একটা ফাঁকা জায়গা দেখে তারা বিশ্রামের আয়োজন করলো।
কেশব আর সাপুড়ে সর্দার বন থেকে শুকনো কাঠ সংগ্রহ করে আগুন জ্বালালো।
আগুন দেখলে কোনো হিংস্র জীবজন্তুর আগমন হয় না জানে তারা, তাই বিরাট অগ্নিকুণ্ডের আয়োজন করলো।
সঙ্গের খাবার পেট পুরে খেলো ওরা।
তারপর পালা করে ঘুমানো ঠিক হলো। প্রথম রাত জাগবে সর্দার স্বয়ং মধ্যরাত বনহুর, ভোর রাত কেশব।
হেসে বললো নূরী–আমি কিন্তু গোটারাত জাগবো তোমাদের সঙ্গে।
কেশব আর বনহুর হেসে উঠলো তার কথায়।
সর্দার বললো–তোমাকে আর জাগতি হবি না মা। তুমহি ঘুমাইতে পারো।
সবাই ঘুমাবার জন্য শয়ন করলো, শুধু জেগে রইলো সর্দার।
সম্মুখে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।
বল্লম হস্তে চারিদিকে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিচ্ছে সাপুড়ে সর্দার। মাঝে মাঝে অগ্নিকুণ্ডে কাঠ নিক্ষেপ করছিলো সে।
রাত বেড়ে আসছে।
দূর থেকে ভেসে আসছে নানারকম জীবজন্তুর গর্জন। গাছের ঝোপের আড়ালে হুতুম পাখি পাখা ঝাপটা দিয়ে উঠছে। কেমন একটা অশুভ ভয়ঙ্কর ভাব বিরাজ করছে সমস্ত জায়গাটা জুড়ে।
হঠাৎ একটা আর্তচিৎকারে বনভূমি প্রকম্পিত হয়ে উঠলো। ঘুম ভেঙে গেলো বনহুর, কেশব আর নূরীর। আচমকা উঠে বসলো ওরা। বনহুর একেবারে সাপুড়ে সর্দারের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
সাপুড়ে সর্দার আর্তচীঙ্কার শুনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিলো; বনহুর বললো–সর্দার মানুষের চিৎকার বলে মনে হলো।
হাঁ বাবুজী, এ আওয়াজ মানুষের গলার হামি ঠিক ধরিয়াছি।
গহন বনে মানুষ এলো কোথায় হতে তবে কি কোনো পথিক বিপদে পড়েছে। বনহুর কথা কয়টি ব্যস্তভাবে বলে দ্রুত চলে যাচ্ছিলো।
নূরী ওর জামার আস্তিন চেপে ধরে–না না যেও না যেও না হুর, কোনো অমঙ্গল ঘটতে পারে।
সাপুড়ে সর্দার বলে উঠলো–এই গহন জঙ্গলে কে কি হলো দেখার জন্য উতালা হচ্ছো কেন। তুমি যেও না বাবুজী।
তা হয় না সর্দার, তোমরা নূরীর কাছে থাকো, আমি দেখে এক্ষুণি ফিরে আসছি।
আমি তোমাকে যেতে দেবো না হুর। নূরী এঁটে ধরলো বনহুরকে।
বনহুর নূরীর হাত ছাড়িয়ে মশালটা তুলে নিলো বাম হস্তে। আর দক্ষিণ হস্তে নিলো রিভলভার দ্রুত চলে গেলো যেদিক থেকে আর্তচিৎকার ভেসে এসেছিলো সেইদিকে।
নূরী কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত দাঁড়িয়ে রইলো।
সাপুড়ে সর্দার কেশবও হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সেই দিকে যেদিকে চলে গেলো বনহুর।
বাম হস্তে মশাল দক্ষিণ হস্তে গুলীভরা রিভলভার নিয়ে বনহুর সম্মুখে অগ্রসর হলো। ভয়ঙ্কর জঙ্গলে তীব্র আর্তচিৎকার শুনে যে লোক দ্রুত ছুটে যেতে পারে সে কত বড় সাহসী ভাবলো সর্দার; তার দু’চোখে রাজ্যের বিস্ময় ঝরে পড়ছে যেন।
