সত্যি তুমি যে কি!
আজও তুমি আমাকে চিনলে না মনিরা।
চিনি বলেই অবাক হই তোমার কার্যকলাপ দেখে। বলতো কেন তুমি আমাদের কাউকে কিছু না বলে অমন করে পালিয়ে এসেছে এই ভারতবর্ষে?
আমার সে কাহিনী অদ্ভুত রহস্যময়। কিন্তু তুমি কি করে পুলিশ সুপার হাশেম চৌধুরীর আত্মীয় হলে তা তো বললে না?
বলবো, সে আর এমন কোনো রহস্যপূর্ণ কথা নয়। তুমি তো ডুব মেরেছো আমি কাকে নিয়ে কাটাই বলো?
কেন, তোমার মামীমা–তোমার নূর?
তারা তো আছেই কিন্তু নিষ্ঠুর তুমি জানো না, স্বামী যার ঘরে নেই, তার মত দুঃখিনী বুঝি আর কেউ নেই।
তাই স্বামীর অভাব পূরণ করবার জন্য—
না, স্বামীর অভাব পূরণ করবার জন্য নয়, স্বামীর সন্ধানে আমার মন আমাকে টেনে এনেছে। সত্যি আমি মাসুমার কাছে চিরঋণী। ওকে আমি ধন্যবাদ দেই, ওর জেদেই আমি এসেছিলাম। তাই আজ তোমায় পেলাম। স্বামীর বুকে মাথা রাখে মনিরা।
বনহুর বলে মা কেমন আছে মনিরা?
ভাল আছেন তিনি, তবে তোমার জন্য পাগলিনী প্রায়।
নূর কত বড় হয়েছে?
অনেক বড় হয়েছে। তোমার কথা বলে সব সময়ে মন খারাপ করে সে।
পড়াশোনা করছে তো?
হাঁ।
লেখাপড়া শিখে ও মানুষ হোক মনিরা। আমি যা পারিনি নূর তাই করবে। মনিরা ওর সম্মুখে যাবার ইচ্ছা আর আমার নেই।
এ তুমি কি বলছো?
হাঁ, সত্যিকথা বলছি। যদি যাই, রাতের অন্ধকারেই ওকে দেখে আসবো কিন্তু পিতা বলে কোনোদিন আমি তার সাক্ষাতে গিয়ে দাঁড়াবো না।
কি নিষ্ঠুর পাষন্ড তুমি!
মনিরা আমি কত বড় অভিশপ্ত মানুষ তা তো জানো। কোন মুখ নিয়ে আমি নূরের সরল-সহজ প্রাণের সম্মুখে নিজকে তুলে ধরবো? কোন মন নিয়ে–বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে বনহুরের কন্ঠ।
মনিরা স্বামীর মাথায়-কপালে হাত বুলিয়ে দেয়। আঁচল দিয়ে মুছে দেয় চোখের পানি। মনিরার চোখদুটোও শুষ্ক ছিলো না।
রাত বেড়ে আসে। মনিরা বলে চলো এবার আমাকে রেখে আসবে?
মনিরা! বনহুর নিবিড়ভাবে মনিরাকে আবার বুকে জাপটে ধরে– চলে যাবে?
গিয়ে কোনো উপায় আছে বলো? স্বামীর গলায় বুকে হাত দিয়ে অনুভব করে মনিরা। গন্ডের সঙ্গে গন্ড মিলিয়ে বলে–আবার আসবো।
আসবে?
হাঁ যখন তুমি বলবে তখনই আমি আসবো তোমার পাশে।
চলো মনিরা রেখে আসি এবার তোমায়।
চলো! মনিরা উঠে দাঁড়ায়।
বনহুর আর মনিরা গাড়িতে এসে বসে। এবার মনিরা ড্রাইভ আসনের পাশে বসে, স্বামীর পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসতে গিয়ে অনাবিল এক শান্তিতে ভরে উঠে ওর মন। এ যে জীবনের এক পরম শান্তি!
বাংলোয় ফিরবার পূর্বে মনিরাসহ বনহুর দিল্লীর এক দোকানে গিয়ে অনেক কিছু কিনে ফেললো। মাসুমার জন্য কিনলো শাড়ি ব্লাউজ, হাশেম চৌধুরীর জন্য নতুন নাইট ড্রেস আর খাবার নিলো বেশ কিছু।
এবার বনহুর শিখ ড্রাইভারের বেশে সজ্জিত হয়ে নিলো। ড্রাইভার সেজে গাড়ি চালাচ্ছে বনহুর আর মনিরা পিছনের আসনে বসে আছে। বাংলোয় ফিরতেই শশব্যস্তে ছুটে এলেন হাশেম চৌধুরী আর মাসুমা, এতো বিলম্ব দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলো ওরা।
হাশেম চৌধুরী ড্রাইভারকে ধমক দিলেন–শিবাজী, এ দের কিয়াতুম্ লোক? কাঁহা গিয়া থা বোলো?
