুত শব্দ করে উঠলো বন্দীশালার ভিতরে প্রবেশকারী জংলীদ্বয় ইংগিৎ করলো উঠবার জন্য। বনহুরকে।
বনহুর উঠতে যাচ্ছিলো, নূরী বনহুরের হাত চেপে ধরলো। না না, ওকে তোমরা নিয়ে যেও না, ওকে তোমরা নিয়ে যেও না কিন্তু নূরীর কোনো বাধাই শুনলো না জংলীদ্বয়, বনহুরকে টানতে টানতে বের করে নিয়ে চললো।
নূরী আকুলভাবে কেঁদে উঠলো।
সর্দার আর কেশবের চোখও শুষ্ক ছিলো না।
পর-পর আবার কয়েকজন জংলী এসে নূরী, কেশব আর সাপুড়ে সর্দারকেও বেঁধে নিয়ে চললো।
ঢাকের আওয়াজ গুরুগম্ভীরভাবে বেজে চলেছে। তার সঙ্গে শোনা যাচ্ছে জংলীদের অবিশ্রান্ত কলধ্বনি।
নূরী সর্দার এবং কেশব মঞ্চের নিকট পৌঁছলো। ওরা দেখলো–সুউচ্চ কাষ্ঠমঞ্চের উপরে উপবিষ্টা জংলী রাণী, পাশে আজ আর একটি অদ্ভুত জংলী বসে আছে। ঠিক জংলীহস্তীর মত তার চেহারা। জমকালো গায়ের রং মাথায় সজারু কাঁটার মত খাড়া খাড়া চুল। চোখ দুটো দেহের আকারে অনেক ছোট আর লাল। সমস্ত দেহে সাদা রং এর চিত্র আঁকা।
জংলী রাণীর ঠিক দক্ষিণ পাশে বসেছিলো ভীমকায় জংলীটা।
অল্পক্ষণেই বুঝতে পারলো নূরী-জংলী রাণীর পিতা ঐ জংলী। হয়তো জংলী সর্দার হবে। আজ জংলী রাণীর মাথায় পাখীর পালকের মুকুট শোভা পাচ্ছে। মুকুটের মাঝখানে একটা হীরক খন্ড জ্বলজ্বল করে জ্বলছে।
নূরী, কেশব আর সর্দারকে নিয়ে যেতেই জংলী সর্দার রক্ত চক্ষু বিস্ফারিত করে তাকালো। তীক্ষ্ণ নজরে দেখতে লাগলো সে।
বনহুরকেও কয়েকজন জংলী ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেক জংলীর হস্তে এক একটা সূতীক্ষ ধার বর্শা।
