এবার জংলী দল বনহুরের দলকে ঘেরাও করে নিয়ে ঢাক বাজিয়ে ফিরে চললো।
কেশব তো বনহুর আর নূরীকে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলো।
সর্দারের মুখমন্ডল ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে।
নূরীর গন্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু। বার বার সে করুণ চোখে তাকাচ্ছে সর্দার আর বনহুরের দিকে।
জংলীর দল তাদের নিয়ে এগিয়ে চলেছে।
সম্মুখে একজন জংলী ঢাক বাজিয়ে এগুচ্ছে।
মাঝে মাঝে সবাই একরকম অদ্ভুত শব্দ করছিলো। সেকি ভয়ঙ্কর তীব্র শব্দ! সাধারণ মানুষের কানে এ শব্দ তালা লাগিয়ে দেয়। বনহুরের সাহসী প্রাণেও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে এবার হয়তো তাদের আর রক্ষা নেই। জংলীদের হস্তে মৃত্যু অনিবার্য।
সাপুড়ে সর্দার জংলীদের ভাষা কিছু জানতো সে ঐ ভাষায় অনুনয় বিনয় শুরু করলো, করজোড়ে প্রার্থনা করতে লাগলো কিন্তু কেউ তার কথা শুনলো না।
বনহুর নূরী আর কেশবকে লক্ষ্য করে বললো–অহেতুক রোদন বাতুলতা মাত্র। যতক্ষণ প্রাণ আছে ততক্ষণ ধৈর্য ধারণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
বেশ কিছুদূর অতিক্রম করার পর শুরু হলো আবার জঙ্গল সেই ভয়ঙ্কর গহন বন। মশালের আলোতে জংলীরা পথ দেখে অগ্রসর হচ্ছিলো।
যদিও জংলী দল হই-হুল্লোড় করে এগুচ্ছিলো কিন্তু তাদের সতর্ক দৃষ্টি ছিলো সাপুড়ে সর্দার বনহুর কেশব আর নূরীর উপর — এক মুহূর্তের জন্যও তারা বল্লম নীচু করেনি। কয়েকজন সূতীক্ষ্ণ বল্লম উদ্যত করে ধরে পথ চলছিলো।
প্রায় ঘন্টা দুই অবিরাম চলার পর জঙ্গলের মধ্যে একটা বেদী বা মন্ত্রের মত উঁচু জায়গায় এসে থামলো জংলীর দল।
বনহুর লক্ষ্য করলো, উঁচু জায়গাটা মাটি বা পাথর নয়। কিছু সংখ্যক বড় বড় কাঁটা দিয়ে তৈরী একটা মঞ্চ বনের মাঝখানে উঁচু হয়ে রয়েছে।
এবার জংলী দল বন্দীদের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ঢাক বাজাতে শুরু করলো।
সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চের উপরে কয়েকজন মশালধারী জংলী উঠে গিয়ে দাঁড়ালো। সমস্ত বনভূমি মশালের আলোতে আলোময় হয়ে উঠলো।
হঠাৎ ঢাকের আওয়াজ থেমে গেলো।
বনহুরের দল তাকিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হলো। দেখলো– বেদী বা ঐ মঞ্চটার উপরে এসে দাঁড়িয়েছে এক নারীমূর্তি। সমস্ত দেহ তার উলঙ্গ শুধু মাথায় একটা হরিণের চামড়া জড়ানো চুলগুলো মাথার উপরে উঁচু করে বাঁধা। গলায়, হাতে বাজুতে কতকগুলো পাথরের টুকরো মালার মত করে গাঁথা রয়েছে। এসব পাথরের টুকরো থেকে একরকম আলোকরশ্মি ঠিকরে বেরুচ্ছিলো। কোনোটা লাল, কোনোটা নীল আবার কোনোটা থেকে ফিকে সবুজ আলোকচ্ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছিলো।
মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়েও বনহুরের চোখ দুটো ধক্ করে জ্বলে উঠলো। নারীমূর্তিকে দেখে নয় তার দেহসজ্জিত পাথরখন্ডগুলোর উপর নজর পড়তেই সে বুঝতে পেরেছিলো–ওগুলো মূল্যবান পাথর।
