সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে এলো।
আকাশে জ্বলে উঠলো অসংখ্য তারকারাজি। যদিও এটা শীতকাল নয় তবু নদীতীরে ঠান্ডা হাওয়ায় হাড়ে কাঁপন লাগে।
নূরী তো কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে।
সর্দার ভীতকণ্ঠে বললো–আর দেরী করা যায় না বাবুজী, উহারা আইসে পড়িলো বলো।
বনহুর বললো–সর্দার তুমি ঐ উঁচু টিলাটার ওপাশে যাও আর কেশব তুমি ঐ ওদিকের ঝোপটার আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে পড়ো। মোটেই বিলম্ব করো না, ওরা এসে পড়লো বলে। আর আমরা দু’জনা এই টিলার আড়ালে লুকিয়ে পড়বো।
সর্দার বললো–বাঁচিবার যখন কোনো উপায় নেই বাবুজী তখন তাই করিবো। চলো কেশব। হামরা উধারে যাই। বাবুজী আপনি মাই ফুলরে নিয়া শীগগির লুকাইয়া পড়েন।
এসো নূরী। বনহুর নূরীর হাত চেপে ধরলো।
একি তুমি কাঁপছো নূরী? তুমি না দস্যু দুহিতা?
হুর, আমার জন্য ভয় আমি করি না। তোমার জন্য আমার চিন্তা এইতো কুমীরটার পাল্লায় পড়ে কতকষ্ট পেলে! কত রক্তপাত হয়েছে তোমার একটু পূর্বে। আবার যদি–
এতো বিপদেও বনহুর হাসলো–সাধে বলে নারী প্রাণ। মরতে হয় এক সঙ্গে মরবো তাতে দুঃখ কি বলো?
হুর, ঐ দেখ কি ভয়ঙ্কর জংলী দল এগিয়ে আসছে।
সম্মুখে দৃষ্টি ফেলতেই দেখলো অসংখ্য জংলী এগিয়ে আসছে। সমস্ত দেহ উলঙ্গ সামান্য একখন্ড চামড়া দিয়ে লজ্জা নিবারণ করেছে। প্রত্যেকের হাতে একটা জ্বলন্ত মশাল আর দক্ষিণ হস্তে সূতীক্ষ্ণ ধার বল্লম।
এক একটা জংলীর চেহারা জমকালো। বলিষ্ঠ দেহ, যেন পোড়া লোহার তৈরি। মাথায় পাখির পালকের টুপি। কানে লোহার বালা, হাতেও বালা আছে অনেকের।
সবাই আনন্দধ্বনি করছিলো আর একটা অদ্ভুত শব্দ করেছিলো।
সম্মুখে সারিবদ্ধভাবে একদল জংলী গলায় ঢাক বেঁধে এগুচ্ছে তারাই বাজাচ্ছিলো ঢাকগুলো। সেকি গুরুগম্ভীর গুড় ম গুড় ম আওয়াজ।
জংলীদের চেহারা দেখে শিউরে উঠলো নূরী। বনহুরের বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে কম্পিত কণ্ঠে বললো–ওরা যদি আমাদের দেখে ফেলে তাহলে কি উপায় হবে?
কি আর হবে–আত্মাহুতি দিতে হবে।
আমার ভয় করছে হুর।
বনহুর নূরীকে নিবিড় করে কাছে টেনে নিলো, ফিস ফিস করে বললো–চুপ করে থাকো নূরী। ওরা ওদিকেই চলে যাবে বলে মনে হচ্ছে।
হঠাৎ একটা আর্তচিৎকারে চমকে উঠলো বনহুর, বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে দেখলো কয়েকজন। জংলী কেশবকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসছে। নূরী এ দৃশ্য লক্ষ্য করা মাত্র চিৎকার করতে যাচ্ছিলো–বনহুর হাতচাপা দিলো ওর মুখে। তারপর চাপা গম্ভীর কণ্ঠে বললো–চুপ, ওরা শব্দ পেলেই এদিকে ছুটে আসবে।
নূরী ভীত করুণ স্বরে বললো কেশবের এখন কি হবে হুর?
