শিখ ড্রাইভারটির ব্যবহারে খুশি হলেন হাশেম চৌধুরী। যেমন চেহারা, তেমনি অমায়িক লোক।
কয়েকদিনেই সে অনেকটা আপনজনের মত হয়ে গেলো। ভাল বাংলা বলতে পারে না সে, ভাংগা ভাঙা উর্দু কথা বলে।
শিখ ড্রাইভারের ছদ্রবেশে বনহুর স্বয়ং এসে হাজির হয়েছে পুলিশ সুপারের বাংলোয়। উদ্দেশ্য মনিরাকে একবার আয়ত্তের মধ্যে আনা; তাকে যেমন নাকানি-চুবানি খাইয়ে ছেড়েছে তেমনি ওকেও খানিকটা কাদিয়ে তবে ছাড়বে।
মনিরার চোখের পানি মাঝে মাঝে বনহুরকে বিচলিত করে তুলতো। বাগানে বসে নীরবে অশ্রু বিসর্জন করতো যখন মনিরা তখন দূর থেকে লক্ষ্য করতো বনহুর, হাসতো মনে মনে–স্বামীর সঙ্গে ছলনার এবার হচ্ছে সাজা।
মনিরা হয়তো সারাদিন শয্যায় শুয়ে চিন্তা করতো। পাশে বসে বোঝাতো মাসুমা, সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করতো অনেক। এমন কি হাশেম চৌধুরী পর্যন্ত নানাভাবে মনিরাকে প্রকৃতিস্থ করার চেষ্টা করতেন।
শিখ ড্রাইভারের বেশে বনহুর সব দেখতো, সব শুনতো। কতদিন হাশেম চৌধুরী শিখ ড্রাইভার শিবাজীকে নিয়ে বের হতেন, এখানে-সেখানে সন্ধান করে ফিরতেন রঞ্জন বাবুর। এ-পথ সে-পথ চষে ফিরতেন হাশেম চৌধুরী।
বলতো শিবাজী হুজুর আপ কিসুকে লিয়ে দিন তামাম ঘুমতে?
বলতেন হাশেম চৌধুরী–এক আদমীকে লিয়ে হাম বাহুৎ পেরেশান হুয়ে। উছিকে লিয়ে এনা রাহা ঘুমুতে শিবাজী।
হাশেম চৌধুরীর কথায় হাসতো শিবাজী হুজুর আদমীতো জানোয়ার নেহি। যো রাহা পর ঢুরনেছে ফায়দা হুয়ে।
এমনি কতদিন হতাশ হয়ে ফিরে এসেছেন হাশেম চৌধুরী।
স্বামী ফিরে আসতেই মাসুমা ছুটে এসেছে গাড়ির পাশে, ব্যাকুল আগ্রহে জিজ্ঞাসা করেছে–পেলে তাকে?
গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলেছেন হাশেম চৌধুরী–কই আর পেলাম! হতাশ ভরা কণ্ঠস্বর তার।
গাড়ির দরজা ধরে তখন দাঁড়িয়ে শিখ ড্রাইভার শিবাজী। ভিতরে ভিতরে হাসে সে। যার সন্ধানে তোমরা ঘাবড়ে মরছো সে যে তোমাদের পাশে দাঁড়িয়ে।
*
একদিন হাশেম চৌধুরী পুলিশ ভ্যান নিয়ে কোনো ডাকাতি কেসের তদারক করতে গেছেন।
মাসুমার শরীর আজ ভাল নেই।
মনিরা বললো–মাসু, আমি একটু বাইরে যাব।
তা কি করে হয়, একা যাবি? আমার যে অসুখ।
তা হোক তোদের ড্রাইভারকে বলে দে একটু নিয়ে যেতে।
বুঝেছি, নিজে খোঁজ করতে যাবি–এই তো?
যা বলবি তাই।
মাসুমা কলিং বেলে চাপ দেয়।
বয় কক্ষে প্রবেশ করে–মা-জী।
এই শোন্ ড্রাইভারকে একবার ডেকে দে দেখি।
আচ্ছা মা-জী। বেরিয়ে যায় বয়।
একটু পরে শিখ ড্রাইভার শিবাজীসহ বয় ফিরে আসে।
শিবাজী দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে লম্বা সেলুট ঠুকে বলে–বিবিজী আল্ হামকো বোলাতে?
