না আমি যাবো না, আমাকে বাসায় নিয়ে চলো। বাসায় নিয়ে চলো বলছি।
গাড়ির স্পীড তখন অত্যন্ত বেড়ে গেছে। ভীষণ ঝাঁকুনির পর ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি তীরবেগে ছুটে চলেছে।
মনিরা বোরখা-পরা অবস্থায় থরথর করে কাঁপছে, শেষ অবধি তার পরিণতি এই ছিলো। তবুও সাহস করে বললো মনিরা ড্রাইভার পুলিশ সুপার জানতে পারলে তোমার কি অবস্থা হবে জানো?
কোনো জবাব না দিয়ে হঠাৎ হেসে উঠলো ড্রাইভার…হাঃ হাঃ হাঃ।
গাড়ির ঝাঁকুনির সঙ্গে সে হাসি যেন খণ্ড খণ্ড হয়ে ছড়িয়ে পড়লো গাড়ির মধ্যে।
মনিরা গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিলো। কিন্তু তার পূর্বেই শিবাজী বুঝতে পারলো তার মনোভাব। ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে ফেললো সঙ্গে সঙ্গে। তারপর মনিরাকে পিছন আসন থেকে টেনে নামিয়ে ড্রাইভিং আসনের পাশে বসিয়ে নিলো জোর করে। বামহস্তে মনিরাকে চেপে ধরে রাখলো আর দক্ষিণ হস্তে সে গাড়ি চালিয়ে চললো।
শিবাজীর বামহস্তে চাপেই মনিরা একটুও নড়তে পারলো না। চিৎকার করে কোনো লাভ নেই, কারণ আশেপাশে কোনো লোকজন বা বাড়িঘর নেই যে তাকে উদ্ধার করবে।
একটা পোড়াবাড়ির সম্মুখে গাড়ি থামিয়ে ফেললো শিবাজী। মনিরার মুখমণ্ডল এখনও বোরখায় ঢাকা রয়েছে। সে বোরখার মধ্য হতেই তাকিয়ে দেখলো–বাড়ির আশেপাশে একটি জন-প্রাণী নেই। অসহায় কণ্ঠে বললো মনিরা–তুমি যা চাও তাই দেবো, আমাকে বাংলোয় পৌঁছে দিয়ে এসো ড্রাইভার। যত টাকা চাও তাই পাবে।
ড্রাইভার কোনো কথা না বলে মনিরাকে টেনে-হিঁচড়ে বাড়ির ভিতরে নিয়ে চললো। সিংহদ্বার পেরিয়ে পর পর আরও কত গেট পার করে নিয়ে এলো অন্দর মহলের একটি কক্ষে।
মনিরার দু’চোখে অশ্রুর বন্যা বয়ে চলেছে, সমস্ত মুখমণ্ডল ভয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠেছে। করুণ কণ্ঠে বললো মনিরা–এ তুমি আমায় কোথায় নিয়ে এলে?
মেরা ঘর!
আমাকে এখানে কেন তুমি নিয়ে এলে?
হাঃ হাঃ হাঃহাঃ হাঃ হাঃ–কেন নিয়ে এলাম জানতে চাও? হাঃ হাঃ হাঃ…
সে হাসির শব্দে সমস্ত বাড়িখানা যেন দুলে দুলে উঠে।
অবাক হয়ে তাকায় মনিরা, বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে–তুমি–তুমি….
হাঁ, আমিই দস্যু বনহুর। আলেয়া, আজ তোমাকে আমি আয়ত্তের মধ্যে পেয়েছি। কেউ তোমাকে আমার কবল থেকে বাঁচাতে পারবে না।
২.১৩ সাপুড়ে সর্দার
বোরখার নিচে মনিরার চোখ দুটো আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। স্বামীর হাসির শব্দ তার কানে যেন মধু বর্ষণ করলো। যার সন্ধানে সে পাগলিনী প্রায় যার জন্য সে নিজের প্রাণ বিনষ্ট করতেও। দ্বিধা বোধ করতো না, সেই আরাধ্যজন তার সম্মুখে দন্ডায়মান। মুহূর্তে ভয়-ভীতি সব উবে গেলো। তার কিন্তু সে নিশ্চুপ রইলো, মুখের আবরণ সে উন্মোচন করলো না।
বনহুর এবার মনিরাকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে ফেললো–এবার তোমার মুক্তি নেই বান্ধবী। তুমি জানো দস্যু বনহুরের হাতে যে পড়ে তার নিস্তার নেই।
বললো মনিরা কি চাও তুমি?
