এখানে বিলম্ব করা উচিৎ নয় আর তাই সাপুড়ে সর্দার ওদের নিয়ে রওয়ানা দিলো।
ওদিকে রংলাল তাদের দলবল নিয়ে অনুসরণ করে চলেছে। হঠাৎ গতরাতে তারা যখন গহন বনে একটা নিরিবিলি জায়গা দেখে নিয়ে বিশ্রামের আয়োজন করছিলো ঠিক তখন তাদের দলের উপর আক্রমণ চালায় একটি ব্যাঘ্র এবং সে নিয়ে যায় একজনকে।
গতরাতে বনহুর যে মৃতদেহটাকে ব্যাঘ্ৰ কবল থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলো সেই মৃতদেহটাই হলো ঐ হতভাগ্য ব্যক্তির যে রংলালের দলে যোগ দিয়ে চলেছিলো রত্ন ভান্ডারের সন্ধানে।
রংলালের জনসংখ্যায় একজন কমে গেলেও তারা দমেনি এতোটুকু। মৃত্যুর ভয় তারা পরিহার করেছে রত্নের লালসায়। হরনাথের তো রত্নের চেয়ে বেশি লোভ নূরীর প্রতি। নূরীকে নিজের করে পাওয়ার জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছে সে।
সাপুড়ে সর্দারের মনে অফুরন্ত আশা–জঙ্গলে দুটো দিন ভালয় ভালয় কেটে গেলো, এবার। তাদের সম্মুখে একটি বড় নদী পড়বে।
ইতিমধ্যে তারা বেশ কয়েকটা নদী পারাপার হয়েছে। এগুলো পার হতে তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি। নৌকা ছিলো, তাতে করেই পার হয়েছিলো ওরা।
এবার যে নদীর সম্মুখে এসে তারা পৌঁছলো সে নদী পারাপার হবার কোনো নৌকা বা ঐ ধরনের কিছু নেই। কাজেই অত্যন্ত অসুবিধার সম্মুখীন হলো তারা।
নদীতীরেই বন।
সর্দার বললো–এখানে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কারণ আমাদের একটা ভেলা তৈরি করে নিতে হবে।
সঙ্গে কুঠার এবং দা ছিলো, বনহুর কেশব আর সর্দার মিলে শুরু করলো ভেলা তৈরির কাজ।
নানারকম গাছ আর লতা দিয়ে কৌশলে তারা একটি ভেলা তৈরি করে ফেললো।
এবার সবাই মিলে ভেলাটা নদীতে টেনে নামিয়ে ফেললো। নূরীর আনন্দ আর ধরে না।
ভেলায় উঠে বসলো সর্দার কেশব আর নূরী।
বনহুর মাঝির কাজ করতে লাগলো। সে একটা লম্বা ডাল নিয়ে পানি টানতে লাগলো।
নূরী হাত দিয়ে পানি নাড়ছে।
সর্দার আর কেশব এরাও এক একটা কাঠের টুকরা হাতে নিয়ে বৈঠার মত পানি টানতে লাগলো।
কখন যে নূরী পা দু’খানা জলস্রোতে নামিয়ে দিয়েছিলো কেউ লক্ষ্য করেনি,হঠাৎ একটা কুমীর তেজের আঘাতে নূরীকে টেনে নেয়।
সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ করে পড়ে যায় নূরী।
সর্দার আর কেশব চিৎকার করে উঠে–সর্বনাশ হয়েছে বাবুজী–সর্বনাশ হয়েছে–
বনহুর মুহূর্তে বিলম্ব না করে রিভলভারখানা সর্দারের দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ছোরাখানা মুক্ত করে নিয়ে লাফিয়ে পড়লো নদীবক্ষে।
নূরীকে তখনও কুমীর আক্রমণ করেনি।
বনহুর নূরীকে বাম হস্তে ধরে ফেললো তারপর তীক্ষ্ণধার ছোরা খানা বাগিয়ে ধরলো উদ্যত করে।
কিন্তু বেশিক্ষণ নূরীকে ধরে রাখা সম্ভব হলো না। কুমীরটা সোজা এবার বনহুরকে আক্রমণ করে বসলো। নূরীকে ছেড়ে দিয়ে এবার বনহুর কুমীরের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলো।