হাঁ শিবাজী, আমার বান্ধবী বাইরে যাবেন। গাড়ি বের করে নাও। আর শোন, সাবধানে নিয়ে যেও।
বহুৎ আচ্ছা বিবিজী। সেলুট করে চলে গেলো শিবাজী।
মনিরা তৈরি হয়ে ফিরে এলো মাসুমার পাশে।
মাসুমা বললো–একি, আজও ঐ বোরখা পরেছিস? এখন কার কাছে আত্নগোপন বলতো?
অভ্যাস হয়ে গেছে, আর যে ভাল লাগে না।
চল তোকে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে আসি।
চিরবিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছি না যে অসুখ শরীরে তাই বিদায় সম্ভাষণ জানাতে হবে। চুপ করে শুয়ে থাক দিকি।
শীগগীর ফিরে আসবি কিন্তু।
আচ্ছা।
মনিরা বোরখা আচ্ছাদিত শরীর নিয়ে গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ালো।
শিখ ড্রাইভার দরজা খুলে ধরলো।
পিছন আসনে উঠে বসলো মনিরা।
ড্রাইভিং আসনে বসলো শিখ ড্রাইভারবেশী বনহুর নিজে। তার ঠোঁটের ফাঁকে দুষ্টামির হাসি ফুটে। উঠেছে। এমনি এক সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো সে।
গাড়িতে স্টার্ট দেবার পূর্বে বললো বনহুর–আপ কঁহা যাওগি?
বেলুচা বাজার।
হাসলো বনহুর মনে মনে, বেলুচা বাজার দিল্লীর সবচেয়ে বড় ফুলের বাজার। এখানে কেন যাবে মনিরা ফুলের বাজারে যদি তার স্বামীকে খুঁজে পায় সেই আশায় কি?
গাড়ি ছুটতে শুরু করলো।
ড্রাইভ আসনে বনহুর। আর পিছন আসনে মনিরা।
এ-রাস্তা সে-রাস্তা করে গাড়ি ছুটে চলেছে।
বেলুচা বাজারের পথ চিনতো মনিরা, মাসুমা আর হাশেম চৌধুরীর সঙ্গে আরও কয়েকবার এসেছিলো সে। আজ তো এটা সে-পথ নয়। মনিরা একটু চিন্তিত হলো ড্রাইভারের ভাবগতিক ভাল। বলে মনে হচ্ছে না তার। হঠাৎ বলে উঠলো সে–এ কোন্ পথে আমাকে নিয়ে যাচ্ছো?
বললো শিবাজী–চুপচাপ আপ বয়ঠিয়ে বিবিসাব।
অগত্যা মনিরা বসেই রইলো, মনে করলো এটা হয়তো অন্য কোনো পথ ধরে তাকে বেলুচা বাজার নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই মনিরা বুঝতে পারে তার সন্দেহ সত্য। ড্রাইভার তার গাড়িখানা নিয়ে নির্জন পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছে। এ পথ বেলুচা বাজার যাবার পথ নয়।
মনিরা এবার ভীত আশঙ্কিত হয়ে পড়লো। এ যে মেঠো অসমতল পথ বেয়ে তার গাড়ি চলেছে। নিশ্চয়ই ড্রাইভারের মনে কোনো কুমতলব আছে। মনিরার সমস্ত শরীর কাঁটা দিয়ে উঠলো। দুরু দুরু বক্ষে কম্পিত কণ্ঠে বললো–এ তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে চলেছে ড্রাইভার?
আপ চুপ সে বইঠিয়ে বিবিসাব।
মনিরার সমস্ত শরীর ঘেমে চুপসে উঠতে লাগলো হায়, একি হলো! কেন সে ড্রাইভারকে বিশ্বাস করেছিলো এখন উপায়? গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়বে কি? তাই ভাল-মৃত্যু হয় সেও ভাল তবু ইজ্জৎ হারাবে না।
মনিরা গাড়ির দরজার দিকে এগিয়ে সরে বসলো।
শিবাজী তার সম্মুখের আয়নায় সব লক্ষ্য করছিলো, বললো কই চালাকি মত করিয়ে! গাড়িছে গিরনেছে খতম হো জায়েগি বিবিসাব।