সাপুড়ে সর্দার নিজেও কম সাহসী নয়, তবু বনহুরের দুঃসাহসে সে অবাক না হয়ে পারলো না। মনে মনে ওকে অন্তর দিয়ে ধন্যবাদ জানালো।
বনহুর কিছুদূর অগ্রসর হবার পর একটা যন্ত্রণাদায়ক গোঙ্গানীর শব্দ শুনতে পেলো।
এবার বনহুর সেই দিকে দ্রুত ছুটতে লাগলো। কিন্তু বেশিদূর অগ্রসর না হতেই তার হস্তস্থিত মশালের আলোতে দেখলো অনতিদূরে একটা ঝোপের পাশে পড়ে আছে একটি রক্তাক্ত দেহ। পরক্ষণেই নজর পড়লো মনুষ্য দেহটার বুকে দু’খানা থাবা তুলে দিয়ে বসে আছে একটি ব্যাঘরাজ।
মশালের আলোতে ব্যাঘ্ররাজের চোখ দুটো আগুনের গোলার মত জ্বলে উঠলো।
থমকে দাঁড়ালো বনহুর।
ব্যাঘ্র মহারাজ প্রথম হকচকিয়ে গিয়েছিলো হঠাৎ মশালের আলো দেখে। এবার গর্জন করে উঠলো দাঁতমুখ খিঁচিয়ে।
বনহুরও এ দৃশ্য দেখে একটু হতভম্ব হয়ে পড়েছিলো কিন্তু পরমুহূর্তে সামলে গিয়ে পর পর দুটো গুলী ছুঁড়লো ব্যাঘ্রটাকে লক্ষ্য করে।
মুখের আহার ত্যাগ করে ব্যাঘ্ররাজ ভীষণ এক গর্জন করে লাফ দিলো সম্মুখে কিন্তু অগ্রসর হতে পারলো না, মুখথুবড়ে পড়ে গেলো মৃতদেহটার পাশে।
বনহুর পুনরায় একটা গুলী নিক্ষেপ করলো তারপর মশাল হস্তে মৃতদেহটার পাশে এসে দাঁড়ালো। মশালের আলোতে স্পষ্ট দেখলো– একটা বলিষ্ঠদেহী লোক পড়ে আছে ভূতলে! গলা এবং বুকের খানিকটা অংশ ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। ঘাড়টা সম্পূর্ণ মুচড়ে ফেলছে। রক্তের চাপ জমাট বেঁধে ওঠেনি এখনও তবু সমস্ত জামাটা লালে লাল হয়ে গেছে। সেকি বীভৎস দৃশ্য!
লোকটার এইমাত্র মৃত্যু ঘটেছে বলেই মনে হলো। কারণ একটু পূর্বেও সে গোঙ্গানীর শব্দ শুনতে পেয়েছিলো।
বনহুর আর বিলম্ব না করে ফিরে এলো সর্দার, কেশব আর নূরীর পাশে। নূরী তো ছুটে গিয়ে বনহুরের বুকে মাথা রেখে ব্যাকুল কণ্ঠে বললো– ইস ফিরে এসেছো! আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
সর্দার আর কেশব এগিয়ে এলো।
বললো সর্দার–কিসের আওয়াজ বাবুজী?
বনহুর বললো–একটা লোককে বাঘে খেয়েছে।
অবাক কণ্ঠে বললো সর্দার–লোক?
হা সর্দার একটা লোককে নৃশংসভাবে বাঘে হত্যা করেছে।
সে রাত আর কেউ ঘুমাতে পারলো না।
তবু বনহুর নিজে রিভলভার হস্তে জেগে রইলো পাহারায়। সর্দার কেশব আর নূরী মিলে অর্ধন্দ্রিাভাবে কাটিয়ে দিলো রাতটা।
*
পরদিন যখন সাপুড়ে সর্দার দলবল নিয়ে ঝোপের পাশে মৃত দেহটার নিকটে এসে হাজির হলো তখন সেখানে কিছু ছেঁড়া রক্ত মাখা জামা কাপড় ও কয়েকখানা হাড়গোড় ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়লো না।
পাশেই একটু দূরে পড়ে আছে ব্যাঘ্র মহারাজের মৃতদেহ। কতকগুলো ক্ষুদ্রকায় কীট বাঘটার চোখমুখ ছিদ্র করে মাংস বের করে ফেলেছে।
