মাথায় পাগড়ি কানে বালা, হাতে বালা গায়ে ছোট্ট ধরনের ফতুয়া পায়ে নাগড়া। হঠাৎ করে কেউ দেখলে তাকে সাপুড়ে যুবক ছাড়া কিছুই বলবে না।
এ ড্রেসে অদ্ভুত সুন্দর মানিয়েছে বনহুরকে।
সাপুড়ে সর্দার দলবল নিয়ে রওয়ানা হলো কাহাতুর পাহাড়ের উদ্দেশ্যে।
তিরিশ বছর পূর্বে এই পথে একদিন রওয়ানা দিয়েছিলো সাপুড়ে সর্দার। সেদিন তার সঙ্গে ছিলো একমাত্র পিতা মতিলাল। আজ মতিলাল নেই–আজ দলের সর্দার হীরালাল।
গভীর রাতে ওরা রওনা দিলো।
হীরালাল, বনহুর কেশব আর সাপুড়ে পল্লীর কেউ জানলো না এরা কোথায় গেছে।
দিল্লী নগরী পিছনে পড়ে রইলো, এগিয়ে চলেছে সাপুড়ে দল।
নূরীর আনন্দ আর ধরে না, বিশেষ করে তার আনন্দের কারণ– সঙ্গে আছে বনহুর স্বয়ং। বনহুরের পাশে পাশে চঞ্চল যুবতী নূরী নৃত্যের ভঙ্গীমায় এগিয়ে চলেছে।
কতদিন পর আবার সে পাশে পেয়েছে তার চিরসাথী বনহুরকে। দু’চোখে তার আনন্দের দ্যুতি উছলে পড়ছে। ধমনীতে তার প্রবাহিত হচ্ছে উষ্ণ রক্ত। পায়ের নুপুরে রুমঝুম্ শব্দ হচ্ছে।
*
রাত ভোর হয়ে এলো।
তখন তারা দিল্লী নগরী ছেড়ে অনেক দূরে এসে পড়েছে।
সর্দার হীরালাল পিঠের বোঝা নামিয়ে রাখলো একটা পাথর খন্ডে বললো এখানে আমরা আরাম করিবো বাবুজী।
বনহুর আর কেশবও দাঁড়িয়ে পড়েছে। বললো বনহুর–বেশ তাই হোক।
কেশব হেসে বললো–ফুল বড় হাঁপিয়ে পড়েছে।
নূরী রাগতঃ কন্ঠে বললো–হাঁপিয়ে পড়ার মেয়ে নূরী নয়।
সর্দার নূরীর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললো–সাবাস বেটি।
বনহুর আর নূরীর দৃষ্টি বিনিময় হলো।
হাসলো বনহুর।
ওরা যখন বিশ্রাম করছে তখন একটা ছোরা হঠাৎ এসে গেঁথে গেলো সর্দারের পায়ের কাছে।
চমকে উঠলো সবাই।
বনহুর ছোরাখানা টেনে তুলে নিলো হাতে।
সর্দার বললো–ও ছোরা রংলালের আছে। শয়তান হামার পিছু নিয়াছে বাবুজী।
নূরীর মুখ কালো হয়ে উঠলো মুহূর্তের জন্য ভয়ার্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করলো–রংলাল।
বললো সাপুড়ে সর্দার–বাবুজী, ঐ বদমাইস বড় সাংঘাতিক মানুষ আছে। আমাদেরও বিপদে ফেলতে পারে বাবুজী।
বনহুর ছোরাখানা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললো–সর্দার কোনো ভয় তুমি করো না। রংলাল কেন, অমন সাতজন রংলালকে আমি দেখে নেবো।
বাবুজী তোমার কথা যেন ঠিক হয় বাবুজী।
সঙ্গে শুকনো রুটী আর কিছু রান্না করা মাংস নিয়েছিলো তাই পেট পুরে খেলো ওরা। তারপর আবার রওয়ানা দিলো সম্মুখের দিকে।
গহন জঙ্গল অতিক্রম করে এগিয়ে এলো সাপুড়ে সর্দারের দল।
আরও একটি দল সাপুড়ে সর্দারের দলের অগোচরে তাদের অনুসরণ করে চলেছে। সে হলো রংলালের দল। তাদের সঙ্গে আছে কয়েকজন লোক। সব গুন্ডা এবং শয়তান লোক। মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তারা চলেছে।
