কিছুটা পথ অগ্রসর হতেই আর একটা দরজার মুখ পাওয়া গেলো। কাঠের তৈরি দরজার মুখে দু’জন জংলী বল্লম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতেও এক একটা চোং রয়েছে।
বনহুরকে নিয়ে জংলীদ্বয় দরজা মুখে পৌঁছতেই প্রথম সুড়ঙ্গ মুখের জংলীদ্বয়ের মত চোংগে ফুঁ দিলো সঙ্গে সঙ্গে দরজার মুখ খুলে গেলো।
বনহুর আর জংলীদ্বয় প্রবেশ করলো ভিতরে।
আর একটি সুড়ঙ্গমুখ পেরিয়ে তবে বনহুরকে নিয়ে জংলীদ্বয় হাজির হলো একটা গুহার মধ্যে।
গুহাটা খুব বড় এবং পাথর দিয়ে তৈরি।
গুহার চার কোণে চারটা মশাল দপ দপ করে জ্বলছে।
বনহুর তাকালো সম্মুখে, বিস্ময় বিস্ফারিত নয়নে দেখলো–সেই যুবতী নারীমূর্তি একটা। আসনে উপবিষ্টা। তার পাশে কয়েজন জংলী বল্লম হস্তে দন্ডায়মান রয়েছে।
বনহুর নারীমূর্তির দিকে স্থির দৃষ্টি মেলে তাকালো। মশালের উজ্জ্বল আলোতে তার শরীরের পাথরখন্ডগুলো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। তীব্র আলোকচ্ছটা যেন ঠিকরে বের হচ্ছে ঐ সব রত্নাভরণ থেকে।
নারীমূর্তি বনহুরের দিকে নিশ্চলভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উঠে দাঁড়ালো। হাত দিয়ে ইংগিৎ করলো সঙ্গে সঙ্গে তার পাশে দন্ডায়মান জংলীগুলো গুহা থেকে বেরিয়ে চলে গেলো। বনহুরের সঙ্গী জংলীদ্বয়ও বেরিয়ে গেলো তাদের সঙ্গে।
বনহুর সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
তার দেহে এখনও সাপুড়ে ড্রেস বর্তমান। কানে বালা, হাতে বালা রয়েছে। গায়ের জামাটা অবশ্য কয়েক স্থানে ছিঁড়ে গেছে। কুমীরের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে জামাটার এ অবস্থা হয়েছে। হাতে এবং বুকের ক্ষতে এখনও পট্টি বাঁধা রয়েছে যদিও তবু বনহুরকে এ ড্রেসে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিলো।
দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ পুরুষ বনহুরের সৌন্দর্যে অভিভূতা জংলী রাণী। সভ্য সমাজের মানুষ বুঝি সে কোনোদিন দেখেনি।
আসন ত্যাগ করে জংলী রাণী উঠে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো বনহুরের সম্মুখে।
বনহুর নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে দেখছে।
জংলী রাণী বনহুরের সম্মুখে দাঁড়িয়ে তার দক্ষিণ হাতখানা এগিয়ে দিলো।
বনহুর কিছু বুঝতে না পারলেও সে তার দক্ষিণ হাতখানা জংলী রাণীর দক্ষিণ হাতের উপর রাখলো।
জংলী রাণীর চোখ দুটো যেন মুহূর্তে আনন্দ-উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। ঠোঁট দুটির ফাঁকে ফুটে উঠলো হাসির রেখা। বনহুরের হাতের উপর মুখ রেখে চুম্বন করলো গভীর আবেগে।
বনহুর বিস্মিত হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
