নূরীর চোখের পানি বিচলিত করে তুললো কেশবকে।
সাপুড়ে সর্দার যখন জানলো নূরীর প্রিয়জন হলো ঐ বাবুজী তখন সেও কম ব্যথিত হলো না। নূরীর মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলো।
নিঃসন্তান সাপুড়ে সর্দার এই মেয়েটিকে যারপর নাই স্নেহের চোখে দেখতো। কেন যেন তার অত্যন্ত ভাল লাগতো ওকে। তাই নূরীর চোখের পানি তার অন্তরে দারুণ আঘাত করলো।
রংলাল কিন্তু সব সময়ে নূরীকে হস্তগত করার জন্য গোপনে প্রচেষ্টা চালিয়ে চলেছে।
একদিন নূরী একা একা বসে চিন্তা করছিলো হয়তো বনহুরের কথাই ভাবছিলো সে–এমন সময় হঠাৎ রংলাল এসে তার কাঁধে হাত রাখলো। চমকে ফিরে তাকালো নূরী, সঙ্গে সঙ্গে বিবর্ণ ফ্যাকাশে হলো ওর মুখমন্ডল।
রংলাল হেসে বললো–এতো করে কার কথা ভাবছিস ফুল?
নূরী ক্রুদ্ধ নাগিনীর মত ফোঁস্ করে উঠলো–সেকথা তোমার শুনে কাজ নেই। যাও এখান থেকে।
যাবো আমি! হুম তোমাকে নিয়ে তবেই যাবো। রংলাল জাপটে ধরে ফেললো নূরীকে।
নূরী চিৎকার করে উঠলো–বাবাজী–বাবা–বাবা–
হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো সাপুড়ে সর্দার; হিংস্র জন্তুর মত ঝাঁপিয়ে পড়লো রংলালের উপর, টুটি টিপে ধরলো ওর।
রংলাল নূরীকে তখনকার মত ছেড়ে দিলো বটে কিন্তু সে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিয়ে ওর দিকে তাকাতে তাকাতে চলে গেলো।
নূরী সাপুড়ে সর্দারের বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। ক্রন্দন ভরা কণ্ঠে বললো– বাবা, আমাকে রংলালের হাত থেকে বাঁচাও।
এমন সময় হঠাৎ আবির্ভাব হয় বনহুরের।
সাপুড়ে সর্দার খুশি হলো বনহুরকে দেখতে পেয়ে।
নূরী ছুটে গিয়ে লুটিয়ে পড়ে বনহুরের বুকে।
সাপুড়ে সর্দার বললো–একটা কথা বলবো তোমাকে বাবু অত্যন্ত গোপন কথা। এদিকে এসো বাবু আজ সব কথা বলবো। আমার কোনো ছেলেমেয়ে নেই তাই তোমরা আমার ছেলেমেয়ে। বাবু হামি যখন খুব জোয়ান ছিলাম তখন এক দিন কাহাতুর নামে এক পাহাড়ে সাপ ধরিতে গিয়েছিলাম হামার বাপুজি ছিলো সাথে।
বনহুর অবাক কণ্ঠে বললো–কাহাতুর পাহাড়?
হাঁ বাবুজী, কাহাতুর পাহাড় দিল্লীর শহর হইতে পাঁচশত মাইল দক্ষিণে। ওখানে যাইতে তিন মাস তের দিন সময় লাগে।
কেন? কোনো যানবাহন চলে না?
না বাবুজি পায়ে হাইটে যাইতে হয়। সেই কাহাতুর পাহাড়ে এক গুপ্তধনের গুহা আছে। বাবুজী, হামি সেই পথ জানি।
বনহুর বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো আবার–গুপ্তধন।
হাঁ বাবুজী বহুৎ সোনা-দানা হীরা জহরৎ আছে সেই গুপ্ত গুহায়। হামার কোনো বেটা পুত্র নেই, এক ভাতিজা রংলাল–বাবুজী বড় নিমকহারাম উ লোক আছে। তাই আমি উহাকে এ রাস্তা দেখাইমু না।
বনহুর স্তব্ধ হয়ে শুনছে তার চোখের সম্মুখে ভাসছে এক সুড়ঙ্গ পথ, তারপর এক গুহা গুহার মধ্যে অসংখ্য ধনরত্ন, মণি মানিক্য। বনহুরের চোখ দুটো জ্বলে উঠলো, লোভ তার নিজের জন্য নয়–ওগুলো আনতে পারলে অনেক কাজে লাগবে।
বললো বনহুর-সর্দার, সত্যি বলছো?