নারীমূর্তি মঞ্চের উপরে এসে দাঁড়ালো।
তীক্ষ্ণ নজরে দেখতে লাগলো বন্দীদের দিকে তাকিয়ে।
সাপুড়ে সর্দার করজোড়ে প্রণাম জানাতে লাগলো।
কেশব আর নূরী আকুলভাবে রোদন করে চলেছে।
বনহুর স্থির দৃষ্টি মেলে তাকালো নারীমূর্তির দিকে। বনহুরের চোখেও যেন আগুন ঝরে পড়ছে। বনহুর দেখলো নারীমূর্তির দুটি চোখ এবার তার উপর এসে সীমাবদ্ধ হয়েছে। জংলী হলেও যুবতীকে সুন্দরী বলা চলে। কালো নিটোল দেহ, টানাটানা দুটি জ যেন দুটো বাঁকা তারবারি। চোখ দুটো যেন কাঁচের টুকরো। মশালের আলোতে চোখ দুটো যেন সাপের চোখের মত মনে হলো।
নারীমূর্তি বনহুরের চোখের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর হাতের ইংগিতে বনহুরকে দেখিয়ে কি যেন বললো।
নারীমূর্তির শ্যেন দৃষ্টি যে বনহুরের উপর এসে স্থির হয়েছে- এ দৃশ্য আর কেউ লক্ষ্য না করলেও নূরীর দৃষ্টি এড়ালো না। সে বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো।
নারীমূর্তি এবার মঞ্চ থেকে নেমে অদৃশ্য হলো মঞ্চের নীচে। জংলীরা বন্দী সবাইকে টানতে টানতে নিয়ে চললো। ওদিকে কিছুদূর গিয়েই দেখলো, মস্তবড় একটা খাঁচার মত বন্দীখানা। জংলীরা এবার সাপুড়ে সর্দার কেশব আর নূরীকে ঐ খাঁচায় বন্দী করে ফেললো। বনহুরকে বের করে নিলো ভিতর থেকে। নূরী তো ছুটে এসে জড়িয়ে ধরুলো –হুঁর তোমাকে যেতে দেবো না।
কিন্তু জংলীরা শুনলো না নূরীর কোনো বাধা। বনহুরকে নিয়ে চলে গেলো। নূরী কাঠের খাঁচায় মাথা ঠুকে বিলাপ করতে লাগলো।
সাপুড়ে সর্দার বা কেশবের মুখে কোনো কথা নেই। সর্দার ভাবছে তার জন্যই আজ সকলের এ অবস্থা।
কয়েকজন জংলী বনহুরকে সঙ্গে করে নিয়ে চললো। বেশ কিছুটা চলার পর একটা ঝোপঝাড় আর জঙ্গলে ঢাকা সুড়ঙ্গমুখের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। সুড়ঙ্গমুখেই ছিলো দুজন বল্লমধারী জংলী, তাদের হাতে ছিলো চোং ধরনের এক একটা বাঁশি।
জংলিগণ বনহুরকে নিয়ে সুড়ঙ্গমুখে পৌঁছতেই চোংধারী দু’জন জংলী চোঙ্গে মুখ লাগিয়ে বাজাতে লাগলো। ভোঁ ভোঁ শব্দে বেজে উঠলো।
সঙ্গে সঙ্গে সুড়ঙ্গ মুখের কপাট সরে গেলো এক পাশে।
বনহুরকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো এবার দু’জন জংলী। বাকীগুলো সুড়ঙ্গ মুখের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলো।
বনহুর এবং জংলীদ্বয় সুড়ঙ্গপথে এগিয়ে চললো।
জংলীদ্বয়ের হস্তে জ্বলন্ত মশাল।
মশালের আলোতে বনহুর সুড়ঙ্গ মধ্যে নজর রেখে এগুতে লাগলো। সুড়ঙ্গ মধ্যে অন্ধকার হলেও বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। পাথর দিয়ে মজবুত করে তৈরি পথ। কিন্তু সুড়ঙ্গপথের উচ্চতা খুব বেশি নয় জংলীরা লম্বায় বেঁটে আকার তাই তাদের পথের উচ্চতাও কম। বনহুরকে অবশ্য মাথা নিচু করে চলতে হচ্ছিলো। একটু অসাবধান হলেও মাথা ঠুকে যাবার সম্ভাবনা ছিলো।