জংলী রাণী এবার বনহুরকে হাত ধরে নিয়ে চললো। বনহুর কোনো আপত্তি না করে অগ্রসর হলো তার সঙ্গে। জংলী রাণী এবার বনহুরকে বসিয়ে দিলো তার নিজের আসনে।
বনহুর বুঝতে পারলো এ যাত্রা প্রাণ রক্ষা পেলো তার। নিজের দেহের দিকে তাকালো। বনহুর–অসংখ্য ধন্যবাদ দিলো সে খোদাতায়ালাকে। ভাগ্যিস কার্পণ্যহীনভাবে তার দেহে তিনি সৌন্দর্যের বিকাশ করেছিলেন তাই মরণ ছোবল থেকে তার প্রাণ রক্ষা পেলো আজ। শুধু আজ নয়, এমনি আরও কতবার সে জীবন রক্ষা পেয়েছে।
জংলী রাণী ওপাশ থেকে একটা ঝুড়ি হাতে তুলে নিয়ে এগিয়ে এলো বনহুরের সম্মুখে বাড়িয়ে। ধরলো।
বনহুর দেখলো ঝুড়িটার মধ্যে অনেকগুলো নাম না-জানা অদ্ভুত ধরনের ফল রয়েছে। বনহুর একটা ফল হাতে তুলে নিলো।
জংলী রাণী খুশি হলো বনহুরের আচরণে।
বনহুর ফলটা ভক্ষণ করতে লাগলো।
অত্যন্ত সুস্বাদু ফল, বনহুর সমস্ত ফলটা খেয়ে ফেললো।
জংলী রাণী এবার বনহুরের সম্মুখে একটা মাটির পাত্র উঁচু করে ধরলো।
চমকে উঠলো বনহুর মাটির পাত্রটা নিয়ে পাশে নামিয়ে রাখলো। দস্যু সে, কিন্তু রক্তপিপাসু নয়। বনহুর উঠে দাঁড়ালো এবার।
জংলী রানী পুনরায় বনহুরের দক্ষিণ হাতখানা উঁচু করে ধরলো, তারপর এগিয়ে চললো তাকে নিয়ে।
এবার অন্য একটা পথ ধরে অগ্রসর হলো জংলী রাণী। যাবার সময় একটা মশাল সে হাতে তুলে নিয়েছিলো। কিছুটা অগ্রসর হতেই দেখলো বনহুর সম্মুখে বন্ধ দরজা। রাণীকে দেখেই দরজা মুক্ত করে দিলো দু’জন জংলী। তারপর পথ ছেড়ে সরে দাঁড়ালো।
জংলী রাণী বনহুরকে নিয়ে একটা কক্ষমত জায়গায় এসে দাঁড়ালো। তারপর নিজের কণ্ঠ থেকে একটা মালার মত লকেট খুলে পরিয়ে দিলো বনহুরের গলায়।
এবার জংলী রাণী করতালি দিলো।
সঙ্গে সঙ্গে পূর্বের সেই মশালধারী জংলী এসে দাঁড়ালো তার পাশে।
জংলী রাণী ইশারা করলো।
বনহুরকে ওরা নিয়ে যাবার জন্যই এসেছে বুঝতে পেরে বনহুর ওদের সঙ্গে অগ্রসর হবার জন্য পা বাড়ালো।
কিন্তু জংলী রাণী পুনরায় বনহুরের দক্ষিণ হস্ত উঁচু করে হাতের পিঠে চুম্বন করলো।
বনহুর নিজের অজ্ঞাতেই একবার তাকালো জংলী রাণীর মুখের দিকে। দেখলো জংলী রাণীর ঠোঁটের কোণে সেই পূর্বের হাসির আভাষ ফুটে উঠেছে।
জংলীদ্বয় বনহুরকে নিয়ে পরপর কয়েকটা দরজা পেরিয়ে আবার ফিরে আসে সেই বন্দীশালায়।
কাঠের মজবুত দরজা খুলে ভিতরে নিয়ে গেলো বনহুরকে। বনহুরের কণ্ঠে তখনও শোভা পাচ্ছে জংলী রাণীর দেওয়া রত্নাভরণ সেই হারখানা।
বনহুরকে দেখতে পেয়ে নূরী ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো তার বুকে হুর ফিরে এসেছো তুমি? হায়, আমি ভেবেছিলাম তোমাকে ওরা নিয়ে গিয়ে হত্যা করে ফেলবে।
বনহুর নূরীর মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে বললো–হত্যা ওরা আমাকে করবে না বলেই মনে হলো।
একি! তোমার গলায় এ হার এলো কোথা হতে হুর? নূরী বনহুরের গলার হারটা উঁচু করে ধরে বিস্ময় ভরা কন্ঠে বললো।