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–তোমার সর্বস্ব আমি লুটে নেব।
এতো বড় সাহস তোমার?
জানি আজ তোমার হাতে রিভলভার নেই।
তাই তোমার এতো স্পর্ধা–
হাঁ, আজ তোমাকে দস্যু বনহুরের কবল থেকে কেউ উদ্ধার করতে সক্ষম হবে না। পুলিশ। সুপার হাশেম চৌধুরীও না।
না না, আমাকে ছেড়ে দাও। স্বামীর হাত কামড়ে দিয়ে বলে মনিরা।
রক্ত বের করে দাও তবু ছাড়বো না। বনহুর আরও নিবিড় করে মনিরাকে আকর্ষণ করে।
মনিরা কামড়ে দিলেও চাপ দিতে পারে না।
হাসে বনহুর, মনিরার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে–মনিরা, আমার সঙ্গে তোমার এ আত্মগোপনতা কেন?
মনিরা সঙ্গে সঙ্গে নিজের মুখের আবরণ উন্মোচন করে তাকায় স্বামীর মুখের দিকে তুমি আমাকে চিনেছিলে?
হাঁ, তুমিও যেমন আমার সঙ্গে ছলনা করে বান্ধবী সেজে আমাকে নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছিলে, আমিও তাই তোমাকে–
মনিরা স্বামীর মুখ থেকে শিখের দাড়ি-গোঁফ খুলে রাখে। ব্যথা-করুণ কণ্ঠে বলে তুমি আমাকে ক্ষমা করো।
বনহুর মনিরার দেহের বোরখাটা খুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় দূরে, তারপর ওকে বলিষ্ঠ বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলে।
স্বামীর প্রশস্ত বক্ষে মনিরা নিজকে বিলিয়ে দেয়। আজ মনিরার মনে অফুরন্ত আনন্দ উৎস, সমস্ত অন্তর জুড়ে এক আবেগময় অনুভূতি!
মনিরা ভাবতে পারেনি, আজ তার ভাগ্য এতো প্রসন্ন হবে! ভয়ঙ্কর এক বিপদের মধ্য দিয়ে আসবে পরম মধুময় মুহূর্ত। খুশির উচ্ছ্বাসে সে স্বামীর বাহুবন্ধনে নিজকে অর্পণ করলো। অনাবিল পাওয়ার আনন্দে বুক তার স্ফীত হয়ে উঠেছে।
মনিরার দক্ষিণ হাতখানা স্বামীর কণ্ঠ বেষ্টন করে ধরলো। ভাববিহ্বল মনিরার চোখ দুটি মুদে এলো আপনা আপনি। বললো মনিরা বড় দুষ্ট তুমি!
উঁ হুঁ মোটেই না, মনিরার মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলে বনহুর।
সত্যি, বেশি রাতে ফিরে গেলে বাংলোর ওরা কি ভাববে বলতো?
তুমি তো জানোই দস্যু বনহুরের কবলে পড়লে তার নিস্তার নেই। কাজেই ফিরে যাওয়া যত সহজ মনে করেছো তত সহজ নয়।
সন্ধ্যার অন্ধকার জমাট বেঁধে উঠে।
বনহুর মোম জ্বেলে দেয়।
মনিরা বলে–এই নির্জন পোড়াবাড়িতে কি করে থাকো তুমি?
কেন?
ভয় করে না তোমার?
হেসে উঠে বনহুর–ভয়! মনিরা, তোমার স্বামীই যে পৃথিবীর সব চেয়ে বড় ভয়।
ভূতের ভয় করে না তোমার?
কি বললে মনিরা–ভূতের ভয়। হাঃ হাঃ হাঃ ভূত আমাকে দেখলে ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়, বুঝলে?