সর্দার আর কেশব সব দেখেছিলো, এবার তারা নূরীকে তাদের ভেলায় উঠিয়ে নিলো।
তখন কুমীর আর বনহুর চলেছে লড়াই।
বনহুর সূতীক্ষ্ণ-ধার ছোরা দিয়ে কুমীরের চোখে আঘাতের পর আঘাত করে চললো। কয়েকবার আঘাত করলো থোতনায়। রক্তে রাঙা হয়ে উঠলো নদীর পানি।
কুমীরকেও পরাজয় বরণ করতে হলো বনহুরের কাছে। চোখে এবং মুখে ভীষণ আঘাত পেযে কুমীরটা বনহুরকে ছেড়ে দিয়ে প্রাণ নিয়ে পালালো।
এবার সর্দার আর কেশব বনহুরকে তুলে নিতে সক্ষম হলো।
বনহুরের দেহের কতক জায়গা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছিলো। নূরী তাড়াতাড়ি ওড়না ছিঁড়ে বনহুরের ক্ষত স্থানগুলো বেঁধে দিলো। খোদার কাছে হাজার শুকরিয়া করলো নূরী। তার নিজের চেয়েও বেশি ঘাবড়ে গিয়েছিলো নূরী বনহুরের জন্য।
বনহুরের বুকে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় নূরী।
সর্দার ক্ষতে ঔষধ লাগিয়ে দেয়।
সাপুড়ে সর্দার তার থলের মধ্যে কিছু কিছু ঔষধও নিয়েছিলো বিপদ-আপদের জন্য। এক্ষণে তা কাজে লাগলো।
বনহুরের ক্ষতগুলো তেমন বেশি সাংঘাতিক বা মারাত্মক হয়নি। অল্পক্ষণেই বনহুর সুস্থ হয়ে উঠলো।
নদীটি অত্যন্ত প্রশস্ত হওয়ায় বেশ সময় লাগলো ওপারে পৌঁছতে।
ওপারে যখন তারা পৌঁছল তখন সন্ধ্যার অন্ধকার জমাট বেঁধে উঠেছে। তীরে পৌঁছতেই তারা একটা গুড় ম গুড় ম ঢাকের আওয়াজ শুনতে পেলো।
সাপুড়ে সর্দারের মুখ বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো। সে ভীত কণ্ঠে বললো–বাবুজী, জংলী রাজা এদিকে আসিতেছে। এখন উপায় কি হইবে!
অবাক কণ্ঠে বললো বনহুর–জংলী রাজা–সে কি রকম সর্দার।
বাবুজী ও মানুষ অত্যন্ত ভয়ঙ্কর লোক আছে। ওরা মানুষ ভি খায়। কাঁচা মাংস ওরা খুব ভালবাসে।
কান পেতে শুনলো ওরা-গুড় ম গুড় ম আওয়াজটা ক্রমান্বয়ে আরও এগিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে এক সঙ্গে অনেকগুলো ঢাক ওয়ালা নদীর দিকেই এগুচ্ছে।
বনহুর বললো–সর্দার যেমন করে হোক ওদের দৃষ্টি থেকে নিজেদের গোপন রাখতে হবে,নাহলে বিপদ হবে।
হাঁ বাবুজী শুধু বিপদ না হবে, জান বাঁচাতে পারবো না হামরা লোক। কিন্তু কি করা যায়?
কেশব আর নূরীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে।
কেশব বললোবাবু, ঐ দেখেন কত মশাল জ্বলে উঠলো।
ওরা সবাই তাকালো সম্মুখে দেখতে পেলো অসংখ্য মশাল এক সঙ্গে জ্বলে উঠলো পট পট করে। ঢাকের শব্দ আরও তীব্র এবং স্পষ্ট মনে হচ্ছে।
মশালের আলোগুলো এগিয়ে আসছে দ্রুত নদী তীরের দিকে।
ভেলা ছেড়ে সর্দার কেশব বনহুর আর নূরী নেমে পড়লো তীরে। নদীর ওপার যেমন গহন বনে ঢাকা, এপারে তা নয় উঁচুনীচু কতকগুলো টিলা আর শুধু প্রান্তর। নদীতীর থেকে বহুদূরে নজর যায়।