রংলাল জানতো, তার কাকা কোনো গুপ্ত গুহার সন্ধান জানে এবং সে গুহায় যে প্রচুর ধনরত্ন। সঞ্চিত রয়েছে তাও সে জানতো। হীরালাল কোনোদিন তাকে না বললেও সে এ সংবাদ গোপনে সংগ্রহ করে নিয়েছিলো।
রংলালের দলে ছিলো একজন শিক্ষিত লোক। যে লোকটি সেদিন নূরীকে গাড়িতে তুলে নিয়ে উধাও হতে চেয়েছিলো। লোকটা দিল্লীর একজন অধিবাসী। কুকর্মই তার পেশা ও নেশা। রংলালকে বশীভূত করে সে চেয়েছিলো নূরীকে হস্তগত করতে। এজন্য ওকে সে প্রচুর অর্থও দিয়েছিলো। কিন্তু বনহুরের জন্য কার্যসিদ্ধ হয়নি।
সেদিন নূরীকে নিয়ে পালাচ্ছিলো লোকটা। হঠাৎ বনহুর এসে পড়ায় তার সমস্ত আশা পন্ড হয়ে গিয়েছিলো। দূর থেকে রংলাল লক্ষ্য করেছিলো, ভেবেছিলো ওকে ধরতে আর পারবে না। তারপর যখন বনহুর নূরীসহ ফিরে এলো তখন তার মুখ চুন হয়ে গিয়েছিলো। এগিয়ে এসে প্রতিবাদ করেছিলো বনহুরের মুখের উপর।
বনহুর পাল্টা জবাব দিয়েছিলো মুষ্ঠিঘাতে।
বনহুরের ঘুষি খেয়ে রংলালের নাক-মুখ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়েছিলো, কোনো রকম টুশব্দ করতে সাহসী হয়নি সেদিন রংলাল।
কিন্তু তার মনে যে আগুন জ্বলে উঠেছিলো সে অতি ভয়ঙ্কর। কৌশলে সে এর প্রতিশোধ নেবার জন্য বদ্ধপরিকর হলো। পুনরায় যোগ দিলো সেই দুষ্ট লোক হরনাথের সঙ্গে যে নূরীকে হস্তগত করতে নিয়েও পারেনি।
রংলালের দলে ছিলো সাত জন আর বনহুরের দলে ছিলো তারা মাত্র চার জন। সাপুড়ে সর্দার কেশব, বনহুর আর নূরী। মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে বনহুরের নিকটে ছিলো তার রিভলভার ও একটি ছোরা। সাপুড়ে সর্দারের কাছে এবং কেশবের কাছে ছোরা আর বল্লম ছিলো।
সাপ ধরার জন্য কয়েকটা ঝাঁকা আর বাঁশি ছিলো তাদের সঙ্গে আর ছিলো কয়েকটা বড় বড় ত্রিপলের থলে।
সাপুড়ে সর্দার যখন জানতে পারলো রংলাল তাদের অনুসরণ করছে তখন সে অত্যন্ত চিন্তিত হলো। কিন্তু মুখোভাবে সে কিছু প্রকাশ করলো না।
*
দুই দিন কেটে গেলো।
এখন তারা এমন এক জায়গায় এসে হাজির হলো যেখানে শুধু বন আর বন।
এ দুই দিনের মধ্যে রংলালের বা তার দলের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। কতকটা নিশ্চিন্ত হয়েছে সাপুড়ে সর্দার। ভেবেছে সে রংলাল হয়তো তাদের খোঁজ না পেয়ে ফিরে গেছে।
গহন বনের মধ্যে নেমে এলো রাতের অন্ধকার।
বিশেষ করে নূরীর দেহ অবসন্ন হয়ে এসেছে। সম্পূর্ণ একরাত আর দু’দিন তারা অবিরাম চলে বহুদূরে এসে পৌঁছে গেছে। ভীষণ বন–কাজেই রাতের বেলা অগ্রসর হওয়া আর মোটেই সম্ভব নয়।