প্রায় একশতের বেশি হবে জংলী কেশবকে ঘিরে ধরে অদ্ভুত শব্দ করছে আর ধেই ধেই করে নাচছে। জংলীদের চিৎকারের সঙ্গে ঢাকের আওয়াজ এক ভয়ঙ্কর অবস্থার সৃষ্টি করে চলেছে। মশালের আলোতে দেখলো ওরা কেশবের মুখ মড়ার মুখের মত ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে।
বনহুর রিভলভার উদ্যত করে ধরলো, বললো সে–কেশবকে বাঁচাতেই হবে।
নূরী বনহুরের হাত চেপে ধরলো, কম্পিত কণ্ঠে বললো– সর্বনাশ হবে হুর তোমার রিভলভার কজনাকে কমাতে পারবে বরং ওরা আমাদের সন্ধান পেয়ে এদিকে ছুটে আসবে!
তা হয় না, কেশবকে এভাবে মরতে দেব না নূরী।
কিন্তু আমরা সবাই যে মরবো তাহলে?
কি করা যাবে বলো, মরতে হয় সবাই এক সঙ্গে মরবো।
না না, তা হয় না হুর, আমি সব সহ্য করতে প্রস্তুত আছি কিন্তু তোমাকে হারাতে পারবো না।
নূরী!
হুর, তুমি গুলী করো না শব্দ হলেই ওরা তীরবেগে আমাদের আক্রমণ করবে।
নূরী, দেখছো না কেশবের কি অবস্থা? বেচারাকে এক্ষুণি ওরা হত্যা করে খেয়ে ফেলবে।
বনহুরের কথা মিথ্যা নয়–কতগুলো জংলী কেশবকে নিয়ে ধেই ধেই করে নাচছে। যেমন। খেলোয়াড়দের হস্তে ফুটবলের অবস্থা হয়। এ ওর হাতের উপর ছুঁড়ে দিচ্ছে যেন একখন্ড পাউরুটি।
বনহুরের সহ্যের সীমা অতিক্রম করলো,–তার হস্তের রিভলভার গর্জে উঠলো, রাত্রির জমাট অন্ধকার ভেদ করে ছুটে এলো একটা গুলী।
সঙ্গে সঙ্গে তীব্র আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়লো একটি জংলী।
মুহূর্তে ঢাকের আওয়াজ গেলো থেমে।
বনহুরের রিভলভার পুনঃ পুনঃ গর্জে উঠতে লাগলো এবং পর পর তীব্র আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ছে এক একটি জংলী।
অল্পক্ষণের মধ্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো জংলী দল। সবাই অদ্ভুত শব্দ করতে লাগলো। বিপদসূচক শব্দ এটা।
কতকগুলো জংলী বনহুর আর নূরী যে টিলাটার ওদিকে লুকিয়েছিলো সেইদিকে ছুটে আসতে লাগলো।
বনহুর পর-পর তাদের এক একজনকে ধরাশায়ী করে চললো। তার জামার পকেটেই ছিলো রিভলবারের গুলী, দ্রুতহস্তে রিভল ভারে গুলী ভরে নিচ্ছিলো সে।
কিন্তু বনহুর বেশীক্ষণ ওদের সঙ্গে লড়াই করে পেরে উঠলো না। পিছন দিক থেকে কতগুলো জংলী বল্লম হাতে ঘিরে ধরলো। ওদিকে সাপুড়ে সর্দারকেও কয়েজন জংলী হিড়হিড় করে টেনে এনেছে। বনহুর আর নূরীর চারপাশে অসংখ্য জংলী বল্লাম উঁচু করে দাঁড়ালো।
বনহুর জংলীদের অলক্ষ্যে রিভলভারটা পকেটে গোপন করে রাখলো।
জংলীদল এবার বনহুর কেশব, সাপুড়ে সর্দার আর নূরীকে মাঝখানে রেখে ধেই ধেই করে। নাচা শুরু করলো।
জংলীদের যে কয়েকজনকে বনহুর গুলীবিদ্ধ করে হত্যা করেছিলো, তাদের লাশগুলো জংলীরা নদীর পানিতে নিক্ষেপ করলো।
হাউ মাউ করে কয়েকজন কাদলো। কি যেন সব বিলাপ করলো মাথায় আঘাত করে!