হা বাবুজী, হামি কোনোদিন মিথ্যা বলিবো না। বাবুজী, তুম হামার বেটা।
বেশ তাহলে তুমি রাজি আছো?
হ রাজী আছি। বাবুজী হামি আর দেরী করিতে পারিবো না। দু’একদিন পর কাহাতুর পাহাড়ে রওয়ানা দেব।
তাই হবে। বললো বনহুর।
সেদিনের মতো বিদায় নিয়ে বনহুর চলে গেলো তার পোড়ো বাড়িটিতে। দূরদেশে পাড়ি জমাবার যা প্রয়োজন সব সঙ্গে নেবার ব্যবস্থা করে নিলো।
বিদায় দিনে বনহুর মনিরাকে নিয়ে এলো তার পোড়োবাড়িতে। আজ বনহুরকে বেশ গম্ভীর আর ভাবাপন্ন লাগছিলো।
মনিরার খুশির অন্ত নেই–স্বামীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো, বললো–আজ এত উদাস মনে হচ্ছে কেন তোমাকে বলতো?
মনিরার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো বনহুর–একটা কথা তোমাকে বলবো মনিরা, অমত করবে না তো?
চমকে উঠলো মনিরা সোজা হয়ে বসে বললো–তার মানে?
মনিরা, আমাকে কোনো এক ব্যাপারে দূরে যেতে হচ্ছে। হয়তো ফিরতে বিলম্ব হবে।
মনিরা অভিমান ভরে বললো চলে যাবার পূর্বে আমাকে হত্যা করে যাও।
ছিঃ লক্ষ্মীটি জরুরি কাজ না হলে যেতাম না।
তা আমি জানি, সবই তোমার জরুরি কাজ। কবে তোমার অবসর হলো? জীবনে তুমি কোনোদিন অবসর হবে কিনা তাই বা কে জানে!
বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে বনহুর মনিরাকে–মনিরা লক্ষীটি হাসি মুখে আমাকে বিদায় দাও? হাসো–হ্যাঁসো মনিরা?
আমিও যাবো তোমার সঙ্গে।
পাগলী মেয়ে তা কি হয়–সে যে অনেক দূরের পথ।
না না, তা হবে না, আমি তোমাকে ছেড়ে দেবো না। তাহলে আমাকে তুমি কান্দাই রেখে এসো।
আচ্ছা তাই হবে, ফিরে এসে তোমায় কান্দাই নিয়ে যাবো। এবার আমাকে যেতে দাও।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বললো মনিরা–কবে ফিরে আসবে আমাকে কথা দিয়ে যাও তবে!
বনহুর মনিরার চোখের পানি হাত দিয়ে মুছে বললো–সঠিক বলে যাওয়া সম্ভব নয় মনিরা। তবে শীঘ্রই ফিরে আসবে বলে আশা করি।
বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে মনিরা বিদায় সম্ভাষণ জানালো তার স্বামীকে।
খুশি হলো বনহুর। স্ত্রীর ললাটে একটা চুম্বনরেখা এঁকে দিয়ে বললো–চলো মনিরা, এবার তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
চলো।
মনিরাকে শিবাজী-বেশি বনহুর যখন বাংলোয় পৌঁছে দিয়ে ফিরে এলো তখন রাত গম্ভীর হয়ে এসেছে।
বনহুর শয্যায় অর্ধশায়িত অবস্থায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে নিলো। তারপর গাড়ি নিয়ে হাজির হলো সাপুড়ে আস্তানায়।
সাপুড়ে সর্দার তার দলবল নিয়ে তৈরি হয়ে নিয়েছে। এমনকি নূরীও যাবে তাদের সঙ্গে। শুধু রংলালকে নেবে না সাপুড়ে সর্দার। বনহুরও সাপুড়েদের দলে সাপুড়ে সেজে নিলো।