হাম কেয়া কসুর কিয়া হুজুর। মেম সাহাব তো দোকান পর এত না দেড় কিয়া।
মনিরা গাড়ি থেকে জিনিসপত্র নামাতে নামাতে বললো–হঠাৎ এসব দেখে না নিয়ে আর পারলাম না।
অতো সব কি এনেছিস মনিরা? বললো মাসুমা।
সব দেখবি চল। বললো মনিরা।
হাশেম চৌধুরী বললেন ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে–শিবাজী এসব অন্দর মে লে চলো।
বহুৎ আচ্ছা হুজুর, আপ লোক চলিয়ে আভি হাম্ লে আতা।
আচ্ছা লে আও। চলো তোমরা চলল। অগ্রসর হলেন হাশেম চৌধুরী।
মনিরা বললো–এখন শরীর কেমন আছে মাসুমা?
তোর চিন্তায় অসুখ পালিয়ে গেছে কোথায় কে জানে।
বাঃ তাহলে তো ভালই হয়েছে। আমার চিন্তায় যদি অসুখ পালায় তাহলে অসুখের দামটা না। হয় আমায় দিস।
মাসুমা বলে বেশ তাই দেব। কিন্তু এতো দেরী করলি কোথায় বলতো?
ঐ তো বললাম দোকানে।
এত সব কি কিনেছিস্ মনিরা? মামীমা টাকাগুলো দিয়েছিলেন, সব বুঝি শেষ করে এসেছিস না?
না না, তেমন কি আর এনেছি।
চল্ আগে দেখি তারপর মজাটা দেখাবো। আচ্ছা বল্ রঞ্জন বাবুর কোনো সন্ধান পেলি কিনা?
আমি কি ওকে খুঁজতে গিয়েছিলাম তাই পাবো?
জিনিসপত্র দেখে তো হাশেম চৌধুরী আর মাসুমার চক্ষুস্থির। সেকি মূল্যবান জামা-কাপড় অনেক দামী দামী ফলমূল আর কতরকম খাবার!
মাসুমা তো গালে হাত দিয়ে বসলো–সর্বনাশ, এসব তুই কি করেছিস বল্ তো?
আগে বল পছন্দ হয়েছে কিনা?
কি যে বলিস্ এতো দামী জামা-কাপড় আর এসব পছন্দ হবে না?
হাশেম চৌধুরীও বিস্ময়ভরা গলায় বললেন–আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে? এসব কেন আনতে গিয়েছিলেন বলেন তো?
কোনোদিন কিছু দেইনি আপনাদের তাই এই সামান্য কিছু।
এ সব সামান্য? বললেন হাশেম চৌধুরী।
এরপর থেকে মনিরা প্রায়ই শিবাজীসহ চলে যেতো বাইরে। হয়তো কোনো কাজের নাম করেই যেতো। কিন্তু বনহুর আর মনিরা মিলিত হতো সেই পোড়াবাড়িতে।
মনিরার জীবন আবার আনন্দে হাসি-গানে ভরে উঠলো। স্বামীসঙ্গ তার জীবনকে করে তুললো মুখর।
পোড়োবাড়ির নির্জনতায় মনিরা স্বামীকে একান্ত নিজের করে পেতো, সমস্ত অন্তর দিয়ে উপভোগ করতো স্বামীর অস্তিত্ব।
বনহুর যখন মনিরাকে নিয়ে আত্মহারা তখন সাপুড়ে পল্লীতে নূরী বনহুরের প্রতীক্ষায় অহরহ অশ্রু বিসর্জন করে চলেছে। সেই যে তার গলার মালা দেখে আনমনা হয়ে গেলো, তারপর আর ওকে ধরে রাখতে পারলো না নূরী কিছুতেই। নূরী নিজের চুল নিজে ছিঁড়তে লাগলো কেন সে ঐ মালা গলায় পরেছিলো। কেন সে ঐ মালা খুলে রাখেনি–ঐ মালার জন্যই বনহুর হয়তো কোথাও কোনো বিপদে জড়িয়ে পড়েছে।
